শুক্রবার, মার্চ ৫, ২০২১
Home ব্রেকিং শহীদুল ইসলাম খোকন: বাংলার সাহসীতম পরিচালক

শহীদুল ইসলাম খোকন: বাংলার সাহসীতম পরিচালক

শহীদুল ইসলাম খোকন। বাংলাদেশের সম্ভ্রান্ত সিনেমা-বোদ্ধাদের কাছে খুব একটা আদরণীয় নাম নন। এফডিসির তথাকথিত বাণিজ্যিক ধারার একজন পরিচালক। বাস্তবতা হলো, সম্ভবত তিনিই বাংলাদেশের সিনেমার একমাত্র পরিচালক, যিনি তার সিনেমায় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নিতেন। মানে তার সিনেমায় যতো বড় স্টারকাস্টই থাকুক, তার সিনেমায় তার চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক কেউ পেতেন না। প্রযোজকের সাথে কথাবার্তাই সেভাবে হতো। সিনেমার সবচেয়ে বড় স্টারকাস্ট যে, তার চেয়ে শহীদুল ইসলাম খোকনের পারিশ্রমিক অন্তত লাখখানেক বেশি থাকতো।

আমাদের সিনেমায় এ রকম অনেক কিছুই তিনি করে দেখিয়েছেন, যা তার আগে কেউ ভাবতে পারেনি। শুধু আগে কেন, পরেও হয়তো কেউ ভাবতে পারেনি। তিনিই বাংলা সিনেমায় কুংফু-কারাতে তথা মার্শাল আর্টকে জনপ্রিয় করে তোলেন। বন্দুক-গোলাবারুদ ছাড়াই টানটান উত্তেজনার অ্যাকশন। আর তাই তার সঙ্গে জুটি বাঁধেন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়ন। লড়াকু সিনেমা দিয়ে দেশের প্রথম জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নের অভিষেক হয় নায়ক হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সেই কারাতে চ্যাম্পিয়নের নাম মাসুম পারভেজ রুবেল। মাসুদ পারভেজ ওরফে সোহেল রানার ছোট ভাই।

- Advertisement -

অবশ্য বাংলা সিনেমায় প্রথম মার্শাল আর্ট ভিত্তিক সিনেমা বানান সোহেল রানা। তার সেই সিনেমায় অভিনয় করেন ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম। এই সোহেল রানাই ছিলেন শহীদুল ইসলাম খোকনের সিনেমার গুরু। খোকন প্রায় বছর দশেক তার সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তারপর সিনেমায় নামেন। তার প্রথম দুটো সিনেমা অবশ্য ফ্লপ হয়। তারপর গুরুর পরামর্শে, গুরুর ছোটভাইকে নায়ক বানিয়ে মার্শাল আর্ট ভিত্তিক সিনেমা বানানো শুরু করেন লড়াকু দিয়ে। বাকিটুকু ইতিহাস। রুবেল-খোকন জুটি সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসেরই সবচেয়ে সফল নায়ক-পরিচালক জুটি। আর তার ফলাফল দেশে মার্শাল আর্টের ধুন্ধুমার জনপ্রিয়তা।

কেবল সবচেয়ে সফল নায়ক-পরিচালক নয়, বাংলা সিনেমার সবচেয়ে সফল খলনায়ক-পরিচালক জুটিটিও সম্ভবত তারই- হুমায়ুন ফরীদি-খোকন জুটি। এই হুমায়ুন ফরীদিকে সিনেমায় আনার কৃতিত্বও তার। হুমায়ুন ফরীদির প্রথম সিনেমার নাম দহন। কিন্তু সেটা ছিল ফরীদির বিচ্ছিন্ন কাজ। শহীদুল ইসলাম খোকনের সন্ত্রাস দিয়েই ফরীদি নিয়মিত সিনেমায় অভিনয় করতে শুরু করেন। এবং খলনায়ক হিসেবে দ্রুতই জনমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। বাংলাদেশের সিনেমায় তার মতো জনপ্রিয় খলনায়ক বিরল, যিনি পর্দায় আসলেই হল-ভর্তি দর্শক উল্লাসে ফেটে পরতো। পরে এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন ফরীদি নিজেই বলেছিলেন, সিনেমায় না আসলে হয়তো তিনি যাত্রাপালায় অভিনয় করে বেড়াতেন।

- Advertisement -

30-Lompot

কেবল রুবেল-হুমায়ুন ফরীদিই নয়, বাংলা সিনেমায় শহীদুল ইসলাম খোকনের আবিষ্কার আছেন আরও। মার্শাল আর্ট-ভিত্তিক সিনেমা বানাতে গিয়ে খোকন মার্শাল আর্টে পারদর্শী বেশ কয়েকজন অভিনেতাকে সিনেমায় নিয়ে আসেন। ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলমকে অবশ্য প্রথম সিনেমায় অভিনয় করান তার গুরু সোহেল রানা। আর জাহাঙ্গীর আলমের পাশাপাশি খোকনের হাত ধরে ক্যামেরার সামনে আসেন মার্শাল আর্টে পারদর্শী সিরাজ পান্না ও ড্যানি সিডাক। মার্শাল আর্টে পারদর্শী একমাত্র নায়িকা মিশেলার আবির্ভাবও তার হাত ধরেই। তবে আর কেউ এ ধরনের সিনেমা না বানানোও, খোকন ছাড়া আর কারো সিনেমায় মিশেলাকে তেমন একটা দেখা যায়নি। খোকনের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের মধ্যে আছেন শিমলাও। খোকনের ম্যাডাম ফুলি সিনেমা দিয়েই শিমলার রূপালি পর্দায় হাতে-খড়ি হয়।

শহীদুল ইসলাম খোকনের সিনেমা মানেই ছিল নতুন কিছু। এমনকি চীনা লোককাহিনি নিয়েও সিনেমা বানিয়েছিলেন তিনি। চীনা লোককাহিনিকে বসিয়েছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে। তারপর সেখানে এক নতুন ফ্যান্টাসি নির্মাণ করেছিলেন। আবার শত্রু ভয়ংকর সিনেমায় তিনি বরফের ছুরি দিয়ে খুন করালেন। পরে বরফের ছুরি গলে গেলে, আর কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা অন্য কোনো প্রমাণই থাকলো না।

কাহিনিতে এ রকম চমক আনতে তিনি ছিলেন রীতিমতো সিদ্ধহস্ত। বাংলাদেশের প্রথম সিরিয়াল কিলার মুভিও তিনিই নির্মাণ করেন। ১৯৯৫ সালে। নাম বিশ্বপ্রেমিক। ১৯৯৭ সালে নির্মাণ করেন নারীমুক্তির ফ্যান্টাসি নিয়ে সিনেমা পালাবি কোথায়। এটিই সম্ভবত প্রথাগত-নায়ক বিহীন বাংলাদেশের একমাত্র সিনেমা। হুমায়ুন ফরীদির জীবনে একমাত্র প্রযোজিত সিনেমাও এটি। ফরীদি-খোকন দুজনেরই ড্রিম প্রজেক্ট এই সিনেমাটি অবশ্য ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়। দুজনেই ব্যাপক লোকসানের মুখে পরেন। খোকনের ক্যারিয়ারের শুরু ও শেষ বাদ দিলে, তার ক্যারিয়ারের মধ্য গগনের এটিই একমাত্র ফ্লপ সিনেমা। বাকি সবগুলোই হয় হিট, নয়তো সুপারহিট।

তার এই সব চূড়ান্ত ব্যবসা-সফল সিনেমাগুলোর মধ্যে একটি সিনেমা বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে ওটিই একমাত্র সিনেমা, যেটি প্রদর্শনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে সিনেমা হলে পুলিশি পাহারা বসাতে হয়েছিল। কারণ সিনেমাটি প্রদর্শনের জন্য একটি সিনেমা হলে বোমা হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিল জঙ্গিরা। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে এমন ঘটনা এর আগে-পরে আর কখনোই ঘটেনি। ঘাতক নামের সিনেমাটিতে খোকন মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রে খলিলকে সাজান বঙ্গবন্ধুর আদলে, আর রাজাকার চরিত্রে হুমায়ুন ফরীদিকে সাজান গোলাম আযমের আদলে। তারপর তাদের দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের জাতিগত ফ্যান্টাসির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটান। বড় পর্দায় দেশের সব হলে গিয়ে মানুষ দেখে, বঙ্গবন্ধুর উদারতার সুযোগ নিয়ে গোলাম আযম ও তার দল কেমন নিমকহারামি করেছে। আর বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধু যে সত্যিই তাদের ক্ষমা করার জন্য আফশোষ করতেন, তাও দেখে। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের নিয়ে এমন প্রকাশ্যে-স্পষ্ট ভাষায় এমন সাহসী মন্তব্য খুব বেশি মানুষ করার সাহস দেখাননি।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটিই শহীদুল ইসলাম খোকনের একমাত্র কাজ নয়। বরং মুক্তিযুদ্ধ সবসময়ই খোকনের সিনেমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঘাতক ছাড়াও তিনি বানিয়েছেন সন্ত্রাসবীর পুরুষ ও কমান্ডার। কোনোটিই মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ধরে বানানো হয়নি, কিন্তু প্রত্যেকটিই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বানানো সিনেমা। মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করে একেকটি ফ্যান্টাসি। এবং সাহসিকতার পরিচয় দেয়ার ক্ষেত্রে কোনোটি কোনোটির চেয়ে কম নয়। তিনি বীর পুরুষ বানিয়েছিলেন স্বৈরশাসক এরশাদের সময়ে, যখন টিভিতে-সিনেমায় রাজাকার শব্দটা উচ্চারণও নিষেধ ছিল। তখন তিনি বড় পর্দা জুড়ে দেখান গোলাম আযম-নিজামী-সাঈদীর সেই বিখ্যাত জিভ বের করা ছবি, আর ভয়েস ওভারে বলেন- দেশে আবার ফিরে এসেছে সেই পুরনো হায়েনাদের দল। অন্যদিকে ঘাতক-এর মতো সন্ত্রাস আর কমান্ডার-এ তিনি সরাসরি রাজাকারদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের মেনিফেস্টো ঘোষণা করেন। সন্ত্রাস সিনেমার শেষে সোজাসুজি ক্যামেরা নিয়ে বসে যান দর্শকদের উদ্দেশ্যে কথা বলার জন্য। পোস্ট-মডার্নিস্ট তরিকায় দর্শকদের বলেন, দেশদ্রোহী রাজাকারদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে সরকারের একক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। সে জন্য সাধারণ মানুষকেও সংগ্রামে নামতে হবে। সামাজিক সংগ্রাম।

কেবল তার সিনেমাতেই নয়, শহীদুল ইসলাম খোকন সংগ্রাম করে গেছেন বাস্তব জীবনেও, বাংলাদেশের সিনেমার জন্য। অসুস্থ শরীর নিয়েও শেষ বয়সে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি পদে নির্বাচন করে জয়ী হন। শেষ পর্যন্ত অসুস্থতার কাছে পরাজিত হয়ে দায়িত্ব ছাড়তে হলেও, তার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব ঠিকই পালন করেন। এর আগেও কয়েক মেয়াদে সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। অশ্লীলতা বিরোধী আন্দোলনে তার ছিল বলিষ্ঠ ভূমিকা। হিন্দি সিনেমা আনার বিপরীতেও তার অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। এমনকি দুই বাংলার সিনেমা দেয়া-নেয়ার যে সম্পর্ক সম্প্রতি শুরু হয়েছে, তাতেও সম্মতি ছিল না তার। কারণটাও স্পষ্ট। যখন বাংলাদেশের সিনেমার রমরমা চলছিল, আর কোলকাতার সিনেমা ছিল পড়তির দিকে, তখন এমনকি তিনি নিজেও দুই বাংলার সিনেমার দেয়া-নেয়ার ব্যাপারে আলাপ চালিয়েছিলেন। তখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কোলকাতা ও টালিগঞ্জের হর্তাকর্তারা কোনোভাবেই এই দেয়া-নেয়াতে রাজি হননি। এখন যখন পরিস্থিতি ঠিক বিপরীতমুখী, টালিগঞ্জের সিনেমার রমরমা অবস্থা, আর বাংলাদেশের সিনেমা চূড়ান্ত পতনের শেষ দেখে কেবল উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছে, তখন এই দেয়া-নেয়াকে ভালো চোখে দেখাটা অন্তত খোকনের মতো আপোষহীন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। তার এই আপত্তির ব্যাপারটা তিনি গোপনও রাখেননি।

12924532_10206019960567192_3953803623833454338_n

তার চরিত্রের এই আপোষহীনতা কেবল তার ব্যক্তিত্বেই নয়, ছিল তার সিনেমাতেও। কেবল সিনেমার বিষয়বস্তুতে নয়, কারিগরি দিক দিয়েও তিনি ছিলেন আপোষহীন। তার ম্যাডাম ফুলি সিনেমায় সম্ভবত কোনো এক জায়গায় শিমলার ঠোঁটের সঙ্গে ডাবিং ঠিকমতো মেলেনি, (কোথায় সেটা তিনিই জানেন) তাই নিয়ে তার আফশোষের অন্ত ছিল না। (শেষ বার যখন তার সাথে দেখা হয়, তখনো তিনি আফশোষে মাথা নাড়তে নাড়তে এ কথা বলেছিলেন।)

শহীদুল ইসলাম খোকন কেবল সিনেমার কাহিনিতেই চমক রাখতেন না, চমক থাকতো তার সিনেমার রঙ্গ-রসিকতাতেও। এই যেমন অপহরণ সিনেমায় নায়িকা সাথীর চরিত্রটাই ছিল এমন যে, তার টাক মাথা দেখলেই হাত চুলকোয়। টাকে গাট্টা না মারা পর্যন্ত সেই হাত চুলকানো থামে না। কিংবা কমান্ডার সিনেমায় সিঁধেল চোর ‍হুমায়ুন ফরীদি ছিল শিং মাছের মতো। হাতে বালু না মাখলে তাকে ধরা যায় না। আবার ভণ্ড সিনেমায় এ টি এম শামসুজ্জামানের সংলাপ- বিশ বছরের মুরগী চুরির অভিজ্ঞতা। এ রকম তার সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রের, বিশেষ করে খলচরিত্রগুলোর প্রায়ই কিছু ক্যাচ-ফ্রেজ থাকতো, যেগুলো বেশ মজারও বটে।

শহীদুল ইসলাম খোকন তার প্রত্যেক সিনেমার বাংলা-ইংরেজি দুটো নামই রাখতেন। নিজে অভিনয়ও করেছিলেন একটি সিনেমায়- উত্থান-পতন। দুই নায়কের একজনের চরিত্রে। খারাপও করেননি। কিন্তু পরে আর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করেননি।

২০০০ সালের আগে-পরে বাংলাদেশের সিনেমা প্রবেশ করে অশ্লীলতার যুগে। স্বভাবতই আপোষহীন শহীদুল ইসলাম খোকন অশ্লীল হতে পারলেন না। কাজেই তাকে হাত গুটাতে হলো। পরে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে লাল সবুজ বানালেও তা ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হলো। এরপরে তিনি শাকিব খানকে নিয়ে আরও দুইটি সিনেমা বানান। টাকা, এবং তার অন্যতম সেরা কাজ ভণ্ড-র সিক্যুয়াল চেহারা ভণ্ড ২। ব্যর্থ হয় দুটোই। এর মাঝে অবশ্য তিনি তার আরেকটি ড্রিম প্রজেক্ট শেষ করেন। সিনেমাটি তেমন ব্যবসা না করলেও, তা নিয়ে বোধহয় তিনি খুব একটা কষ্‌ট পাননি।

12932666_10206019979127656_5380167275418196110_n

বাংলাদেশের সম্ভ্রান্ত সিনেমা-বোদ্ধাদের কাছে শহীদুল ইসলাম খোকন আদরণীয় নাম নন। বিপরীতে সত্যজিত রায় সকলেরই নমস্য। বাংলা সিনেমার এই দিকপাল একবার আহমদ ছফার কাছে তার ওঙ্কার ‍উপন্যাস থেকে সিনেমা বানানোর অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু ছফা দেননি। (ছফা নিজেই তার এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছিলেন) কিন্তু ছফার ভাবশিষ্য শহীদুল ইসলাম খোকনের এই অনুমতি মিলেছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা আহমদ ছফার ওঙ্কার নিয়ে তিনি বানান বাঙলা। অভিনয় করেন শাবনুর।

মৃত্যুর আগে বাংলাদেশের সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় এই পরিচালক দীর্ঘদিন রোগে ভোগেন। স্বাভাবিকভাবেই আমরা জাতিগতভাবে পুরোটা সময় তাকে উপেক্ষা উপহার দেই। কেবল অসুস্থতাকালীন সময়েই নয়, তার মৃত্যুর পরও আমরা তাকে উপেক্ষাই করে যাচ্ছি। তিনি হলিউডের কিংবা বলিউডের কিংবা নিদেনপক্ষে টালিগঞ্জেরও কোনো চোখ-ধাঁধানো মন-ভোলানো কেউ নন বলে, কিংবা তাকে নিয়ে কথা বলাটা আমাদের সূক্ষ্ম রুচির জন্য অস্বস্তিকর বলে, কিংবা তিনি স্থূল রুচির বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমা বানাতেন বলে, তাকে নিয়ে কথা বলাটা আমাদের জন্য এবং আমাদের মিডিয়ার জন্য স্বাস্থ্যকর বিবেচিত হচ্ছে না। গোটা তিরিশেক ব্যবসা-সফল হাউসফুল সিনেমা উপহার দেয়ার পরও হয়তো কোলকাতার পাঁচ-দশটা ঝকঝকে সিনেমা বানানো পরিচালকই আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে জঙ্গিরা তার সিনেমার প্রদর্শনে বোমা হামলা চালানোর কথা বললেও, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা বানানো পরিচালকদের লিস্টিতে তার নাম হয়তো থাকেই না। উৎসবগুলোতে তাকে জায়গা দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।

তবু শহীদুল ইসলাম খোকন থাকবেন। শহীদুল ইসলাম খোকনরা থাকবেন। তারা জঙ্গিদের হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করবেন। স্বৈরশাসকদের গলা-টিপে ধরা সময়েও কথা বলবেন। মানুষকে বার বার মনে করিয়ে দেবেন, মুক্তিযুদ্ধের কথা, বাংলাদেশের কথা। বিনিময়ে উপেক্ষা ছাড়া কিছুই নেবেন না। কারণ তারা মুক্তিযুদ্ধ-বাংলাদেশ-রুচি-উৎসব-অ্যাওয়ার্ড বিক্রি করার জন্য জন্মগ্রহণ করেন না। তারা মুক্তিযুদ্ধ-বাংলাদেশ-বাংলার মানুষের কথা বলার জন্য জন্মগ্রহণ করেন।

নাবীল অনুসূর্য
জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। স্কুলের পাঠ চুকিয়েছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে, ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে কলেজের পাঠ। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই ফিচার-সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ফেলোশিপ নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উপর একটি গবেষণার কাজ করছেন। গবেষণার বিষয় আমাদের চলচ্চিত্রে ’৫২-র উপস্থাপন: অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা। এছাড়াও ফ্রি-ল্যান্সিং লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে ও অন্যান্য মাধ্যমে।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বশেষ মন্তব্য

মুক্তির প্রতীক্ষিত

  • Sphulingo

সর্বশেষ খবরাখবর

ঈদের সিনেমা ‘অন্তরাত্মা’

ঝাকজমক পূর্ণ মহরতে শুরু হলো শাকিব খানের ঈদের সিনেমা ‘অন্তরাত্মা’

0
সম্প্রতি জানা গিয়েছিলো আগামী ঈদুল ফিতরে মুক্তির লক্ষ্যে নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ঢালিউড সুপারষ্টার শাকিব খান। তরঙ্গ এন্টারটেইনমেন্টের ব্যানারে নির্মিতব্য ‘অন্তরাত্মা’ নামের এই সিনেমাটি...
দীঘির প্রথম সিনেমার

দীঘির প্রথম সিনেমার ট্রেলারে সমালোচনার ঝড়: কি বললেন নির্মাতা?

0
বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় শিশুশিল্পী দীঘি। দর্শকদের ভালোবাসার পাশাপাশি শিশুশিল্পী হিসেবে পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শিশুশিল্পী থেকে তার দীঘির পরিপূর্ন নায়িকা হিসেবে আত্নপ্রকাশ নিয়ে সবার...
তৌকির আহমদের ‘স্ফুলিঙ্গ’

যে তিনটি কারনে আপনার দেখা উচিত তৌকির আহমদের ‘স্ফুলিঙ্গ’!

0
গত ৯ই ডিসেম্বর রাজধানীর বনানী ক্লাবে নতুন সিনেমা ‘স্ফুলিঙ্গ’ এর ঘোষনা দিয়েছিলেন আলোচিত নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। এই অনুষ্ঠানেই তিনি বলেছিলেন করোনার কারণে সেট ফেলে...
আবারো পেছালো 'এফ ৯'

আবারো পেছালো ‘এফ ৯’: জুনে দেখা যাবে ডমের পরিবারের পুনর্মিলনী

0
করোনা পরবর্তী সময়ে প্রেক্ষাগৃহে নতুন করে সিনেমা প্রদর্শনী শুরু হলেও বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি শুরু হয়নি এখনও। কিছু কিছু সিনেমা ইতিমধ্যে মুক্তির তারিখ ঘোষনা...
স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না

স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না: কতটুকু মনে আছে মান্নার সিনেমার যাত্রা

0
বাংলা সিনেমার অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় অভিনেতা মান্না। মৃত্যুর আগে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা। ভক্তদের ভালোবাসায় হয়েছেন স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না। নায়ক মান্না...

আরো পড়ুন