তাহাদের কথাঃ বাংলা সিনেমার সোনালী সময়ের চার তারকা (দ্বিতীয় পর্ব)

বাংলা সিনেমার সোনালী সময়ের

(প্রথম পর্ব এর পর থেকে) রুবেল যে সময়ে চলচ্চিত্রে আসেন তখন আলমগীর, সোহেল রানা, জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, জাফর ইকবাল এর মতো তারকারা বেশ ভালোভাবেই ইন্ডাস্ট্রির ও দর্শকদের চাহিদা মেটাচ্ছিলেন তবুও রুবেল নিজের নিজস্ব একটা ধারায় নিজেকে একক ভাবে জনপ্রিয় করেছিলেন তবুও কেন রুবেলকে রোম্যান্টিক ধারায় আসতে হলো এই প্রশ্নটা কি আপনাদের মনে আসেনা? কারণ রুবেল নিজের যোগ্যতা ও সময়ের নতুন দর্শকদের কাছে নিজেকে প্রমাণের জন্য নিজের জনপ্রিয় ধারা থেকে বের হয়ে এসেছিলেন আর তাই আজো সেদিনের রুবেল ভক্তরা রুবেলের মারমার কাটকাট ছবির সাথে ‘অপহরণ’, ‘ঘৃণা’, ‘স্বজন’, ‘ভাংচুর’, ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘রাক্ষস’, ‘ভণ্ড’, ‘পাগলাঘণ্টা’ এর মতো ছবিগুলোর কথা বলে এবং আগামীতেও বলবে। শুধু তাই নয় রুবেল সেই সময়ের জনপ্রিয় তারকাদের সাথে একই ছবিতে সহঅভিনেতার চরিত্রে অভিনয় করেন এবং নিজের অভিনয় দক্ষতাকে আরও উন্নত করেন।

ফজল আহমেদ বেনজিরের ‘ওমর আকবর’ ছবিতে ওমর চরিত্রে জসিমের দাপট কিন্তু আকবর চরিত্রে রুবেল ঠিকই নিজের জাত চিনিয়েছিলেন, শিবলি সাদিকের ‘অর্জন’ ছবিতে আলমগিরের পাশে রুবেল নিজেকে চিনিয়েছিলেন, ‘মা মাটি দেশ’ ছবিতে কাঞ্চন প্রধান চরিত্রে অথচ রুবেল ঠিকই তার অবস্থানে নিজেকে চিনিয়েছিলেন, ফজলে হকের ‘সম্পর্ক’ ছবিতে জসিমের দাপটের পাশেও রুবেল এতটুকু ম্লান হয়ে যাননি। সোহানুর রহমান সোহানের ‘আখেরি রাস্তা’ ছবিতে রুবেল ছিলেন ছবির প্রান অথচ সেই রুবেলই ছবির শেষে মারা যান যার ফলে রুবেলের চরিত্রটিকে দর্শক আরও বেশী মনে রেখেছে আজো। সেই সময়ে রুবেলের মতো জনপ্রিয় তারকা এসব কেন করেছিলেন সেটা বুঝতে হবে, শিখতে হবে। একই ধারায়, একই ধাঁচে বারবার দর্শকদের সামনে এসে সস্তা জনপ্রিয়তা ধরে রাখার মাঝে কোন বাহবা নেই, কোন কৃতিত্ব নেই।

এই ক্ষেত্রে আরেকটা উদাহরণ না দিয়ে পারছি না সেটা হলো পারিবারিক সেন্টিমেন্টাল ও রোম্যান্টিক গল্পের সফল ও তুমুল জনপ্রিয় নায়ক আলমগির কেন ‘ক্ষতিপূরণ’ এর মতো ব্যতিক্রমধর্মী ছবি করতে রাজি হলেন বলতে পারবেন? ক্ষতিপূরণ হচ্ছে এমন একটি গল্পের ছবি যেখানে পারিবারিক সেন্টিমেন্ট, নায়িকার সাথে প্রেম রোমান্স কিছুই নেই অথচ আলমগির সহজে ছবিতে অভিনয় করার চ্যালেঞ্জ নিলেন এবং সফলও হলেন। ক্ষতিপূরণ ছবির গল্পে আলমগিরের চরিত্রটা এমনই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে আলমগির ব্যর্থ হওয়া মানে পুরা ছবি সুপার ফ্লপ হয়ে যাবে। অথচ সেই চরিত্রটা আলমগির এতো দারুন ভাবে সামলেছেন এবং সফল হয়েছেন যা তাঁকে শুধু দর্শকনন্দিত করেনি করেছে সমালোচক বোদ্ধা নন্দিতও। যে ছবির কারণে তিনি ‘সত্য মিথ্যা’, ‘রাঙ্গাভাবি’, ‘ব্যথারদান’এর মতো ছবিগুলোকে পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।

‘ক্ষতিপূরণ’ ছবির মতো বাণিজ্যিক ছবি সব অভিনেতা সবসময় পায় না এবং আলমগির সেই অভাবনীয় সুযোগ ও চ্যালেঞ্জটাকে গ্রহণ করেছিলেন। এটাই একজন সফল অভিনেতার গুন। অথচ আজকের শুন্য ইন্ডাস্ট্রির একনায়কতন্ত্রের কিং খান নামের শাকিব খান সেই একই ধাঁচে বারবার পর্দায় আসছেন আর তার চাটুকাররাও তাঁকে বাহবা দিচ্ছেন যা একজন শিল্পীকে মনে রাখার মতো কিছুই না করার জন্য উৎসাহ দেয়া। শাকিবের ভক্তরা বলে শাকিব নাকি একাই চলচ্চিত্র টিকিয়ে রেখেছে, আরে ভাই যেখানে কেউই নেই সেখানে একজন যা দিবে সেটাই দর্শক খাবে এর মধ্যে বাহবা পাওয়ার কিছু নেই। শাকিব যদি তার অনুজদের গুরুত্ব দিয়ে একই ছবিতে অভিনয় করতেন তাহলে নতুন নায়করাও অনেক কিছু শিখতে পারতেন কিন্তু শাকিব ও তার ভক্তরা মনে করেন এতে শাকিবের ভ্যালু কমে যাবে, আরে ভাই যার ভ্যালুই নাই তার আবার ভ্যালু বাড়া বা কমার প্রশ্ন আসে কেন? ভ্যালু তার থাকে যে সমসাময়িক আরও ১০ জনের সাথে টেক্কা দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন। যেখানে প্রতিযোগিতাই নেই, একজনই সব সেখানে যোগ্যতার মাপকাঠি নেই।

এবার আসি আমিন খানের প্রসঙ্গে। আমিন খান হলেন আমার দেখা সবচেয়ে দুর্ভাগ্য নায়ক যার নায়কোচিত সবকিছু আছে এখনও কিন্তু তাঁকে পরিচালকরা ঠিক মতো ব্যবহার বা কাজে লাগিয়ে ইন্ডাস্ট্রিকে প্রতিযোগিতামূলক ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারেন। আমিন খানের শুরুর দিকের ছবিগুলো যারা সিনেমা হলের পর্দায় দেখেছিলেন তাঁরা নিশ্চয়ই মানবেন যে সেরা যুগে পাওয়া আমিন খান একজন দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই নয়। আমিন খানের পর্দায় লুকটা এতো দারুন ছিল যে তাঁকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারলে রোমান্টিক, সামাজিক অ্যাকশন সব ধারাতেই দারুন মানানসই একজন নায়ক বাংলাদেশে আজো থাকতো সেখানে শাকিব খানের একনায়কতন্ত্র বা সিন্ডিকেটে সবাইকে জিম্মি করতে পারতেন না। আমিন খানকে সালমান-সানির যুগে দিলিপ বিশ্বাস ‘হৃদয় আমার‘ ও ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’, আজিজ আহমেদ বাবুল ‘দোস্ত আমার দুশমন’, বাদল খন্দকার ‘দুনিয়ার বাদশা’, ‘বিশ্বনেত্রী’ এবং এরপর এফ আই মানিক ‘হৃদয়ের বন্ধন’, ‘ফুল নিবে না অশ্রু নিবে’ ছবিগুলোতে বেশ ভালো ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সালমানের মৃত্যু, ওমর সানির বিদায়ের ফলে সেটা যথার্থ ছিল না যার ফলে আমিন খান বেশকিছু অশ্লীল ছবি করে নিজের মানটা কমিয়ে ফেলেন অথচ রিয়াজের সাথে রোমান্টিক ধাঁচের ছবিতে আমিন খান’কে তৈরি করতে পারতেন যা হয়নি ফলে ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে নায়ক ওমর সানির ব্যাপারে কিছু কথা না বললেই নয়। ওমর সানী হলেন আমার দেখা সবচেয়ে বেকুব নায়ক যিনি হতে পারতেন ইন্ডাস্ট্রির ১নং তারকা তিনি হয়ে গেলেন সময়ের আগেই হারিয়ে যাওয়া এক দুর্ভাগা নায়ক যার পেছনে দায়ী ব্যক্তি ওমর সানির অসচেতনতা ও ভক্ত নামের কিছু চাটুকাররা। ৯০’র দশকের শুরুর দিকে নতুনদের জোয়ারে আগত যেকজন তরুণ নিজেদের আলাদা বলয় গড়ে তুলতে পেরেছিলেন সানী হলেন তাঁদের অন্যতম। নুর হোসেন বলাইয়ের ‘এই নিয়ে সংসার’ ছবি দিয়ে সহনায়ক হিসেবে পর্দায় যার আগমন (প্রথম চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন ‘চাঁদের আলো’ ছবিতে) এরপর ২য় মুক্তিপ্রাপ্ত শেখ নজরুল ইসলামের সুপারহিট রোমান্টিক ছবি ‘চাঁদের আলো’ দিয়ে নিজেকে একক নায়ক হিসেবে প্রমাণ করেন সানী যার ফলে সালমান শাহ চলচ্চিত্রে আসার পর সালমানের সমসাময়িক প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সানী হয়ে উঠেন প্রযোজক পরিচালকদের ভরসার পাত্র। সেইসময় সানী একক নায়ক হিসেবেও যেমন পর্দায় সফল ভাবে এসেছিলেন ঠিক তেমনি কাঞ্চন, জসিম, আলমগীর, রুবেলের সাথেও সহনায়ক হিসেবেও পর্দায় এসেছিলেন এবং নিজেকে রোমান্টিক ও সামাজিক অ্যাকশন দুই ধারাতেই সফল ভাবে প্রমাণ করেন ।

সালমানের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর যে সানী হতে পারতেন সালমানের রোমান্টিক ছবিগুলোর বিকল্প সেই সময় সানির অস্বাভাবিক মুটিয়ে যাওয়া তাঁকে চলচ্চিত্র থেকে বিদায় করতে বাধ্য করে। সালমানের মৃত্যুর পর শাবনুরের সাথে ওয়াকিল আহেমদ এর ‘অধিকার চাই’, মমতাজুর রহমান আকবরের ‘ কুলি’ সুপারহিট হলেও মুটিয়ে যাওয়া সানির সাথে শাবনুরের অভিনীত ওয়াকিল আহমেদের ‘শান্তি চাই’, উত্তম আকাশের ‘কে অপরাধী’, বাদল খন্দকারের ‘মধুর মিলন’ ছবিগুলো বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে, এমনকি মৌসুমির সাথে এ জে মিন্টু’র দারুন গল্পের ছবি ‘বাপের টাকা’ও ব্যর্থ হয় যার ফলে সানিকে নিয়ে আর কোন আশা ভরসা রইলো না। যে ভক্তরা সানির চাটুকারিতা করতো তারাও ব্যর্থ মোটাসোটা সানিকে ভুলে গেলো। নির্মাতারা রোমান্টিক ছবির জন্য রিয়াজ ও সামাজিক অ্যাকশন ছবির জন্য মান্নাকেই বেছে নিলেন তাঁদের সেইসময়কার অভাবনীয় ব্যবসায়িক ছবিগুলোর সাফল্যর কারণে। একজন জনপ্রিয় তারকার অসচেতনতা ও ভক্তদের চাটুকারিতা কি পরিমাণে ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে পারে ওমর সানী হলেন তার জলজ্যান্ত উদাহরন।

আজ চলচ্চিত্রে অনেক তারকাকে দেখি যে সব সময় সব ছবিতে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করেন অথচ বুঝেন না যে সস্তা জনপ্রিয়তার জোয়ার আজ থাকলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁকে মনে রাখবে না। মেধাহীনদের যুগে ১নং আসন ধরে রাখার চেয়ে ইতিহাসে চিরদিন নিজের নামটি স্মরণীয় করে রাখার মতো কাজ করে যাওয়াটা কি উচিৎ নয়? অন্ধ ভক্তরা হয়তো তাঁদের প্রিয় তারকার ভুলগুলো দেখেও দেখে না আর নয়তো ভুলগুলো দেখিয়ে দিয়ে শোধরানোর মতো সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়ার সৎ সাহস রাখে না তাই বলে কি সেই তারকার নিজের কোন বুদ্ধি বিবেচনা থাকবে না? জসিম, উজ্জ্বল, সোহেল রানা’র মতো ইতিহাসে ঠাই করে নেয়া অভিনেতাদের কাছ থেকে এইদেশের কোন অভিনেতা শিখতে না পারেন তাহলে তাঁকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে ভাবতে আমার লজ্জা হয়। কারণ বাংলাদেশের শিল্পের সাথে জড়িত হয়ে যদি শিল্পের পূর্বসূরিদের শিক্ষক হিসেবে না নিতে পারেন তাহলে তাঁর বাংলাদেশের শিল্পের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে আগে মনোনিবেশ করতে হবে এরপর শিল্পের কাজে জড়িত হতে হবে।

শিল্পের দুর্দিনে সময়ের স্রোতে ১ নং আসন যে কেউ ভাগ্যক্রমে পেয়ে যেতে পারে কিন্তু ইতিহাসে চিরদিন রথি মহারথীদের নামের পাশে নিজের নামটি লিখানোর জন্য মেধা ও যোগ্যতা লাগে যা শুধু ভাগ্য দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। আমরা যাদের আজো মনে করি তাঁদের মনে করার কারণ একটাই তা হলো তাঁরা সবাই ছিলেন বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সোনালি সময়ের তারকা যারা সমসাময়িক একাধিক মেধাবিদের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের আলাদা ভাবে চিনিয়েছিলেন এই কারনেই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ও লক্ষ কোটি দর্শকদের হৃদয়ে তাঁদের নাম চিরদিনের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখা হয়ে গেছে।

আরো পড়ুনঃ
তারকা তৈরিতে একজন পরিচালকের অবদানঃ প্রেক্ষিত ঢালিউড
খোকন এবং রুবেল: বন্ধুত্ব, পেশাদারিত্ব আর সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
নায়ক আলমগীর: ঢালিউডের সোনালী প্রজন্মের অন্যতম সেরা এক কিংবদন্তী

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ