শুক্রবার, মার্চ ৫, ২০২১
Home মুভিব্লগ মহারথীদের শেষ-না-হওয়া সিনেমা

মহারথীদের শেষ-না-হওয়া সিনেমা

বানানো শুরু করেও শেষ করা যায়নি, এমন সিনেমার সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এক রকম শেষ করা গেছে, তবু মুক্তি দেয়া যায়নি, তেমন সিনেমাও আছে প্রচুর। এমনকি রথী-মহারথী পরিচালকরাও এর ব্যতিক্রম নন। এ বাবদে আমাদের ‍ঋত্মিক কুমার ঘটক যাকে বলে চ্যাম্পিয়ন। তার এমন সিনেমার সংখ্যা নাকি তিরিশেরও বেশি। সিনেমাগুলোর এমন মুখ থুবড়ে পড়ার প্রধান কারণ টাকার অভাব। কখনও আবার কাজ আটকে যায় কোনো দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়ে। অনেক সময় আবার স্রেফ কাহিনি নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েও সিনেমা আটকে যায়। যেমন আমাদের সত্যজিত রায়ের সিকিম নামের একটি সিনেমা দীর্ঘদিন মুক্তি পায়নি স্রেফ একটি সিকোয়েন্সের জন্য।

হিচককের ক্যালাইডোস্কোপ

- Advertisement -

১৯৬৮ সাল। হিচককের ক্যারিয়ার তখন পড়তির দিকে। তার সিনেমাগুলোও ঠিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। শিল্পসম্মত হওয়ার চেয়ে সেগুলোতে বাণিজ্যিক সিনেমার ঝোঁকই বেশি। তখন হিচকক তার নামের প্রতি সুবিচার করতেই শুরু করলেন ক্যালাইডোস্কোপ সিনেমার কাজ। খুন, ধর্ষণ, পেশিশক্তি, সিরিয়াল কিলিংয়ে ভরপুর এক থ্রিলার। দ্য বার্ডস-এ যেরকম, তেমনি এটাতেও নতুন কিছু ফিল্ম টেকনিক প্রয়োগের পরিকল্পনা আঁটলেন। চিন্তায় ছিল প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, স্ট্যান্ডের বদলে ক্যামেরা হাতে বয়ে শ্যুট করা, পয়েন্ট-অফ-ভিউ অ্যাঙ্গেলে শ্যুট করার মতো ভাবনাগুলো।

- Advertisement -

প্রি-প্রোডাকশনে প্রচণ্ড পরিশ্রম করার পরও, শেষ পর্যন্ত সিনেমাটা শেষ করতে পারলেন না হিচকক। টাকার বন্দোবস্ত করতে পারলেন না। প্রায় ঘণ্টাখানেকের ফুটেজ নিয়ে অসমাপ্ত পড়ে রইল ক্যালাইডোস্কোপ। এর কিছু অংশ অবশ্য তিনি পড়ে ফ্রেঞ্জি-তে (১৯৭২) ব্যবহার করেন।

কুব্রিকের না-বানানো সিনেমা

যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রায়ই কুব্রিকের সিনেমার বিষয় হিসেবে এসেছে। তার ড. স্ট্রেঞ্জলোভফুল মেটাল জ্যাকেটপাথস অফ গ্লোরি— সিনেমাগুলো সে স্বাক্ষ্যই দেয়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদীদের উপর চালানো ভয়াবহ অত্যাচার নিয়ে সিনেমা বানানো হয়নি তার। এ জন্য ঠিক মনমতো গল্প খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। সে গল্পের সন্ধান পান ১৯৯১ সালে। লুই বেগলি-র উপন্যাস ওয়ারটাইম লাইস। একটা জাল পরিচয়পত্রের সাহায্যে নাৎসিদের হাত থেকে এক ইহুদি ছেলে ও তার খালার বেঁচে যাওয়ার গল্প। সে উপন্যাস থেকে তিনি দ্য আরিয়ান পেপার্স নামে চিত্রনাট্য তৈরি করেন। ওয়ার্নার ব্রস সিনেমাটির প্রযোজনার দায়িত্ব নেয়। কুব্রিক চেক রিপাবলিকে ঘুরে ঘুরে সিনেমার লোকেশন ঠিক করেন। মূল চরিত্র দুটোর জন্য কাস্টও ঠিক করা হয়।

তবে শেষ মুহুর্তে সিনেমাটি বানানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ওয়ার্নার ব্রস। তারা হিসেব করে দেখে, দ্য আরিয়ান পেপার্স মুক্তির আগেই মুক্তি পাবে স্পিলবার্গের শিন্ডলারস লিস্ট। পরিবর্তে ওয়ার্নার ব্রসের প্রযোজনাতেই কুব্রিক বানান আইস ওয়াইড শাট (১৯৯৯)। এটিই কুব্রিকের শেষ সিনেমা।

এছাড়াও কুব্রিক নেপোলিয়ন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এ.আই.) বানানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েও শেষ পর্যন্ত বানাননি। অবশ্য ২০০১ সালে স্পিলবার্গের হাত ধরে এ.আই. মুক্তি পায়।

রিসার্ভেয়র ডগস-এর আগের ত্যারেন্তিনো

কুয়েন্তিন ত্যারেন্তিনোর প্রথম সিনেমা হিসেবে ধরা হয় কমেডি ক্রাইম-ড্রামা রিসার্ভেয়র ডগস-কে (১৯৯২)। কিন্তু এর আগেও ত্যারেন্তিনো দুটো সিনেমা বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৮৩ সালে বানানো লাভ বার্ডস ইন বন্ডেজ তো শেষই করতে পারেননি। তবে মাই বেস্ট ফ্রেন্ডস বার্থডে বানানো শেষ করেন ১৯৮৭ সালে। প্রথম সিনেমার মতো এটাতেও তিনি নিজেও অভিনয় করেন। সিনেমাটির এডিটিংও শেষ হয়। তবে সাদা-কালো এই সিনেমাটিও তিনি মুক্তি দিতে পারেননি। যে ল্যাবে সিনেমাটির কাজ হয়েছিল, সেখানে ছোটখাটো একটা অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তাতে দুই রিলের এই সিনেমাটির শেষ রিল পুড়ে যায়। ৭০ মিনিটের সিনেমাটির তাই ৩৬ মিনিটই কেবল পাওয়া যায়। সেটুকুই দিয়েই পরে সীমিত দর্শকদের সামনে সিনেমাটির একটি প্রদর্শনী করা হয়।

অরসন ওয়েলেসের শেষ সিনেমা

সিটিজেন কেইন-খ্যাত অরসন ওয়েলেস তার শেষ সিনেমা বানানোর কাজে হাত দেন ১৯৬৯ সালে। নাম দ্য আদার সাইড অফ দ্য উইন্ড। টাকার অভাবে মাঝে মাঝেই বিরতি দিয়ে, শুটিং চলে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। সিনেমাটি মূলত দুই প্রতিযোগী পরিচালকের গল্প। একজন বয়স্ক পরিচালক, আরেকজন তরুণ পরিচালক। বয়স্ক পরিচালকের চরিত্রে অভিনয় করেন জন হিউস্টন। আর তরুণ পরিচালকের চরিত্রে পিটার বগদানোভ।

শুটিং শুরু করার পর থেকেই সিনেমাটিকে একের পর এক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। বরাবরের মতোই ওয়েলেসকে টাকা এবং সময়ের সমস্যায় পড়তেই হয়। বিশেষ করে ওয়েলেসের শুটিং করার যে পদ্ধতি, তাতে শুটিং কবে শেষ হবে, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা থাকতো না। কাজেই টাকায় তো টান পড়লোই, একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের অভিনেতাকেও সিনেমার কাজ শেষ না করেই চলে যেতে হল। তবে সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয় ১৯৭৯ সালে।

সিনেমাটির টাকার জন্য ওয়েলেস একেক সময় একেকজনের কাছে ধর্না দিয়েছিলেন। কাজেই সিনেমাটির একেক অংশের প্রযোজক একেকজন। তাদের মধ্যে একজন তৎকালিন ইরানের শাহ রাজবংশের একজন সদস্য। ১৯৭৯ সালে ইরানে রাজবংশের পতন ঘটে। ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ খোমিনি। তার সরকার সিনেমাটির সেই অংশের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

পরে সিনেমাটি মুক্তির আগেই, ১৯৮৫ সালে অরসন ওয়েলেস মারা যান। সিনেমাটি আজোবধি মুক্তি পায়নি। ‍মুক্তি পাবে কিনা, তাও নিশ্চিত নয়। তবে প্রযোজক ফ্র্যাঙ্ক মার্শাল এবং পিটার বগদানোভ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অরসন ওয়েলেসের শেষ সিনেমা বলে কথা!

নাবীল অনুসূর্য
জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। স্কুলের পাঠ চুকিয়েছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে, ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে কলেজের পাঠ। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই ফিচার-সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ফেলোশিপ নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উপর একটি গবেষণার কাজ করছেন। গবেষণার বিষয় আমাদের চলচ্চিত্রে ’৫২-র উপস্থাপন: অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা। এছাড়াও ফ্রি-ল্যান্সিং লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে ও অন্যান্য মাধ্যমে।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বশেষ মন্তব্য

মুক্তির প্রতীক্ষিত

  • Sphulingo

সর্বশেষ খবরাখবর

ঈদের সিনেমা ‘অন্তরাত্মা’

ঝাকজমক পূর্ণ মহরতে শুরু হলো শাকিব খানের ঈদের সিনেমা ‘অন্তরাত্মা’

0
সম্প্রতি জানা গিয়েছিলো আগামী ঈদুল ফিতরে মুক্তির লক্ষ্যে নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ঢালিউড সুপারষ্টার শাকিব খান। তরঙ্গ এন্টারটেইনমেন্টের ব্যানারে নির্মিতব্য ‘অন্তরাত্মা’ নামের এই সিনেমাটি...
দীঘির প্রথম সিনেমার

দীঘির প্রথম সিনেমার ট্রেলারে সমালোচনার ঝড়: কি বললেন নির্মাতা?

0
বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় শিশুশিল্পী দীঘি। দর্শকদের ভালোবাসার পাশাপাশি শিশুশিল্পী হিসেবে পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শিশুশিল্পী থেকে তার দীঘির পরিপূর্ন নায়িকা হিসেবে আত্নপ্রকাশ নিয়ে সবার...
তৌকির আহমদের ‘স্ফুলিঙ্গ’

যে তিনটি কারনে আপনার দেখা উচিত তৌকির আহমদের ‘স্ফুলিঙ্গ’!

0
গত ৯ই ডিসেম্বর রাজধানীর বনানী ক্লাবে নতুন সিনেমা ‘স্ফুলিঙ্গ’ এর ঘোষনা দিয়েছিলেন আলোচিত নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। এই অনুষ্ঠানেই তিনি বলেছিলেন করোনার কারণে সেট ফেলে...
আবারো পেছালো 'এফ ৯'

আবারো পেছালো ‘এফ ৯’: জুনে দেখা যাবে ডমের পরিবারের পুনর্মিলনী

0
করোনা পরবর্তী সময়ে প্রেক্ষাগৃহে নতুন করে সিনেমা প্রদর্শনী শুরু হলেও বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি শুরু হয়নি এখনও। কিছু কিছু সিনেমা ইতিমধ্যে মুক্তির তারিখ ঘোষনা...
স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না

স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না: কতটুকু মনে আছে মান্নার সিনেমার যাত্রা

0
বাংলা সিনেমার অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় অভিনেতা মান্না। মৃত্যুর আগে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা। ভক্তদের ভালোবাসায় হয়েছেন স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না। নায়ক মান্না...

আরো পড়ুন