প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ সোহানুর রহমান সোহানের ‘বিদ্রোহী কন্যা’

সোহানুর রহমান সোহানের ‘বিদ্রোহী কন্যা’

আজকের বাংলা সিনেমার দর্শক ‘মাল্টিস্টার’ বা ‘তারকাবহুল’ বাংলা সিনেমার সাথে পরিচিত কিনা তা আমার জানা নেই । অথচ আমাদের সময়ে ‘তারকাবহুল’ সিনেমা ছিলো ডালভাতের মতো। প্রতি সপ্তাহেই তারকাবহুল সিনেমা মুক্তি পেতো আর ঈদ এলে তো কথাই নেই, তারকাবহুল সিনেমায় ঠাসা থাকতো ঈদের সিনেমার তালিকায়। আজ ঈদে সর্বসাকুল্য ৩টি সিনেমা মুক্তি পায় তাও আবার সেটা একই নায়কের দুটি আর অফট্র্যাকের একটি সিনেমা মিলে। যাই হোক, এবার ১৯৯৬ সালের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত দারুন দারুন সব সিনেমার ভিড়ে মুক্তি পাওয়া সোহানুর রহমান সোহানের ‘বিদ্রোহী কন্যা’ সিনেমার কথা বলি।

- Advertisement -

ঈদের ১ম সপ্তাহের ৩য় দিনে আমার মতো সিনেমার দর্শকদের নয়নমনি মনিকা সিনেমা হলে সকালের শোতে হাজির হয়েছিলাম আমরা কজন বন্ধুরা। হলের সামনে যাওয়ার কিছু পুর্বেই দেখতে পেলাম আমাদের মতো শত শত পোলাপানের ভিড় আর জটলা। হলের সামনে গিয়ে পুরা তব্দা খেয়ে গেলাম দর্শকদের ভিড় দেখে। মনে হলো পুরো সিলেট জেলার সব ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সি ছেলেরা মনিকা সিনেমা হলের বাহিরে দখল নিয়ে ফেলেছে। এই সিনেমা দেখতে যদি এতো ভিড় হয় তাহলে অন্য হলগুলোতে যেখানে সালমান শাহ, ওমরসানির সিনেমা চলছে সেখানে কি অবস্থা চিন্তা করছিলাম।

দর্শকদের ভিড় দেখে কাউন্টার থেকে টিকেট কেনার চেষ্টা বাদই দিলাম। কালো বাজারে/ব্ল্যাকাররা টিকেটের দাম এমন চড়া করে ফেললো যে ধরেই নিলাম আজ একটা মারামারি লাগবে তার আগেই টিকেট কেটে হলের ভেতরে ঢুকে যেতে হবে। ১৮ টাকা দামের টিকেট প্রতিটা ১২০টাকা করে কিনে আমরা হলে ঢুকে গেলাম এবার মারামারি লাগলে লাগুক কোন সমস্যা নাই। হলের ভেতরে ঢুকে আরও বিস্মিত হলাম। বাহিরে যত লোক রেখে এসেছি হলের ভেতর ঠিক যেন তাঁর চেয়েও বেশি মানুষ। সিট নিয়ে কাড়াকাড়ি, হাতাহাতি অবস্থা। কোন রকমে অনেক কষ্টে ডিসির বাম পাশের একদম উপরের সারির কোনায় আমরা ৬ জন ছয়টা আসন পেলাম।

- Advertisement -

সোহানুর রহমান সোহানের ‘বিদ্রোহী কন্যা’ সিনেমার গল্প শুরু মুক্তিযুদ্ধের সময়কারের ঘটনা নিয়ে। রাজীব থাকে রাজাকার আর মাহমুদ সাজ্জাদ (শাবানার বাবা) মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলে রাজিব বিজয় মিছিলের সামনে থেকে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় এবং ‘শীতল পার্টি’ নামের রাজনৈতিক দলের প্রধান হয়ে রাজনীতি করা শুরু করে। রাজনীতির আড়ালে রাজিব চোরাকারবারি ও লুটপাট শুরু করে যা পুলিশ অফিসার মাহমুদ সাজ্জাদ মেনে নিতে পারেনা। রাজিবকে গ্রেফতার করেও সাক্ষ্য প্রমানের অভাবে শাস্তি দিতে পারেনা। রাজীব ছাড়া পেয়ে মাহমুদ সাজ্জাদ ও তাঁর স্ত্রীকে খুন করে।

এদিকে কিশোরী শাবানা ছোট ছোট দুই ভাইকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। এরপরের গল্পটা জুড়ে শুধু শাবানা, ইলিয়াস কাঞ্চন ও রুবেলকে ঘিরে। বারবার গল্পের মোড় পাল্টে গিয়ে রোমাঞ্ছকর উত্তেজনায় ঠাঁসা পুরোটা সময় যেন দর্শকের চোখ পর্দা থেকে সেকেন্ডের জন্যও সরানোটা ছিল অসম্ভব। গল্পের ভেতরে নাটকীয়তা ও টুইস্ট ছিলো চরম। বিশেষ করে দুই ভাই ইলিয়াস কাঞ্চন ও রুবেলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বড় বোন শাবানার ভুমিকটা ছিল চরম। পুরো সিনেমা শেষ না করে উঠতে পারবেন না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিলো কিচ্ছুক্ষন পরপর একেকটা দৃশ্য ও সংলাপের সাথে সাথে পুরো হলের দর্শকদের করতালি দেয়াটা।

- Advertisement -

শাবানা, ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেল ও রাজীবের মতো তারকারা যে সিনেমা জুড়ে আছে সেই সিনেমার অভিনয়ের লড়াইটা কি রকম হতে পারে তা সেদিনের দর্শকরা ব্যতীত অন্য কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। সিনেমার পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান সেইসময় দর্শকদের কাছে এমনিতেই একটা ব্র্যান্ড হয়েছিলেন আর তাঁর সাথে যদি ১ম সারির বড় বড় তারকারা সিনেমায় থাকে তাহলে সেই সিনেমাটা ১০ গুন কেন ১০০ গুন বেশি টাকা দিয়ে টিকেট কেটে দেখলেও আফসোস হবেনা সেটা সেইসময়ের দর্শকরা জানতো।

প্রচন্ড গরমে ঘামে ভেজা শার্ট গায়ে সোহানুর রহমান সোহানের ‘বিদ্রোহী কন্যা’ সিনেমার প্রায় ৩ ঘন্টার মতো সময় কখন যে কেটে গিয়েছে টেরই পাইনি। আর যখন পেলাম তখন ‘ইশ!! সিনেমাটা আরেকটু লম্বা হলে ভালো হতো’ বলে আফসোস করলাম। কি অদ্ভুদ সুন্দর একটা সময় ফেলে এসেছি আমরা তা এই প্রজন্ম কিছুতেই বুঝবে না, বুঝানোর ভাষাও আমাদের নেই।

আরো পড়ুনঃ
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘কমান্ডার’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ এজে মিন্টুর ‘সত্য মিথ্যা’

ফজলে এলাহী
ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -
- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ