শুক্রবার, মার্চ ৫, ২০২১
Home মুভিব্লগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের 'কমান্ডার'

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘কমান্ডার’

১৯৯১-৯৬ সাল পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের তালিকা যদি দেখেন তাহলে মনে হবে ধ্বংস হওয়ার আগে আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি যেন শেষবারের মতো জ্বলে উঠেছিল। ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘দাঙ্গা’, ‘সিপাহী’, ‘ত্রাস’, ‘চাঁদাবাজ’, ‘দেশপ্রেমিক’, ‘ঘাতক’ এর মতো সাহসী রাজনৈতিক ছবিগুলো ঐ সময়ে নির্মিত। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘একাত্তরের যীশু’ এর মতো বিকল্পধারার চলচ্চিত্রগুলোও একই সময়ে। ‘পিতা মাতা সন্তান’, ‘লক্ষ্মীর সংসার’, ‘অবুঝ সন্তান’, ‘বাংলার বধু’, ‘সংসারের সুখ দুঃখ’, ‘চাকরানী’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘অজান্তে’র মতো পারিবারিক গল্পের ছবিগুলোও ঐ একই সময়ে নির্মিত। ‘সন্ত্রাস’, ‘অপহরণ’, ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘রাক্ষস’, ‘শত্রু ভয়ংকর’, ‘ঘাত প্রতিঘাত’, ‘দোলা’, ‘স্নেহ’, ‘পালাবি কোথায়’, ‘বিদ্রোহী কন্যা’, ‘আখেরি রাস্তা’, ‘প্রথম প্রেম’ এর মতো অসংখ্য পরিছন্ন বিনোদনধর্মী ছবিগুলোও ঐ একই সময়ে নির্মিত। এমন কি সিনিয়র নায়ক আলমগীর, সোহেল রানা, জসীম, ইলিয়াস কাঞ্চন, শাবানা, ববিতার মতো অভিনেতা অভিনেত্রীদের একাধিক সফল ছবি ঠিক তেমনি তরুন রুবেল, মান্না ও নবাগত সালমান শাহ, ওমর সানি, মৌসুমি ,শাবনুর এর মতো অভিনেতা অভিনেত্রীদের সেরা ছবিগুলো ঐ একই সময়ে নির্মিত যা দিয়ে আমরা সেদিন ভারতীয় আগ্রাসন রুখতে পেরেছিলাম। সেই সময়ের ধারাবাহিকতা যদি আমরা ধরে রাখতে পারতাম তাহলে আজ এই ইন্ডাস্ট্রির এতো পতন হতো না।

- Advertisement -

সেই জ্বলে উঠা শেষ সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘কমান্ডার’। প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদির সেরা অভিনীত ছবিগুলোর একটি এই ‘কমান্ডার’ ছবিটি। এই ছবিটা মুক্তি পাওয়ার পর বন্ধুদের সাথে সিলেটের মনিকা হলে দেখেছিলাম এই ছবিতে সম্ভবত নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথমবারের মতো শহিদুল ইসলাম খোকনের ছবিতে অভিনয় করেন যা রুবেল বিহীন পরিচালক খোকনেরও প্রথম ছবি ছিল। হুমায়ূন ফরিদি এই ছবিতে তেলমাখা সিঁধেল চোরের যে অভিনয়টা করেন সেটা বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতে কোন অভিনেতার চোরের চরিত্রে ক্লাসিক অভিনয়।

ছবির গল্পে কুসুমপুর গ্রামের সবাই সিঁধেল চোর ফরিদির যন্ত্রণায় অস্থির। প্রতি রাতেই ফরিদি কারো না কারো বাড়িতে চুরি করে। একদিন চুরি করতে গিয়ে গ্রামেরবাসির হাতে ধরা খায়। সেই বিচারে ইলিয়াস কাঞ্চনের বাবা ফরিদিকে শাস্তি দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। কাঞ্চন ও সুবর্না মোস্তফা একই গ্রামের দুই গৃহস্থের সন্তান যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। ইতিমধ্য দেশে স্বাধীনতার যুদ্ধ লেগে গেলে কাঞ্চন যুদ্ধে যায় আর সুবর্না নিজগ্রামে ফিরে আসে। মুক্তিযুদ্ধে কাঞ্চনের সেক্টর কমান্ডার থাকেন সোহেল রানা। সোহেল রানাই কাঞ্চনকে যুদ্ধের ট্রেনিং দেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অপারেশনে কাজে লাগান। একদিন কুসুমপুর গ্রামে পাকবাহিনী ক্যাম্প করলে ফরিদি পাকিদের আস্থা অর্জন করে। ফরিদি নিজেকে চোর হিসেবে পরিচয় দিয়ে পুরো গ্রামের সব বাড়ীর খবর জানে সেই কারণে পাকবাহিনী তাকে সোর্স হিসেবে কাজে লাগায়। ফরিদি পাকবাহিনীকে দিয়ে কাঞ্চনের বাবাকে হত্যা করায়। এরপর সুবর্নাদের বাড়িতে লুট করাতে গিয়ে সুবর্নাকে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিলে সুবর্না হুমায়ূন ফরিদিকে আঘাত করে পালিয়ে যায়। একদিন পাকবাহিনীর কমান্ডার ফরিদি কিভাবে গ্রামের বাড়ী বাড়ী চুরি করতো সেটা অভিনয় করে দেখাতে বললে ফরিদি মেজরের সিন্দুকে থাকা টাকা পয়সা ও অলংকারাদি নিয়ে পালিয়ে যায়। মেজর ভাবে এটা ফরিদির অভিনয় কিন্তু চতুর ফরিদি সবকিছু নিয়ে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যায়। এভাবেই চতুর ফরিদি চোর থেকে অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যায়।

- Advertisement -

দেশ স্বাধীনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম একটি জায়গায় দেশের খনিজ বিশেষজ্ঞরা গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পায়। সেই দুর্গম অঞ্চলে ছদ্মবেশি ফরিদির আস্তানা। পুরো এলাকা ফরিদির নিয়ন্ত্রণে। ফরিদি চায় গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা নতুবা সেই গ্যাস ক্ষেত্রের নকশা চুরি করে বিদেশীদের হাতে তুলে দিতে বিপুল অর্থের মালিক হতে। সেই কারণে ফরিদি খনিজ বিশেষজ্ঞদের টীমসহ অনেককে অপহরণ করে নিয়ে যায় যাদের মুক্তিপণ হিসেবে সে গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা পেতে সরকারের সাথে দেনদরবার করে। ফরিদির কাছ থেকে গ্যাসক্ষেত্রটি ও অপহৃত বিশিষ্ট নাগরিকদের উদ্ধারের অভিযানের দায়িত্ব পড়ে সোহেল রানার উপর যেখানে ইলিয়াস কাঞ্চন থাকে তাঁর সহযোগী।মোটামুটি এই হলো সংক্ষেপে কমান্ডার সিনেমার গল্প। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে দুইভাগে গল্পটা সাজিয়েছেন শহিদুল ইসলাম খোকন। আর এই গল্পের মাধ্যমে পরিস্থিতি যায় হোক স্বাথলোভীদের স্বার্থের জন্য খারাপ কাজ কখনোই থামে না – এই প্ৰতিপাদ্যি বিষয়ই উঠে এসেছে সিনেমায়।

‘কমান্ডার’ সিনেমার নাম ভূমিকায় থাকেন সোহেল রানা। সোহেল রানা নাম ভূমিকায় থাকলেও সিনেমাটির প্রধান নায়ক/কেন্দ্রীয় নায়ক হলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাঞ্চনের ভূমিকা বেশি। পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন খুবই চমৎকারভাবে মুক্তিযুদ্ধের আগের ও পরের প্রেক্ষাপটকে একই সুতোয় বেঁধে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যার ফলে কখনও গল্পটি বিরক্তিকর লাগেনি বা ঝুলে যায়নি। ফরিদির চলচ্চিত্রের অভিনয়ের ইতিহাসে কমান্ডার সিনেমার সিঁধেল চোরের চরিত্রটি উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। কারণ এর আগে ও পরে ফরিদিকে এমন চরিত্রে দেখা যায়নি। চুরির দৃশ্যটি বাস্তবসম্মত করার জন্য ফরিদির অভিনয় ও পরিচালকের নির্মানে যত্নের ছাপ ছিলো। সোহেল রানাকে মেকাপ ও গ্যাটাপ সিনেমা হলের দর্শকদের বীরমুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের কথা মনে করিয়ে দেয়। সোহেল রানার চরিত্রটিকে পরিচালক রুপক অর্থে যেন মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে জিয়াউর রহমানের ভুমিকাটাই তুলে ধরেছিলেন। এইদেশে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র অনেক হয়েছে, হচ্ছে ও আরও হবে কিন্তু ১৯৯৪ সালে সল্প বাজেটে নির্মিত শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘কমান্ডার’ সিনেমার মতো মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ও পরের প্রেক্ষাপট নিয়ে এতো চমৎকার একটি আধুনিক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র আর হবেনা।

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বশেষ মন্তব্য

মুক্তির প্রতীক্ষিত

  • Sphulingo

সর্বশেষ খবরাখবর

ঈদের সিনেমা ‘অন্তরাত্মা’

ঝাকজমক পূর্ণ মহরতে শুরু হলো শাকিব খানের ঈদের সিনেমা ‘অন্তরাত্মা’

0
সম্প্রতি জানা গিয়েছিলো আগামী ঈদুল ফিতরে মুক্তির লক্ষ্যে নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ঢালিউড সুপারষ্টার শাকিব খান। তরঙ্গ এন্টারটেইনমেন্টের ব্যানারে নির্মিতব্য ‘অন্তরাত্মা’ নামের এই সিনেমাটি...
দীঘির প্রথম সিনেমার

দীঘির প্রথম সিনেমার ট্রেলারে সমালোচনার ঝড়: কি বললেন নির্মাতা?

0
বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় শিশুশিল্পী দীঘি। দর্শকদের ভালোবাসার পাশাপাশি শিশুশিল্পী হিসেবে পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শিশুশিল্পী থেকে তার দীঘির পরিপূর্ন নায়িকা হিসেবে আত্নপ্রকাশ নিয়ে সবার...
তৌকির আহমদের ‘স্ফুলিঙ্গ’

যে তিনটি কারনে আপনার দেখা উচিত তৌকির আহমদের ‘স্ফুলিঙ্গ’!

0
গত ৯ই ডিসেম্বর রাজধানীর বনানী ক্লাবে নতুন সিনেমা ‘স্ফুলিঙ্গ’ এর ঘোষনা দিয়েছিলেন আলোচিত নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। এই অনুষ্ঠানেই তিনি বলেছিলেন করোনার কারণে সেট ফেলে...
আবারো পেছালো 'এফ ৯'

আবারো পেছালো ‘এফ ৯’: জুনে দেখা যাবে ডমের পরিবারের পুনর্মিলনী

0
করোনা পরবর্তী সময়ে প্রেক্ষাগৃহে নতুন করে সিনেমা প্রদর্শনী শুরু হলেও বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি শুরু হয়নি এখনও। কিছু কিছু সিনেমা ইতিমধ্যে মুক্তির তারিখ ঘোষনা...
স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না

স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না: কতটুকু মনে আছে মান্নার সিনেমার যাত্রা

0
বাংলা সিনেমার অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় অভিনেতা মান্না। মৃত্যুর আগে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা। ভক্তদের ভালোবাসায় হয়েছেন স্মৃতিতে অম্লান মহানায়ক মান্না। নায়ক মান্না...

আরো পড়ুন