Home মুভিব্লগ জাফর ইকবালঃ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বহুমুখী প্রতিভার এক অবহেলিত নায়ক

জাফর ইকবালঃ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বহুমুখী প্রতিভার এক অবহেলিত নায়ক

১৯৭০ সালে খান আতার ‘আপন পর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জাফর ইকবালের চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে। সেই হিসেবে চলচ্চিত্রে জাফর ইকবাল ছিলেন সোহেল রানা, জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চনদেরও সিনিয়র অর্থাৎ রাজ্জাক, ফারুক, আলমগির, বুলবুলদের সমসাময়িক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো স্টাইলিশ ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী জাফর ইকবালের চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ার রাজ্জাক, আলমগির, বুলবুলদের মতো এতো রঙিন হয়নি, এমনকি জুনিয়র সোহেল রানা, ইলিয়াস কাঞ্চন, জসিমদের মতো জাফর ইকবালের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়নি। জাফর ইকবাল ‘মেগাস্টার’, ‘সুপারস্টার’ কিংবা ‘অ্যাকশন কিং’ এর মতো কোন উপাধিও পাননি। আমার কথার সাথে আজ অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন কিন্তু আমার সমবয়সী যারা চলচ্চিত্রের নিয়মিত দর্শক তাঁরা অধিকাংশই আমার কথার সাথে একমত পোষণ করবেন।

- Advertisement -

এবার একটু সংক্ষেপে বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। জাফর ইকবালের চলচ্চিত্রের আগমন ঠিক স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছু আগে। তখন পুরো চলচ্চিত্র ছিল রাজ্জাকময়। আলমগির, ফারুক, বুলবুলরাও তখনও থিতু হোননি। স্বাধীন বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ও বিস্তৃতি যখন ঘটে তখন রাজ্জাকের পাশাপাশি আলমগির, ফারুক, বুলবুলরা থিতু হতে লাগলেন অন্যদিকে আগমন ঘটে সোহেল রানা, উজ্জ্বল, ওয়াসিমের মতো একাধিক তরুণ যার কিছুদিন পর ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আগমন ঘটে ইলিয়াস কাঞ্চনের। ইলিয়াস কাঞ্চন আসার আগ পর্যন্ত আলমগির মধুমিতা, মাটির মানুষ, ঝুমকা, মনিহার, ফারুক লাঠিয়াল, সারেং বউ এর মতো চলচ্চিত্র দিয়ে দর্শকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে জাফর ইকবাল তখনও একক নায়ক হয়ে তেমন সাফল্য পাননি। কিন্তু জাফর ইকবালকে অন্যদের চেয়ে একটু বেশি মেধাবি মনে হতো।

৭০-৮০র দশক স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় যখন সারাদেশে চলচ্চিত্র শিল্প বেশ নাড়া দিয়েছে এবং সিনেমা হলের সংখ্যাও দিনকে দিন বাড়ছিল। এই এক দশকে জাফর ইকবালের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখবেন বেলাল আহমেদের ‘নয়নের আলো’, আজহারুল ইসলাম খানের ‘অবুঝ হৃদয়’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘সন্ধি’, ‘যোগাযোগ’, ইলতুতমিশের ‘মাই লাভ’, ‘প্রেমিক’ ব্যতীত একক বা কেন্দ্রিয় নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রের সংখ্যা নেই বললেই চলে। ঐ একই সময়ে জাফর ইকবালের অভিনীত ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রগুলো ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘বেদীন’, দিলিপ বিশ্বাসের ‘আশীর্বাদ’, ‘অপেক্ষা’, ‘অবদান’, ‘গর্জন’, ‘বিস্ফোরণ’, ‘ভাইবন্ধু’, ‘সাহস’, ‘আদেশ’, ‘প্রতিরোধ’, ‘উসিলা’, ‘সাজানো বাগান’, ‘ আকর্ষণ’, ‘লায়লা আমার লায়লা’, ‘জবাব চাই’, ‘মিসলংকা’র মতো চলচ্চিত্রগুলোতে ছিল আলমগির, জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, উজ্জ্বল, ওয়াসিম, ফারুক, সোহেল রানা’র মতো অন্য জনপ্রিয় নায়কেরা যেখানে জাফর ইকবালের চরিত্রের চেয়ে অন্যদের গুরুত্ব একটু বেশী ছিল। অর্থাৎ জাফর ইকবাল ছবিতে থাকলেও কিংবা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে থাকলেও উল্লেখিত চলচ্চিত্রগুলোতে দর্শকদের কাছে জাফর ইকবালের চেয়ে অন্যদের জনপ্রিয়তা বেশী ছিলো এবং চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসা সফল হওয়ার পেছনে কৃতিত্বটা কখনও আলমগির, কখনও কাঞ্চন , কখনও জসিমের উপর গিয়ে পড়েছে। এমনকি সন্ধি, যোগাযোগ চলচ্চিত্রে জাফর ইকবাল খুব ভালো অভিনয় করলেও চলচ্চিত্রগুলোর সাফল্যর কৃতিত্বটা ‘বুড়ো’ রাজ্জাকের উপর পড়েছিল।

- Advertisement -

দারাশিকোর ‘ভাইবন্ধু’ চলচ্চিত্রে জাফর ইকবালের খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল এবং অভিনয়ও দারুন ছিল কিন্তু ‘ভাইবন্ধু’ চলচ্চিত্রের সাফল্যর পেছনে ইলিয়াস কাঞ্চনের চরিত্র ও অনবদ্য অভিনয়কেই সবাই কৃতিত্ব দিবে আগে কারণ ছবিটি দেখলে যে কেউই মনে করবে ‘ভাইবন্ধু’ রুপে এখানে ইলিয়াস কাঞ্চনকেই বুঝানো হয়েছে কারণ ছবির গল্পে কাঞ্চনই পথে ভিক্ষা করা অন্ধ জাফর ইকবালকে রাস্তা থেকে তুলে এনে অন্য এক জীবন দিয়েছিলেন কাঞ্চন এবং একেবারে শেষ দৃশ্যর আগ পর্যন্ত কাঞ্চনই সবসময় সেক্রিফাই করে গেছে সব পরিস্থিতে। ঠিক একই রকম দর্শকদের মাঝে জাফর ইকবালের চেয়ে বেশী গুরুত্ব কাঞ্চন পেয়েছে শিবলি সাদিকের ‘আদেশ’, ফজল আহমেদ বেনজিরের ‘প্রতিরোধ’, জসিম পেয়েছে জহিরুল হকের ‘সাহস’ ‘গর্জন’, হাফিজউদ্দিনের ‘অবদান’, এফ আই মানিকের ‘বিস্ফোরণ’ চলচ্চিত্রে।

জাফর ইকবালকে পর্দায় দেখে কখনও মনে হয়নি উনি চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ারে খুব বেশী সচেতন ছিলেন এবং নিজের চরিত্রগুলো সম্পর্কে খুব বেশী সচেতন ছিলেন অথচ জাফর ইকবালের জনপ্রিয়তা বেশ ভালোই ছিল তখন। জাফর ইকবালকে রোমান্টিক চরিত্রের বাহিরে খুব বেশী অভিনয় করার মতো চরিত্র খুব বেশী দেখা যায়নি বা সামাজিক অ্যাকশন, কমেডি কোন ধারার চরিত্রে জাফর ইকবাল নিজেকে একাই যথেষ্ট প্রমাণ করতে পারেননি। অন্য নায়কদের সাথে জাফর ইকবালের বেশিরভাগ চরিত্র ছিল পুলিশের আর বাকী গুলোতে একই রকম রোমান্টিক চরিত্র। জাফর ইকবালের জনপ্রিয়তাটা ছিল একটা শ্রেণী নির্ভর অর্থাৎ শহুরে শিক্ষিত শ্রেণী নির্ভর যেখানে অন্য নায়কদের জনপ্রিয়তা ছিল সব শ্রেণীর দর্শকদের মাঝে যার ফলে জাফর ইকবালের প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও প্রযোজক পরিচালকরা খুব বেশী পরীক্ষা নিরীক্ষা করেননি বা জাফর ইকবালকে নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী কোন কিছু করার চেস্টা করেননি। জাফর ইকবালকে সবসময় একটা গণ্ডীর ভেতর রেখেই পর্দায় উপস্থাপন করা হতো।

ব্যক্তিগত জীবনেও জাফর ইকবাল ছিলেন খুব বেশী বেপরোয়া ধারার জীবন যাপনে অভ্যস্ত। চলচ্চিত্র পাড়ায় জাফর ইকবালের সাথে কখনও ববিতা, কখনও চম্পাকে নিয়ে নানারকম মুখরোচক আলোচনা/স্ক্যান্ডাল সেই সময় ছড়িয়ে পড়েছিল, যার ফলে জাফর ইকবালের উপর নির্ভর করে খুব বেশী রিস্কে/ঝুঁকিতে যায়নি প্রযোজক পরিচালকরা অথচ সেই একই সময়ে ইলিয়াস কাঞ্চন, জসিমরা তরতর করে সামনের দিকে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছিলেন রোমান্টিক, সামাজিক অ্যাকশন, ফ্যামিলি ড্রামা, ফোক ফ্যান্টাসি সহ সব ধারার চলচ্চিত্রে নিজেদের প্রমাণ যোগ্যতা প্রমাণ করে । অথচ কাঞ্চন, জসিমের চেয়েও আরও বেশী এগিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা ছিলো জাফর ইকবালের বেশী যার সদ্ব্যবহার তিনি করতে পারেননি।

জাফর ইকবাল শুধুই একজন ‘স্টাইলিশ’ কিংবা ‘ফ্যাশনেবল’ হিরো হিসেবে রয়ে গেছেন দর্শকদের মাঝে যেখানে চলচ্চিত্রে জাফরের প্রায় ১০ বছরের জুনিয়র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন হয়েছিলেন ‘সুপারস্টার’ অভিনয় জীবনের শুরুতে খলনায়ক থেকে পরে নায়ক হওয়া জসিম হয়েছিলেন ‘অ্যাকশন কিং’ আর ১৫ বছরের জুনিয়র অভিনেতা মান্না হয়েছিলেন ‘মহানায়ক’। জাফর ইকবাল সারাজীবন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বহুমুখী প্রতিভার এক অবহেলিত নায়ক হিসেবেই রয়ে গেলেন যার দায়টা প্রযোজক, পরিচালক, দর্শকদের চেয়ে জাফর ইকবালের নিজের।

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বশেষ মন্তব্য

মুক্তির প্রতীক্ষিত

  • বিদ্রোহী (Bidrohi)

সর্বশেষ খবরাখবর

আমির খানের সিনেমা দিয়ে বলিউডে অভিষিক্ত হচ্ছেন তেলুগু তারকা নাগা চৈতন্য

0
বলিউডের অন্যতম প্রত্যাশিত সিনেমা আমির খান অভিনীত 'লাল সিং চাড্ডা'। টম হ্যাঙ্কস অভিনীত হলিউডের কালজয়ী সিনেমা 'ফরেষ্ট গাম্প' সিনেমার অফিসিয়াল রিমেক হতে যাচ্ছে 'লাল...

‘বুবুজান’ মাহিয়া মাহিঃ আর শান্তর বিপরীতে থাকছেন নিশাত সালওয়া

0
গত বছর ডিসেম্বরে প্রযোজনা সংস্থা শাপলা মিডিয়া ঘোষনা করেছিলো নারী নির্যাতন নিয়ে সিনেমা ‘বুবুজান’ নির্মানের। ঘোষনার সাথে সিনেমাটির ফার্ষ্ট লুক পোষ্টারও প্রকাশ করেছিলো শাপলা...

কবে শুরু হচ্ছে শাহরুখ খান এবং রাজকুমার হিরানির সিনেমা? জেনে নিন বিস্তারিত

0
'জিরো' সিনেমার পর এখন পর্যন্ত কোন সিনেমার আনুষ্ঠানিক ঘোষনা দেননি বলিউড বাদশা শাহরুখ খান। তবে সিদ্ধার্ত আনন্দ পরিচালিত 'পাঠান' সিনেমার মাধ্যমে চলতি বছরে বড়...

[ভিডিও] পৃথ্বীরাজ সুকুমারানের নতুন সিনেমা ‘জানা গানা মানা’ এর প্রমো প্রকাশ

0
ভারতের স্বাধীনতা দিবসে প্রকাশ করা হলো পৃথ্বীরাজ সুকুমারান এবং সুরোজ ভেঞ্জারামুদু অভিনীত একশন সিনেমা 'জানা গানা মানা' এর প্রমো। প্রোমোতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুখোমুখি দেখা...

শুটিং শেষে শুরু হলো ‘অপারেশন সুন্দরবন’ সিনেমার ডাবিং: শীঘ্রই মুক্তির ঘোষনা

0
চলতি বছরের মুক্তি প্রতীক্ষিত অন্যতম আলোচিত সিনেমা ‘অপারেশন সুন্দরবন'। দীপঙ্কর দীপন পরিচালিত তারকাবহুল সিনেমাটির চিত্রায়ন ইতিমধ্যে শেষ করেছেন এর নির্মাতা। শুটিং শেষে এখন চলছে...

আরো পড়ুন