ঢালিউডের সিনেমার পর্দায় পুলিশ এবং পুলিশের ভাবমুর্তি নিয়ে কিছু কথা

ঢালিউডের সিনেমার পর্দায় পুলিশ

গত বছরের ডিসেম্বরে মুক্তিপ্রাপ্ত আরিফিন শুভ অভিনীত ‘মিশন এক্সট্রিম’ সিনেমাটি বেশ আলোচিত হয়েছিলো। আর চলতি বছরে মুক্তি পেতে যাচ্ছে পুলিশ অ্যাকশন থ্রিলার ধর্মী সিনেমা ‘শান’। সিয়াম আহমেদ অভিনীত সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন নতুন নির্মাতা এম এ রহিম। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ থ্রিলার সিনেমার শুরুটা হয়েছিলো আরিফিন শুভকে নিয়ে দীপঙ্কর দীপনের ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমার মাধ্যমে। তবে ঢালিউডের সিনেমার ইতিহাসে পুলিশ অ্যাকশন কিংবা প্রধান তারকার পুলিশের চরিত্রে অভিনয় এই প্রথম নয়। আজকের এই লিখায় ঢালিউডের সিনেমার পর্দায় পুলিশ এবং পুলিশের ভাবমুর্তি নিয়ে কিছু কথা বলবো আপনাদের।

- Advertisement -

এদিকে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসের ১ম সপ্তাহের দিকে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলো যেখানে বলা হয়েছিলো যে চলচ্চিত্রে পুলিশ বাহিনীকে নেতিবাচক ভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। এই বিজ্ঞপ্তিটির বিরুদ্ধে সে সময়ে অনেকেই প্রতিবাদ করেছিলেন। আমাদের ফারুকি ভাইকেও দেখেছিলাম এই ব্যাপারে ক্ষোভ মিশ্রিত একটা বিবৃতিমূলক স্ট্যাটাস দিইয়েছিলেন। দুঃখের বিষয় হলো কেউই পুলিশ বাহিনিকে বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কত সাহসী ও সৎ ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল সেগুলোর কোন উদাহরণ তো দিলেনই না শুধু প্রতিবাদ করে কথার ফুলঝুরি দেখিয়েছিলেন। অনেকে ভারতের ‘আব তাক ছাপ্পান’ ছবি এইদেশে এখনও তৈরি হয়নি বলে পুলিশ বাহিনীকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করেছেন।

আমি ফারুকি ভাইয়ের কাছ থেকে আশা করে ছিলাম যে বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে পুলিশকে মহান হিসেবে তুলে ধরার একাধিক ঘটনা তিনি উদাহরণ সহ তুলে ধরে পুলিশ বাহিনীর নোটিশের জবাব দিবেন। কিন্তু তা তিনি করেননি, হয়তো বা সেই সমস্ত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র সম্পর্কে বিদেশি পুরস্কার প্রাপ্ত মোস্তফা সরোয়ার ফারুকি ভাইয়ের কোন ধারনাই নেই যা তিনি প্রমান হিসেবে পুলিশ বাহিনীকে দিতে পারতেন। যাই হোক, বাংলা চলচ্চিত্রের একজন সাধারন চলচ্চিত্রপ্রেমি হিসেবে আমি মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের কিছু তথ্য তুলে ধরবো পুলিশ বাহিনীর কাছে যা জেনে উনারা অন্তত এইটুকু শান্তি পেতে পারেন যে চলচ্চিত্রে পুলিশ বাহিনীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি, হয়েছিল জনগণের জন্য মহান, সৎ ও সাহসী হিসেবেও ।

- Advertisement -

১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ও একাধিক শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত কাজী হায়াতের ‘দাঙ্গা’ ছবির মূল গল্পটাই ছিল একজন সংসদ সদস্য ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে সৎ ও সাহসী তরুন পুলিশ অফিসারের গর্জে উঠার চিত্র। যে অফিসার নিজের জীবন দিয়েও দেশ থেকে একজন সন্ত্রাসি,গডফাদারকে নির্মূল করেন। সেই ছবিতে খারাপ পুলিশ অফিসার যেমন ছিল তেমনি ছিল মান্নার মতো সৎ ও সাহসী পুলিশ অফিসার যে পুরো থানার ঘুষখোর অফিসারদের পাল্টে দিয়েছিলেন, হয়েছিলেন জনগণের সেবক। কোন বাঁধা সেই অফিসারকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ঢালিউডের সিনেমার পর্দায় পুলিশ চরিত্রটি এভাবে উঠে এসেছে বহুবার।

কাজী হায়াতের ‘সিপাহী’ ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে ইলিয়াস কাঞ্চন দেশের সেবা করার জন্য পুলিশ অফিসার হিসেবে চাকরি শুরু করে। ইলিয়াস কাঞ্চন সেই ছবিতে একজন আদর্শবান পুলিশ অফিসার যার পরিনতিতে স্ত্রী চম্পা সহ নিজের জীবন দিতে হয় সন্ত্রাসীদের হাতে। সেই ‘সিপাহী’ ছবিতেও পুলিশ বাহিনীর জয় জয়কার ছিল। কাজী হায়াতের আরেকটি আগুনঝরা ছবি ‘লুটতরাজ’ ছবিতেও সেই সময়কার প্রেক্ষাপটে পুলিশ ও সন্ত্রাসী গডফাদারদের সহযোগী হাতিয়ারের বিরুদ্ধে এক পুলিশ অফিসারের লড়াই করার গল্প ছিল যেখানেও পুলিশ বাহিনীকে সুমহান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

- Advertisement -

কাজী হায়াতের ‘সমাজকে বদলে দাও’ ছবিতে একজন পুলিশ অফিসার ঘুণেধরা সমাজ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে সমাজকে বদলে দেয়ার চিত্র দেখানো হয়েছে। যেখানে একজন পুলিশ অফিসার পুরো পুলিশ বাহিনী সহ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গর্জে উঠার গল্প দেখানো হয়েছিলো। সেই অফিসার সমাজকে বদলে দিতে চেয়েছিল যা দেখে হলের দর্শকদের মাঝে পুলিশের জন্য আলাদা শ্রদ্ধা চলে আসে। শুধু একজন কাজী হায়াতের ছবিগুলোর উদাহরণ দিয়ে যাচ্ছি তাহলে ধারন করুন বাকী পরিচালকদের ছবির উদাহরণ দিতে গেলে বাংলা চলচ্চিত্রের কতগুলো ছবি পাওয়া যাবে যেখানে পুলিশ মানেই আদর্শবান, সাহসী, সৎ কোন ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৮৯ সালে একাধিক জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত মালেক আফসারীর ‘ক্ষতিপূরণ’ চলচ্চিত্রে প্রয়াত খলিল ছিলেন একজন সৎ পুলিশ অফিসার যিনি আলমগীরকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করার পর একটি খুনের মামলার রহস্য উদঘাটন করার ক্লু পেয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত আলমগীরের মাধ্যমেই আসল খুনীদের চিহ্নিত করেন। শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘শত্রু ভয়ংকর’, ‘দুঃসাহস’ ছবিগুলোতেও সোহেল রানা ছিলেন পুলিশ বাহিনীর একজন সৎ ও আদর্শবান অফিসার যার সাথে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় সমাজের শত্রুদের। মমতাজ আলীর ‘উসিলা’ ছবিতেও জাফর ইকবাল একজন পুলিশ অফিসার যিনি তাঁর আপন বড় ভাই গডফাদার উজ্জ্বলকেও ছাড় দেননি।

শুধু কি পুলিশ ইনস্পেকটর বা ওসিদের চরিত্র ভালো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল? না, ‘হাবিলদার’ ছবিতে জসিম পুলিশের একজন হাবিলদার হয়েও আদর্শের দিক দিয়ে ওসি, এসপি সবাইকে ছাড়িয়ে যায়। সেই ছবি দেখলে মনে হবে পুলিশের হাবিলদাররা অনেক ভালো ও সাহসী মানুষ। মমতাজুর রহমান আকবরের ‘বাবার আদেশ’ ছবিতেও রাজীব একজন সৎ পুলিশ কনস্টেবল যা দেখে সেদিন সিনেমা হলে দর্শকদের চোখে পানি চলে এসেছিল। এমন অসংখ্য অসংখ্য ছবির উদাহরণ দেয়া যাবে যেখানে ঢালিউডের সিনেমার পর্দায় পুলিশ সদস্য তথা পুলিশ বাহিনীকে সুমহান, আদর্শবান জনগণের সেবক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

পুরুষ পুলিশ অফিসারদের পাশাপাশি নারী পুলিশ সদস্যদেরও বাংলা চলচ্চিত্র উপস্থাপন করেছে মহীয়সী হিসেবেও। সিদ্দিক জামাল নানটুর ‘রক্ত নিশান’ ছবিতে শাবানা একজন নারী পুলিশ অফিসার যার আদর্শ, সততার কারণে পরিবারের সদস্যদের জীবন দিতে হয়েছিল কিন্তু তারপরেও শাবানা সেই আদর্শ ও সততা থেকে একবারও পিছপা হননি। সেই ছবিতে শাবানা যেন নারী পুলিশ সদস্য সহ পুরো পুলিশ বাহিনীর গর্ব হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল।

পুলিশ ভাইয়েরা কি জানেন বাংলা চলচ্চিত্রে পুলিশকে সুমহান হিসেবে যতবেশি, যতবার উপস্থাপন করা হয়েছে আর অন্য কোন মাধ্যমেই বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি এতো দারুন ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। একজন কাজী হায়াতের ‘দাঙ্গা’, ‘সিপাহি’, ‘লুটতরাজ’, ‘সমাজকে বদলে দাও’, ‘ধাওয়া’ ছবিগুলোতে পুলিশকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সেইরকম পুলিশ বাস্তবে একজনও পাওয়া যাবে না এটা আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। বাংলা চলচ্চিত্রে যদি সুমহান হিসেবে কোন বাহিনীকে সবচেয়ে বেশি উপস্থাপন করা হয়ে থাকে সেটা হলো পুলিশ বাহিনীর চরিত্র।

মজার ব্যাপার হচ্ছে ছবিতে পুলিশকে যেভাবে ইতিবাচক উপস্থাপন করা হয়েছে বাস্তবের সাথে সেরকম মিল পাওয়া অনেক সাধনার ব্যাপার, ‘দাঙ্গা’ ছবির মান্নার মতো পুলিশ আজ বাস্তবে নেই বরং ছবিতে যে পুলিশ মারামারি/কোন অপরাধ ঘটার পরে হাজির হয় বাস্তবেও সেটা প্রতিদিন দেখতে পাই। ছবিতে পুলিশের সামনে যেভাবে অপরাধীরা অপরাধ করে বাস্তবে আজো পুলিশের সামনে খুন করে খুনিরা পালিয়ে যায়, পুলিশের সামনে সরকার সমর্থকেরা বাসে পেট্রোল বোমা মেরে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।

বাংলা চলচ্চিত্রে বহুদিন ধরে ভালো পুলিশ সদস্য যেভাবে উঠে এসেছে খারাপ পুলিশ সদস্যর চরিত্রও বহুবার তুলে ধরা হয়েছে কিন্তু এর আগে কোনদিন শুনিনি পুলিশবাহিনী তাঁদের চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করার উপর কোন নোটিশ বা বিধিনিষেধ আরোপ করেনি কারণ ‘চলচ্চিত্র’ একটি বিনোদনের মাধ্যম যেখানে কাল্পনিক গল্প, কাল্পনিক চরিত্রের সমাবেশ থাকবেই যার ফলে ছবির পুলিশের ভালো মন্দ চরিত্রের সাথে বাস্তবের পুলিশের মিল ধরতে কেউ যায়নি। হতে পারে সেইসময় পুলিশবাহিনীর মাঝে ‘আদর্শ’, ‘সততা’, ‘ন্যায়বিচার’ শব্দগুলো বাস্তবে ছিল তাই চলচ্চিত্রে কি দেখালো না দেখালো সেটা নিয়ে পুলিশের কোন মাথাব্যথা ছিল না। অসহায় পুলিশ বাহিনীকে বিব্রতবোধ থেকে রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব, শিল্প মাধ্যমের মানুষগুলোরও দায়িত্ব। পুলিশ বাহিনীর শুভবুদ্ধির উদয় হোক এই কামনা করি।

আরো পড়ুনঃ
বিক্রমাদিত্য মোটওয়ানের ‘উড়ান’: যুগান্তকারী যে সিনেমার গল্প আজও প্রাসঙ্গিক
মহানায়ক মান্না: ঢাকাই সিনেমার জন্য একজন অভিনেতার চেয়ে বেশী কিছু!
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ কাজী হায়াতের ‘চাঁদাবাজ’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -
- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ