নতুন দশকে শাহরুখের পতন: তিন খানের তুলনামূলক পর্যালোচনা

নতুন দশকে শাহরুখের পতন

শাহরুখ খান – এই নামের নতুন করে কোন ভূমিকা বা পরিচয় দরকার পরেনা। বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং শক্তিশালী এই অভিনেতা সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি একজন টিভি হোস্ট, একজন ব্যবসায়ী, একজন ক্রিকেট টিম মাকিল, একজন প্রযোজক এবং সর্বপরি একজন সফল মানুষ হিসেবে অগ্রগণ্য। বলিউডে যে কয়েকজন অভিনেতা নিজের পরিশ্রম এবং মেধা দিয়ে কারো কোন সাহায্য ছাড়া নিজেকে নিয়ে গেছেন সাফল্যের শিখরে তারমধ্যে শাহরুখ খান অন্যতম। তার পরিশ্রম আর সফলতার স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন “বলিউড কিং”, “বক্স অফিস কিং”, “কিং খান” এবং “কিং অব রোমান্স” সহ অসংখ্য উপাধি। ব্যবসা সফল সিনেমার পাশাপাশি তার ঝুলিতে আছে অসংখ্য পুরষ্কার। তার সমসাময়িক অন্য তারকাদের পিছনে ফেলে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। শুধু তাই তার পরবর্তি বলিউড প্রজন্মের জন্য তিনিই সবচেয়ে বড় সফলতার মাপকাঠি।

- Advertisement -

সেই ১৯৯৩ সালে, নিজের সিনেমা জীবনের শুরুতে যখন কেউ যশ চোপড়ার ‘ডর’ সিনেমাতে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করতে রাজী ছিলো না, সেই সময় তিনি পর্দায় আসেন এক এন্টি হিরোর ভূমিকায়। সেই থেকে শুরু। নিজের অভিনয় আর মায়াবী চোখের চাওনি দিয়ে তিনি জয় করে নেন কোটি ভক্তের প্রান। সালি দেওল সেই সিনেমার নায়কের ভূমিকায় থাকলেও সিনেমা মুক্তির পর শাহরুখই হয়ে ওঠেন বলিউডের নতুন স্টার। তার ঠিক ২ বছর পর যশ চোপড়ার ছেলে আদিত্য চোপড়ার পরিচালনায় কাজলের বিপরীতে তিনি অভিনয় করেন ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ সিনেমাতে। বলিউডের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা সিনেমার তালিকায় প্রথম দিকেই স্থান পাওয়া এই সিনেমা হিন্দি রোমান্টিক ধারার মড় ঘুড়িয়ে দেয়। বলিউড পায় তার নতুন রোমান্টিক মাস্কট শাহরুখ খান।

এই সিনেমার পরে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি এই তারকাকে। একের পর এক ব্যবসা সফল সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন প্রযোজক আর পরিচালকদের মধ্যমণি। ৯০ এবং নতুন শতকের শুরু দিকে বলিউডের সিনেমার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠেন কিং খান। তার সমসাময়িক সালমান খান, আমির খান, অজয় দেবগণ, অক্ষয় কুমার সহ অন্যরা অনেকটাই ঢাকা পরে যান শাহরুখ খানের দ্যূতির আড়ালে। নতুন শতকের শুরুতে হৃতিক রোশন কিছুটা প্লট পরিবর্তনের আভাস দিলেও শেষ পর্যন্ত শাহরুখই থেকে যান বলিউডের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার হিসেবে।

- Advertisement -

শুধু ব্যবসায়িক সফলাতাই নয়, নিজের অভিনয়ের জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছেন বহুবার। সর্বোচ্চ ১৪ বার জিতেছেন ভারতের অস্কার খ্যাত “ফিল্মফেয়ার” পুরষ্কার। অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমা প্রযোজনায়ও তিনি সফল। তার প্রযোজনা প্রতিস্টান থেকে নির্মিত হয়েছে ‘রা ওয়ান’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, ‘দিলওয়ালে’ এর মত ব্যসবাসফল ছবি। তবে আমার জাকের এই লেখা একটু অন্য ফোকাসের। বলিউডের সিনেমার ইতিহাসে শাহরুখ খানের সফলতার গল্প রুপকথার মতই। কিন্তু এই লেখার বিষয় বস্তু আসলে বিগত দশ বছরে শাহরুখ খানের বক্স-অফিসে অবস্থান এবং তার সমসাময়িক অন্য দুই খান সালমান খান এবং আমির খানের সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা।

নতুন দশকের ব্যবসা সফল সনেমার তালিকা দেখলে এই লেখার যৌক্তিকতা বোঝা যাবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এখ সময় যেখানে বছরের সেরা সিনেমার তালিকা তার দখলে থাকত এখন সেটা দেখা যায়না। শাহরুখ খানের সিনেমা বছরের সেরা ব্যবসা সফল সিনেমা হওয়ার সর্বশেষ উদাহরন ২০০৭ সাল। এর পর ২০১৩ সালে তার ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ সিনেমা ২০৩ কোটি আয় করলেও, সেই বছর আমির খানের ‘ধুম ৩’ ২৭৫ কোটি আয় করতে সক্ষম হয়। সালমান খান এবং আমির খান যেখানে প্রত্যেক সিনেমা দিয়ে নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছেন সেখানে শাহরুখ খানের সিনেমা ১০০ কোটি আয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ২০০৮ সালে ‘গজিনি’ সিনেমা দিয়ে প্রথম ১০০ কোটির মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন আমির খান। ঠিক তার পরের বছরই তিনি আবার ‘৩ ইডিওটস’ দিয়ে ২০০ কোটির মেইল ফলক স্পর্শ করেন।

অন্যদিকে ২০১০ সালে দাবাং দিয়ে বলিউডের বক্স অফিসে পুনর্জন্ম পান সালমান খান। এর পরই একের পর এক ১৫০ কোটির ব্লকবাস্টার উপহার দিয়ে গেছেন বলিউডের ভাইজান। তবে ১০০ আর ২০০ কোটির মত ৩০০ কোটির মাইলফলকও প্রথম স্পর্শ করেন মি. পারফেকশনিস্ট আমির খান। ২০১৪ সালে রাজ কুমার হিরানির ‘পিকে’ সিনেমা দিয়ে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন এই তারকা। তার পর ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দাঙ্গাল’ সিনেমা দিয়ে বলিউডের সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমার রেকর্ড গড়েন আমির খান। অন্যদেইক সালমান খান তিনবার ৩০০ কোটির মাইলফলক ছুয়েছেন তার ‘বজ্রঙ্গি ভাইজান’, ‘সুলতান’ এবং ‘টাইগার জিন্দা হ্যা’ সিনেমাগুলোর মাধ্যমে। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত একবার ২০০ কোটি অতিক্রম করতে পেরেছেন শাহরুখ খান। ২০১৩ সালে ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ সিনেমা ২০০ কোটির উপরে ব্যবসা করতে সক্ষম হয়েছিলো।

নতুন দশকে শাহরুখের পতন

পরিসংখ্যানে তিন খানঃ
যখন আপনি শাহরুখ খানের মতো কোন তারকাকে নিয়ে বলছেন তখন আপনাকে অবশ্যই তথ্য নির্ভর কথা বলতে হবে। আমি আবারো বলছি, এই লিখাটা আসলে ২০০৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত তিন খানের বক্স অফিসে সফলতা ব্যর্থতা নিয়ে। ২০০৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত বলিউডের তিন খানের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার রেকর্ড নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো।

নতুন দশকে শাহরুখের পতন

উপরের পরিসংখ্যান থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট যে, সাম্পতিক সময়ে সালমান খান এবং আমির খানের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে আছেন শাহরুখ খান। শুধু সিনেমার ব্যবসায়িক সফলতা নয়, সিনেমার প্রশংসার প্রশ্নেও পিছিয়ে আছেন কিং খান। যেখানে সালমান খান এবং আমির খানের সিনেমার রিভিউতে প্রসংসায় ভাসছেন তারা, সেখানে শাহরুখ খান সমালোচিত হচ্ছেন ‘হ্যাপি নিয় ইয়ার’, ‘দিলওয়ালে’ এবং ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ ধরনের সিনেমাতে অভিনয়ের কারনে।

এবার আসুন এই তিন খানের লাইফটাইম রেকর্ডে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাকঃ

তবে এটা ঠিক যে, যেকোন একটা বিবেচনাতে চূড়ান্ত উপসংহারে আসা যাবেনা। গত ২০ বছর ধরে বলিউডে রাজত্ব করে আসছেন এই তিন খান। তাদের ২০ বছরের অবদান বলিউড মনে রাখবে হাজার বছর। তিন খানের এই তুলনামূলক পর্যালচনার জন্য নিচে আরো কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো।

বক্স অফিস ইন্ডিয়ার বিচারে স্টার পাওয়ারের ভিত্তিতে তিন খানের অবস্থান নিম্নরূপঃ

নাম ভারতে অবস্থান আন্তর্জাতিক অবস্থান বিশ্বব্যাপী অবস্থান
শাহরুখ খান
সালমান খান
আমির খান
* তথ্য সুত্রঃ বক্স অফিস ইন্ডিয়া (মে ২০২০ পর্যন্ত)

সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোর ব্যর্থতার পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে পর্দায় না থাকার কারনে শাহরুখ খানের অবস্থান অনেকটাই তলানিতে। এই লিখায় শুধু তিন খানের তুলনামূলক চিত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার অন্য তারকাদের কথা আলোচনায় আনিনি। বর্তমানে যেমন অক্ষয় কুমার, অজয় দেবগন এমনকি রনবীর কাপুর এবং রণবীর সিংয়ের মত নতুন তারকারা বক্স-অফিসের হিসেবে অনেক এগিয়ে।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে নিজের প্রযোজনায় আনন্দ এল রায়ের পরিচালনায় ‘জিরো’ সিনেমার ব্যর্থতার পর আর নতুন কোন ছবিতে দেখা যায়নি বলিউড বাদশা শাহরুখ খানকে। এমনকি এখন পর্যন্ত তার পরবর্তী সিনেমার কোন ঘোষনাও পাওয়া যায়নি, উপরন্তু হাতে থাকা সিনেমাও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। যদিও সম্প্রতি ইয়ান্স রাজ ফিল্মসের প্রযোজনায় সিদ্বার্ত আনন্দ পরিচালিত ‘পাঠান’ সিনেমায় অভিনয় করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি রাজু ইরানির সোশ্যাল কমেডি এবং এটলি কুমারের একটি একশন থ্রিলার সিনেমায়ও অভিনয়ের কথা শোনা যাচ্ছে কিং খানের। আশা করি এই সিনেমা গুলোর মাধ্যমেই বক্স-অফিসে স্বরূপে ফিরবেন এই তারকা। শুভ কামনা তার জন্য।

আরো পড়ুনঃ
শাহরুখ খানের জীবন থেকে পাওয়া উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু ব্যবসায়িক শিক্ষা!
বলিউডের তিন খানের দুই দশকঃ অভিনেতা ও সুপারস্টার আমির খান (দ্বিতীয় পর্ব)
বলিউডের তিন খানের দুই দশকঃ অভিনেতা ও সুপারস্টার আমির খান (প্রথম পর্ব)

হোসেন মৌলুদ তেজোhttps://iammoulude.com/
হোসেন মৌলুদ তেজো একজন নিয়মিত ব্লগার যিনি সিনেমা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। সিনেমার পাশাপাশি কবিতা, ছোট গল্প, সমসাময়িক এবং ব্যবসা সম্পর্কিত বিষয়েও লিখে থাকেন। প্রফেশনালী একটি বেসকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি বই পড়ে, সিনেমা দেখে এবং তার একমাত্র ছেলের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ