প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’

জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’

ভিলেন জসিমের খুব ভক্ত ছিলাম কিন্তু নায়ক জসিমকে আমি মেনে নিইনি। সবুজ সাথি, অশান্তি, বিশ্বাসঘাতক, রকি, মোহাম্মদ আলী সহ নায়ক জসিমের ছবিগুলো ভালো লাগলেও জসিমকে মেনে নিতে পারছিলাম না, কিন্তু সপরিবারে সিলেটের কাকলী সিনেমা হলে ‘সারেন্ডার’ দেখার পর জসিমের ভক্ত হয়ে গেলাম এবং মেনে নিলাম জসিমের দ্বারাই সম্ভব এমন স্যাড রোমান্টিক ও সোশ্যাল অ্যাকশন সিনেমাকে টেনে নেয়ার। জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’ সিনেমাটা আমাকে এতো বেশি প্রভাবিত করেছিলো যে ছাত্রজীবনে জসিম আমার প্রেমিক চরিত্রের রোল মডেল ছিলেন যে আমি প্রেম করলে জসিমের মতো প্রেম করবো। ‘সারেন্ডার’ সিনেমার জসিমের করুন মুখটি আজো চোখে ভাসে।

- Advertisement -

‘’সবাই তো ভালোবাসা চায়, কেউ পায় কেউ বা হারায়, তাতে প্রেমিকের কি আসে যায়’’…… গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লিখা , আলম খানের সুর করা ও অ্যান্ড্রো কিশোর ও সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া বাংলা চলচ্চিত্রের কালজয়ী চিরসবুজ গানটি শুনে নাই এমন শ্রোতা পাওয়া যাবে না। এই গানটির জন্য আলম খান, অ্যান্ড্রো কিশোর সেইবছর জাতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ সুরকার ও শিল্পীর পুরস্কার পেয়েছিলেন। গানটি ছিল জহিরুল হক পরিচালিত ‘সারেন্ডার’ ছবির গান। যে গানটি লক্ষ কোটি শ্রোতাদের মন জয় করে করে চলেছে ২ যুগেরও বেশি সময় ধরে সেই গানের ছবিটি কেমন ছিল তা আজকের অনেকেই জানেন না, জানার কথাও নয়। কারন জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’’ ছবিটি আজকের প্রজন্মের অধিকাংশ দর্শকের দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আজ আপনাদের সেই ছবি সম্পর্কে আমার স্মৃতি থেকে কিছু কথা বলবো।

১৯৮৭ সালের কোন এক বিকেলে আমাদের পরিবার ও আমাদের প্রতিবেশি খুব ঘনিষ্ঠ ডাক্তার কাকার পরিবার সহ আমরা ১২/১৩ জন গিয়েছিলাম সিলেটের কাকলী সিনেমা হলে ‘সারেন্ডার’ ছবিটি দেখতে। আমার তখন কিশোর বেলার সবে শুরু এবং ছবির দেখার বেলায় কি উৎসাহ তা বলে বুঝাতে পারবো না। কাকলী সিনেমায় দেখলাম বহু দর্শক এসেছেন পরিবার পরিজন নিয়ে ছবি দেখতে। জসিম শাবানা ও আলমগির শাবানা জুটির ছবি দেখতে সেইসময় মানুষ সবচেয়ে বেশি ভিড় করতো। শাবানা’র প্রতি যে দর্শকদের কি টান সেটা আজো আমি কারো জন্য দর্শকদের মাঝে দেখিনি। যাই হোক ছবি শুরু হলো।

- Advertisement -

ছবিটির কাহিনী ছিল এমন – জসিম (ছবিতেও জসিম নাম ছিল) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে চাকরীর জন্য পথে পথে ঘুরছে। জসিমের বন্ধু বাবর, মাহবুব খান, মিজু আহমেদ ও সিদ্দিক জামাল নানটু সবারই একই দশা। সংসারে তাঁর মা ছাড়া আর কেউই নেই। বড়লোকের মেয়ে সিমা (শাবানা) জসিমের সহপাঠী থেকে প্রেমিকা। জসিম হলো নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তান। ঘরভাড়া বাকী ৫ মাসের, বাড়িওয়ালা প্রতিদিন ভাড়ার টাকা নেয়ার জন্য চাপ দিয়ে যায় আর জসিমের মা ‘’দিবো’’, ‘’দিচ্ছি’’, ‘’চাকরী হয়ে গেলে পেয়ে যাবেন’’ এইভাবে বলে সময় নেন। জসিম কয়েক জায়গায় ইন্টার্ভিউ দিয়েছে কিন্তু কোন চাচা মামা না থাকায় চাকরী হচ্চে না। শাবানার বিয়ের জন্য চাপ আছে , একদিন শাবানা’র অনুরোধে শাবানার বাবা’কে জসিম তাঁদের সম্পর্কের কথা জানাতে গেলে শাবানার বাবা জহিরুল হক জসিমকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। সেদিনের পর থেকে জসিম আর শাবানার সাথে সম্পর্ক রাখেনি। এর মাঝে জসিমের মা বিনা চিকিৎসায় মারা যায় এবং জসিমের কাছে মায়ের লাশ দাফন করার মতোও কোন টাকা নেই। জসিম আঞ্জুমানে মফিদুলের সহায়তায় মায়ের লাশ দাফন করে।

চিকিৎসার অভাবে মায়ের মৃত্যুতে জসিমের মনের দুঃখগুলো ক্ষোভে পরিণত হয়, জসিম অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। জসিমের একটা বিশেষ গুন ছিল তা হলো যে কোন ধরনের তালা জসিম অনায়াসে খুলে ফেলতে পারে। যা দিয়ে সে অপরাধ জগতে খুব রাতারাতি উপরে উঠে যায়। জসিম তাঁর সব বন্ধুদের খুঁজে বের করে নিজের একটি গ্যাং তৈরি করে। বিভিন্ন অপারেশনে পুলিশের গুলিতে জসিমের বন্ধুরা একে একে সবাই মারা গেলে জসিম একা হয়ে পড়ে। লুট করা সব অর্থ দিয়ে সে ব্যবসা শুরু করে এবং ধীরে ধীরে কোটিপতি হয়ে যায়। বেশ অনেক বছর পর ব্যবসার কাজে বুলবুল আহমেদের সাথে জসিমের পরিচয় ঘটে ও বন্ধুত্ব হয়। বুলবুলের ছেলের জন্মদিনের দাওয়াতে গিয়ে জানতে পারে বুলবুলের স্ত্রী শাবানা জসিমের প্রেমিকা। জসিম ও শাবানা একে অপরকে চিনতে পারলেও বুলবুলের কাছে ধরা দেয়না। ধীরে ধীরে বুলবুলের সাথে জসিমের বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠ হয়। একসময় জসিম শাবানার ছেলেকে একটি দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে ব্যাংকের ভোল্টরুমের তালা খুলে ফেললে পুলিশের সন্দেহ হয় এই সেই পলাতক ফাঁসির আসামী যাকে পুলিশ এতো বছর ধরে খুঁজছে কিন্তু জসিম স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় এবং কোন প্রমান না থাকায় গ্রেফতার করতে পারছে না। অবশেষে জসিমকে গ্রেফতার করে যা জসিম আগেই জানতো যে শাবানার ছেলেকে বাঁচাতে ব্যাংকের ভোল্টরুমের তালা খুলতে গেলে সে ধরা পড়বেই তবুও ভালোবাসার মানুষটির জন্য সে হাসিমুখে ধরা দেয় এবং শাবানার ছেলেকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে শাবানার হাতে তুলে দেয়। জসিম যেন জীবনের কাছে শেষ পর্যন্ত ‘সারেন্ডার’ করে।

এই ছবিটি দেখেই সর্বপ্রথম আমার জসিমের জন্য মায়া লেগেছিল। শুধু আমার নয় ছবিটি যারা সেইসময়ে হলে দেখেছিলেন তাঁদের সবারই মাঝে জসিমের জন্য আক্ষেপ জন্মেছিল। ছবিটির গল্প ছিল একটি বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে যা ছবির শুরুতেই পর্দায় লিখে দিয়েছিলেন পরিচালক জহিরুল হক। কাহিনীটির থিম বিদেশী হলেও সিদ্দিক জামাল নানটু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের সাথে দারুন ভাবে মিলিয়ে কাহিনীটি তৈরি করেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে ছবির টাইটেলের আগে শাবানাকে কিছুসময়ের জন্য দর্শক দেখেছিল এরপর পর্দা থেকে শাবানা উধাও। টাইটেলের পর ছবিটা এগিয়ে গিয়েছিল ধুম ধারাকা ছবির মতো যেখানে জসিম ও তাঁর বন্ধুদের লুটপাট আর চোর পুলিশ খেলা দেখছিল দর্শক। সবাই ভেবে নিয়েছিল ছবিটা সম্ভবত জসিমের অন্য ছবিগুলোর মতোই এগুচ্ছে। কিন্তু না, বিরতির পর পুরো জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’ ছবি পাল্টে যায়। পর্দায় কোন জৌলুস ছিল না, ছিল না ধুমা ধারাক্কা কিছু। পুরো ছবিটা হয়ে যায় শান্ত ,শীতল জীবনের না পাওয়ার এক বেদনা ও ভালোবাসার গল্প। বাকী ছবিটা হয়ে যায় সম্পূর্ণ রোমান্টিক গল্পের করুন কাহিনী যা পরিচালক জহিরুল হক অসাধারনভাবে নির্মাণ করেছিলেন। দর্শকের ভাললাগাটা এই কারনেই।

ছবির সেরা গানটি/ থিম সং দুবার আছে ছিল পর্দায় প্রথমবার ছিল শাবানা জসিমের ডুয়েট পরবর্তীতে জসিমের একক। আমার কাছে জসিমের একক গলার (এন্ড্রু কিশোর একক) গানটির দৃশ্যর কথা মনে পড়ে। শাবানার মৃদু মলিন, বুলবুলের সামনে অভিনয় করা মৃদু মুচকি হাসি আর জসিমের দিকে করুন ভাবে তাকানোর দৃশ্যগুলো আজো চোখে ভাসে। আজো দর্শক যা ভেবেছিল তাঁর পুরো বিপরীত হয়ে গেলো। ছবির প্রথম গান ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়/ কেউ পায় কেউ বা হারায়/ তাতে প্রেমিকের কি আসে যায়’ গানটির যথার্থ সেই প্রেমিকের গল্প হয়ে উঠেছিল। যে প্রেমিক ভালোবাসা চেয়েছিল কিন্তু পেয়েও হারালো তবুও সারাটা জীবন সেই হারানো ভালোবাসার মানুষটির জন্য জীবন দিয়ে গেলো। ..যে গানটির মতো মানুষের জীবনেও এমন বাস্তবতার দেখা মিলে। ছবির জসিমের ভালোবাসার সাথে আমার জীবনের ভালবাসার গল্পটার মিল খুঁজে পাই। আহা জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’ আহা আমার প্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র।

আরো পড়ুনঃ:
এজে মিন্টুর ‘সত্য মিথ্যা’
মালেক আফসারীর ‘ক্ষতিপূরণ’
শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘কমান্ডার’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ