বৃহস্পতিবার, মার্চ ৪, ২০২১
Home মুভিব্লগ অ্যাকশন কিং জসিমঃ অসম্ভবকে সম্ভব করা সত্যিকারের এক নায়ক

অ্যাকশন কিং জসিমঃ অসম্ভবকে সম্ভব করা সত্যিকারের এক নায়ক

ছোটবেলায় আমি ও পাশের বাসার সমবয়সী বন্ধু ডাক্তার কাকার একমাত্র ছেলে রনি ‘আসামি হাজির’ নামের বাংলা চলচ্চিত্রের দুই চরিত্র ‘জগনু’ ও ‘ধর্মা’ নাম নিয়ে ডাকাত ডাকাত খেলতাম। রনি কখনও ডাকাত সর্দার ‘ধর্মা’ হয়ে আমাকে বলতো ‘জগনু তুই বাঘের খাঁচায় পা দিয়েছিস’ উত্তরে আমি জগনু বলতাম ‘আমি বাঘ তাই বাঘের খাঁচায় পা দিয়েছি’ এই ভাবে শুরু হতো আমাদের কথোপকথন যা একসময় মারামারিতে রুপ নিতো যাকে বলতে পারেন খেলার ছলে কুস্তি। কখনও আমি ডাকাত সর্দার ‘ধর্মা’ হতাম আবার কখনও সে হতো। মজার ব্যাপার হলো আমি যখন স্কুল থেকে এসে ভাত খেতাম না কিংবা আম্মুর কথা শুনতাম না তখন আম্মু আমাকে সেই ডাকাত সর্দার ধর্মা’র ভয় দেখাতেন আর আমিও দুষ্টুমি করে বলতাম ‘আমি জগনু হয়ে ধর্মাকে পানি না খাইয়ে মেরে ফেলবো।’ সেই ডাকাত সর্দার ধর্মাকে দেখলাম নায়ক হয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে যিনি পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্রের এক বিশাল জনপ্রিয় নায়ক হিসেবেই মৃত্যু বরন করেছেন এবং আজো নায়ক হিসেবেই আছেন। অবাক হয়ে গেলাম যে প্রায় ৫০ টি ছবির দুর্দান্ত খলনায়ক কিভাবে এতো জনপ্রিয় নায়ক হয়ে গেলেন তা ভেবে। …বন্ধুরা, এতক্ষনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি কার কথা বলছি? হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন মানুষের কথা বলছি যার নাম জসিম যিনি একই নামে খলনায়ক ও নায়ক হিসেবে অভিনয় করে বিরল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।

- Advertisement -

১৯৫১ সালের ১৪ই আগস্ট ঢাকার কেরানীগঞ্জে জন্ম গ্রহন করেছিলেন এই তারকা। জসিমের বাবা এ কে ফজলুর রহিম ছিলেন পুলিশ অফিসার। বাবার বদলির চাকরীর সূত্রেই ঢাকার নওয়াবগঞ্জের মূল বাড়ির বদলে কেরানীগঞ্জে জন্মগ্রহন করেছিলেন জসিম যার পুরো নাম এ কে জসিমউদ্দিন। ঢাকার আরমানিটোলা স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি ও পরবর্তীতে গ্রাজুয়েশন শেষ করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহন করেন। ছোটবেলা থেকে সপরিবারে সিনেমা হলে ছবি দেখার ফলে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ হোন। স্কুল জীবনেই পরিবারের অজান্তে পাড়া মহল্লায় বিভিন্ন কুস্তি প্রতিযোগিতায় জয়ি হয়ে পরিবারকে চমকে দিয়েছিলেন। জসিম কুস্তিগির সেটা পরিবারের কেউই জানতো না। কলেজ জীবনেই জাতীয় ক্রীড়া ফাউন্ডেশন থেকে জুডো শিখেন যা তাঁর প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র এবং বাংলাদেশের সর্বপ্রথম অ্যাকশন দৃশ্য যুক্ত হওয়া চলচ্চিত্র জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ ছবিতে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিল। জসিম গিয়েছিলেন রংবাজ ছবির শুটিং দেখতে সেখানে তৎকালীন সময়ের জনপ্রিয় নায়ক নায়করাজ রাজ্জাকের সাহেবের ধাক্কায় ছবির একজন অভিনেতা বার বার পড়ে যাচ্ছিল দেখে তিনি পাশ থেকে মন্তব্য করছিলেন যে ‘হচ্ছে না, এভাবে কেউ ধাক্কা খেয়ে কয়েক হাত দূরে পড়ে না’। জসিমের মন্তব্য শুনে পরিচালক জহিরুল হক সাহেব বলেছিলেন ‘এই ছেলে বারবার এমন মন্তব্য করছো কেন? তুমি কি জানো কিভাবে পরবে? জানলে দেখিয়ে দাও তো দেখি’। আর তখনই তরুন জসিম ঝটপট জুডোর কৌশল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন কিভাবে মারলে কিভাবে মাটিতে পরতে হয় তা। ব্যস, জহিরুল হকের মনজয় করে ছবিতে কয়েকটা দৃশ্য অভিনয় করে ফেললেন। এরপরেরটা ইতিহাস।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র যখন সামাজিক, রোমান্টিক ও ফোকধারা নিয়ে খুব ধীরে এগোচ্ছিল ঠিক তখনই প্রয়াত পরিচালক জহিরুল হক ‘রংবাজ’ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে অ্যাকশন দৃশ্য বা অ্যাকশন ধারার সাথে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচালক জহিরুল হক টেকনিক্যাল সুবিধা ও পেশাদার অ্যাকশন গ্রুপ ছাড়াই গুটিকয়েক ‘টিসুম টিসুম’ দিয়ে দর্শকদের অ্যাকশন ধারার সাথে মোটামুটি পরিচয় করিয়ে দেন মাত্র কিন্তু পরবর্তীতে বাংলা অ্যাকশন ছবির উত্তরনে মূল কাজটি করেন বাংলা চলচ্চিত্রে আসা নতুন সেই তরুন জসিম। জসিম তাঁর সাথে জুডো শেখা বন্ধুবান্ধব মীর এনামুল করিম আমান, মাহবুব খান গুই ও রুহুল আমিন বাবুল’দের নিয়ে পেশাদার ফাইটিং গ্রুপ তৈরি করেন যার নাম ‘জ্যাম্বস’(JAMB’S) ফাইটিং গ্রুপ ‘যা ছিল সবার নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি রংবাজ ছবি দিয়ে খুব ছোট চরিত্রে দিয়ে শুরু এরপর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রথম খলনায়ক হিসেবে অভিনেতা হিসেবে জসিম কে দর্শক দেখতে পায়।

- Advertisement -

যাইহোক এরপর খলনায়ক জসিম দোসানিকে আমরা পাই মাসুদ পারভেজের গুনাহগার, দস্যু বনহুর, দেওয়ান নজরুলের দোস্ত দুশমন, আসামি হাজির, বারুদ, ওস্তাদ সাগরেদ, জনি, কুরবানি, ধর্ম আমার মা, এ জে মিন্টুর মিন্টু আমার নাম, প্রতিজ্ঞা, বাঁধনহারা, শেখ নজরুলের আলী আসমা, ইবনে মিজানের ‘বাহাদুর’, অশোক ঘোষের ‘তুফান’, শফি বিক্রমপুরির রাজদুলারি সহ বক্স অফিস কাঁপানো ছবিগুলোতে। তবে দেওয়ান নজরুল এর ‘দোস্ত দুশমন’ ছবি দিয়ে আলোড়ন তুলেন আলাদাভাবে। এরপর খলনায়ক জসিমে ‘দোস্ত দুশমন’ ছবিতে সেই ডাকাত চরিত্রের অভিনয় দেখে ভারতের প্রখ্যাত অভিনেতা আমজাদ খান ভূয়সী প্রশংসা করেন। দেওয়ান নজরুলের ‘আসামি হাজির’ ছবির ডাকু ধর্মার সাথে ওয়াসিমের লড়াই দেখতে দর্শক সিনেমা হলের মূল গেইট ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করেছিল। ‘আসামি হাজির’ ছবির মুক্তির প্রথম দিনেই ঢাকার গুলিস্থান সিনেমা হলের কলাপ্সিবল গেইট ভেঙ্গে ফেলেছিল বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা অস্থির দর্শকরা। ‘আসামি হাজির’ ছবির দীর্ঘ ২০ মিনিটের শেষ ফাইটিং দৃশ্যটা দর্শক মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে উপভোগ করেছিল। এতো লম্বা শেষ ফাইটিং দৃশ্য বাংলা চলচ্চিত্রের আমি এরপর আর দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সব ছবিতেই জসিম ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে হাজির হতেন এবং জসিম বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে স্টাইলিশ, স্মার্ট খলনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। তবে খলনায়কের পাশাপাশি এরমধ্যে জসিম ‘সোহাগমিলন’ ছবিতে খলনায়ক না হয়ে ২য় নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছিলেন। সবগুলোতেই জসিম ছিলেন খলনায়ক।

এরপর ৮০র দশকের শুরুর দিকে পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝনটু’র পরামর্শে সুভাষ দত্তের ‘সবুজ সাথী’ ছবির মাধ্যমে নায়ক চরিত্রে পর্দায় হাজির হোন যেখানে দর্শক জসিমকে একটিবারও কোন অ্যাকশন দৃশ্য অভিনয় করতে বা কারো সাথে মারামারি করতে দেখেনি। মজার ব্যাপার হলো ‘সবুজসাথী’ মুক্তি পাওয়ার পর জসিম ২দিন ঘর থেকে বের হোননি যে দর্শক তাঁকে নতুন রুপে গ্রহন করবে কি করবে না এই চিন্তায়। কিন্তু প্রথম ২দিনের মন্দাভাব কাটিয়ে হুট করে সারা বাংলাদেশে ‘সবুজ সাথী’ ছবিটি সুপারহিট হয়ে যায় অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের সিনেমা পাগল দর্শক নতুন জসিমকে গ্রহন করেছে। জসিমের বাসায় প্রযোজকদের ভিড় লেগে গেলো নতুন ছবিতে নতুন জসিমকে দেখানোর জন্য। খলনায়ক থেকে নায়ক চরিত্রে এসেও জসিম ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন যার ফলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নায়ক জসিম হিসেবেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন ও আজো আছেন। বাংলা চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত খলনায়ক থেকে দুর্দান্ত নায়ক হওয়ার রেকর্ড আর একটিও পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে হলিউডের ‘সুপারহিরো’ ট্র্যাডিশনটা সার্থকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন জসিম। যার ফলে সেইসময়ের দর্শকদের মাঝে বেশ বড় একটা অংশের কাছে জসিম ছিলেন অন্যরকম এক উম্মাদনার নাম। জসিম মানেই ‘অসম্ভবকে সম্ভব করা’ কোন বীরপুরুষ, কোন সুপারহিরো। জসিম মানেই ঘাত প্রতিঘাত, বাধা বিপত্তি জয় করা এক দুর্দান্ত সাহসি কোন মানুষ। মজার ব্যাপার হলো আমি সিনেমা হলে যতবার অস্থির, উত্তেজিত, উচ্ছৃঙ্খল দর্শকদের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেখেছিলাম তাঁর প্রায় ৭০% ঘটনাই ঘটেছিল নায়ক জসিমের ছবির বেলায়। টিকেট নিয়ে মারামারি, সিট নিয়ে মারামারি জসিমের ছবি দেখতে এসব যেন নিত্য দিনের ঘটনা ছিল। এরকারন হলো সুপারহিরো জসিমের জনপ্রিয়তা। দর্শক জসিমের ছবি দেখতে এসে সিনেমা হলের বাহিরে বেশিক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার ধৈর্য রাখতে পারতো না। ৯০ দশকের তরুন দর্শক যারা সালমান সানির চরম ভক্ত তাঁরাও জসীমের ভক্ত ছিলেন। আমার এক বন্ধু ছিল জসিমের মত মোটাসোটা এবং চেহারাটাও জসীমের সাথে অনেক মিল তাই যাকে আমরা ‘জসিম’ বলে ডাকতাম। সেই বন্ধুটি সালমানের দারুন ভক্ত কিন্তু জসিমের ছবি মুক্তি পেলে সবার আগে গিয়ে দেখে আসতো। পর্দায় জসিম যখন ভিলেনদের মারতেন তখন সে উত্তেজনায় সিটে বসা থেকে দাঁড়িয়ে ঘুষি দেখিয়ে ”মার মার” বলে চিৎকার করতো যা অন্য কোন নায়কদের ছবি বেলায় তাঁকে আমি কোনদিন করতে দেখিনি। জসীমের ছবি যাদের সিনেমাহলে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাঁরা কোনদিনও বুঝতে পারবে না যে জসিম কতটা জনপ্রিয় ছিল এবং তাদের কাছে জসীমের গল্প রুপকথার গল্পের মতোই লাগবে। জসীমের ছবি মানেই আমজনতার সুখ দুঃখ ও জীবন সংগ্রামের গল্প যার ফলে জসিমকে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের বিরাট একটি অংশ পাগলের মতো ভালোবাসতো। নায়ক হিসেবে জসিম এর জনপ্রিয় ছবিগুলো হলো ‘মোহাম্মদ আলী’, ‘রকি’, ‘হিরো’, ‘অশান্তি’, ‘বৌমা’, ‘স্বামীর আদেশ’, ‘টাকা পয়সা’, ‘অভিযান’, ‘পরিবার’, ‘সারেন্ডার’, ‘ভাই আমার ভাই’, ‘ভাইজান’, ‘গর্জন’, ‘বিজয়’, ‘লালু মাস্তান’, ‘অবদান’, ‘ন্যায় অন্যায়’, ‘লোভ লালসা’, ‘আদিল’, ‘কাজের বেটি রহিমা’, ‘এক্সিডেন্ট’, ‘উচিৎ শিক্ষা’, ‘লক্ষ্মীর সংসার’, ‘মাস্তান রাজা’, ‘কালিয়া’, ‘ওমর আকবর’, ‘ দাগি সন্তান’, ‘ সম্পর্ক’, ‘শান্তি অশান্তি’, ‘বিস্ফোরণ’, ‘গরীবের প্রেম’, ‘শত্রুতা’, ‘নিষ্ঠুর’, ‘পাষাণ’, ‘হিংসা’, ‘ভাইয়ের আদর’ , ‘হাতকড়া’ , ‘ডাকাত’ ‘ বাংলার নায়ক’, ‘রাজাবাবু’, ‘রাজাগুণ্ডা’, ‘আখেরি মোকাবেলা’, ‘বীর বাহাদুর’, ‘ঘাত প্রতিঘাত’ ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘টাইগার’ সহ অসংখ্য অসংখ্য ছবি যা তাঁকে এনে দেয় ‘অ্যাকশন কিং’ খেতাব। খলনায়ক জসিমের যেমন ভক্ত ছিলাম ঠিক তেমনি নায়ক জসিমের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম শুধু মাত্র তাঁর অভিনয় গুন, স্টাইলের কারণে। জসিম যেমন ধুমধাম অ্যাকশন, গরিব দুখী মানুষের সাহসি নায়ক ঠিক তেমনি ছিলেন খুব অসহায় নায়ক যিনি ‘সারেন্ডার’, ‘ভাইয়ের আদর’, ‘অবদান’, ‘লক্ষির সংসার’ সহ অসংখ্য পারিবারিক রোমান্টিক ছবিতে প্রমাণ করেছিলেন।

‘সারেন্ডার’ ছবির সেই ব্যর্থ প্রেমিক জসীমের করুন মুখটি আজো সেদিনের দর্শকরা হয়তো ভুলতে পারেনি। যে শাবানার সাথে নায়ক জসিম সুপারহিট হয়েছিলেন সেই শাবানার পাশেই ভাইয়ের চরিত্রে জসিম সুপারহিট হলেন। শাবানার প্রেমিক, স্বামী হিসেবে জসিম যেমন দারুন ঠিক তেমনি শাবানার বড়/ছোট ভাইয়ের চরিত্রেও জসিম দুর্দান্ত যা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পরিচালকরা জসিমকে সব ভাবেই সদ্ব্যবহার করেই সফলতা পেয়ছিলেন যা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অভিনেতা জসিমের একটি মজার তথ্য না দিয়ে পারছি না তা হলো জসিম কখনও কোন ছবিতে জুনিয়র নায়ক নায়িকাদের বুড়ো বাবা’র চরিত্রে অভিনয় করতে চাইতেন না শুধু মাত্র অ্যাকশন দৃশ্য দর্শক যদি তাঁকে গ্রহন না করে বা অ্যাকশন দৃশ্য অভিনয় করার সুযোগ যদি পরিচালক না দেন সেই কারণে। বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতে অ্যাকশন ছবির উত্তরনে জসীমের অবদানের জন্যই তাঁকে ‘অ্যাকশন কিং’ উপাধি দেয়া হয়েছিল ।বাংলাদেশের জসীমের ‘সোহাগ মিলন’ ও ‘কাজের বেটি রহিমা’ ছবির দুটি গানেও জসিম কণ্ঠ দিয়ে জসিম নিজের প্রতিভার আরেকটি স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন।

অভিনয় জীবনে জসিম কাজ করেছিলেন জহিরুল হক, সুভাষ দত্ত, ইবনে মিজান, আজিজুর রহমান, আলমগির কুমকুম, দেওয়ান নজরুল, এ জে মিন্টু, ফজল আহমেদ বেনজির, মোতালেব হোসেন, দেলোয়ার জাহান ঝনটু, সিদ্দিক জামাল নানটু, এফ আই মানিক, শফি বিক্রমপুরি সহ দেশসেরা সব পরিচালক প্রযোজকদের সাথে। স্বাধীনতার পর আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে জসিমের অবদান অনস্বীকার্য। কারন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ধারার প্রবর্তক এবং ‘ফাইটিং গ্রুপ’ এর শুরুটা জসিমের হাত ধরেই। আজকের অনেক ফাইট ডিরেক্টর ও স্টেনটম্যান’রা জসিমের ছাত্র ছিলেন। শুধু ফাইটিং ডিরেক্টর নয় প্রযোজক হিসেবেও জসিম ছিলেন খুবই সফল যার প্রযোজনা সংস্থা ‘জ্যাম্বস’ এর অনেক ছবি আছে বক্সঅফিস কাঁপানো ও ব্যবসাসফল। দেওান নজরুলের সুপারহিট ‘দোস্ত দুশমন’ ছবিটি ছিল যেমন দেওয়ান নজরুলের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ঠিক তেমনি তা ছিল ‘জ্যাম্বস’ এর প্রথম ছবি। যদিও ‘জ্যাম্বস’ গ্রুপের পেছনে জসিমের বন্ধু মাহবুব খান গুই, মির এনামুল করিম আমান ও রুহুল আমিন বাবুল ছিলেন তবুও জ্যাম্বস বলতে দর্শকরা জসিমের প্রতিষ্ঠানই বুঝে। শুধু অভিনয়ে নয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পেশাদার ফাইটিং গ্রুপের ফাইটারদেরও গুরু ছিলেন জসিম। জসিম হলেন বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের প্রথম ফাইট ডিরেক্টর যার হাত ধরে ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম, আরমান, চুন্নু, মোসলেমদের মতো ফাইট ডিরেক্টররা এসেছেন।

জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’ ছবিতে জসিমের গেয়ে উঠেছিলেন ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়/কেউ পায় কেউবা হারায়/তাতে প্রেমিকের কি আসে যায়’ …সেই ছবিতে জসিম ভালবাসার মানুষটিকে না পেলেও সারাজীবন মানুষটিকে ভালোবেসে গিয়েছিলেন এবং ভালোবাসার মানুষটির বুকের ধন একমাত্র শিশু পুত্রটির জীবন বাঁচিয়ে দিয়ে নিঃস্বার্থ এক প্রেমিক হিসেবে দর্শকদের মনে ঠাই করে নিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের জসিমও সারেন্ডার ছবির সেই চরিত্রটির মতোই রয়ে গেলেন। যে জসিম চলচ্চিত্রকে ভালোবাসে আধুনিক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে উত্তরণে নিবেদিত ছিলেন, যে জসিম নিজের মেধা, অভিনয়, শ্রম, আন্তরিকতা, সততা দিয়ে যেমন প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, দর্শকসহ মানুষের মন জয় করে নিয়েছিলেন ঠিক তেমনি ব্যক্তিগত জীবনে অনেক বড় মনের মানুষ হিসেবেও আশাপাশের সকল মানুষের মন জয় করে ‘কিং’ হয়ে নীরবে আজো বেঁচে আছেন ও থাকবেন। আজকের আধুনিক দুর্ভাগা ও অকৃতজ্ঞ জাতি চলচ্চিত্রের ‘অ্যাকশন কিং’ জসিমকে মনে না রাখলেও তাতে কিছু যায় আসবে না। জসিম বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আকাশে চিরদিন উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হয়েই জ্বলবেন চিরদিন তাতে অন্ধরা না দেখলেও জসিমের কিছু যায় আসবে না। জসিম ঠিকই তাঁর ভক্তদের মনে চিরিদন রয়ে যাবেন। জসিমের মতো নিঃস্বার্থ, খাঁটি চলচ্চিত্রপ্রেমী বাংলা চলচ্চিত্রে আর আসবে না। ১৯৯৮ সালের ৮ই অক্টোবর মস্তিস্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আমজনতার জনপ্রিয় নায়ক অ্যাকশন কিং জসিম। জসিম শুধুই বাংলা চলচ্চিত্রের একজন জনপ্রিয় নায়কের নাম নয় ‘জসিম’ বাংলা চলচ্চিত্রের সাফল্য ও পরিবর্তনের একটি অধ্যায়ের নাম।

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বশেষ মন্তব্য

মুক্তির প্রতীক্ষিত

  • Sphulingo

সর্বশেষ খবরাখবর

‘দৃশ্যাম’ ভক্ত পরীক্ষা

‘দৃশ্যাম’ ভক্ত পরীক্ষা: কতটা মনোযোগ দিয়ে দেখলেন?

0
২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মালায়লাম মেগাষ্টার মোহনলাল অভিনীত সিনেমা ‘দৃশ্যাম’ বছরের সবচেয়ে বড় ব্যবসা সফল সিনেমা ছিল। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে সিনেমাটি তামিল, তেলুগু, কন্নড়...
আলিয়া ভাটকে নিয়ে

আলিয়া ভাটকে নিয়ে রোড ট্রিপে যাচ্ছেন নির্মাতা ফারহান আকতার!

0
২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'ডন ২' সিনেমার পর আবারও পরিচালনায় ফিরছেন নির্মাতা-অভিনেতা ফারহান আকতার। জানা গেছে 'জিন্দেগী না মিলে দোবারা' এরমত সিনেমা নিয়ে পরিচালনায় ফিরছেন...
বাতিল হয়নি 'চন্দ্রমুখী ২'

বাতিল হয়নি ‘চন্দ্রমুখী ২’: জানালেন রাগভ লরেন্স নিজেই

0
এই মুহূর্তে তামিল নির্মাতা-অভিনেতা রাগভ লরেন্স ব্যস্ত আছেন তার নতুন সিনেমা 'রুদ্র' এর কাজে। গত অক্টবরে তার জন্মদিনে সিনেমাটির ফার্ষ্ট লুক প্রকাশ করেছিলেন এই...
‘ওয়ার’ সিনেমার সিক্যুয়েলে

‘ওয়ার’ সিনেমার সিক্যুয়েলে ফিরছেন টাইগার শ্রফ: জানালেন নিজেই

0
২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিদ্ধার্ত আনন্দ পরিচালিত ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘ওয়ার’-এ অভিনয় করেছিলেন হৃত্বিক রোশান এবং টাইগার শ্রফ। হৃত্বিকের বিপরীতে দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে তাকে লাগিয়ে দেন...
ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় ঢালিউড

মার্চে মুক্তি পাচ্ছে একাধিক সিনেমাঃ ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় ঢালিউড

0
পুরো বিশ্বের মত করোনা মহামারীর কারনে বাংলাদেশেও বন্ধ ছিলো হলে সিনেমার প্রদর্শনী। নতুন প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করা ঢালিউডের চলচ্চিত্র অঙ্গনেও নেমে আসে স্থবিরতা। সিনেমার...

আরো পড়ুন