তাহাদের কথাঃ বাংলা সিনেমার সোনালী সময়ের চার তারকা (প্রথম পর্ব)

বাংলা সিনেমার সোনালী সময়ের

উজ্জ্বল, সোহেল রানা, রুবেল, আমিন খান নামের চারজন অভিনেতা আমাদের সোনালি যুগের চলচ্চিত্রে ছিলেন যাদের একজনকে বলা হতো ‘মেগাস্টার উজ্জ্বল’, একজনকে বলা হতো ‘ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা’, একজনকে বলা হতো ‘কংফু হিরো’ এবং আরেকজনকে বলা হতো ‘হ্যান্ডসাম হিরো’। এই তারকারা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ যে সময়ে রেখেছিলেন তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ছিল সোনালি সময় যেখানে মেধাবী, জনপ্রিয় তারকার অভাব নেই এবং প্রযোজক পরিচালকের অভাব নেই। দর্শক ও চলচ্চিত্র শিল্প কেউই শিল্পী সংকটে ভুগছিল না। সেই যুগে উল্লেখিত ৪ জনকে নিয়ে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী কথা বলবো যা আজকের চলচ্চিত্রের ইন্ডাস্ট্রিতে শীর্ষে থাকা মানুষগুলো হয়তো কিছু শিখতে পারবেন।

উজ্জ্বল যার পুরো নাম আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল যিনি সুভাষ দত্তের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ ও খান আতার মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল ও এর পরের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘আবার তোরা মানুষ হো’ এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের কেন্দ্রিয় অভিনেতা ছিলেন। এই উজ্জ্বল ‘আবির্ভাব’ নামের ক্লাসিক রোমান্টিক ছবিও করেছিলেন যা আজো দর্শকদের চোখে ভেসে উঠে। উজ্জ্বল শুধু কালজয়ী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তা নয় তিনি দিলিপ বিশ্বাসের ‘বন্ধু’, ‘সমাধি’র মতো ছবিতেও ২য় নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছিলেন আবার ‘উছিলা’, ‘আমি ওস্তাদ’, ‘নালিশ’, ‘নসিব’ এর মতো বক্স অফিস কাঁপানো ধুমধাম বাণিজ্যিক ছবি।

প্রযোজক হিসেবেও ছিলেন উজ্জ্বল সফল। সমসাময়িক রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, ফারুক, ওয়াসিম, বুলবুল, জাফর ইকবাল, জসিম কারো ভিড়ে উজ্জ্বল হারিয়ে যাননি বরং নিজের জন্য ‘মেগাস্টার’ উপাধিটা অর্জন করেছিলেন। উজ্জ্বল ছিলেন আমাদের বাণিজ্যিক ছবির দর্শকদের কাছে ছিলেন ‘সুপার হিরো’ ধরনের একজন। তামিল নায়ক রজনীকান্তের সাথে মিল পেতো আমাদের দর্শকরা। উজ্জলের বক্স অফিস কাঁপানো ‘নালিশ’, ‘নসীব’, ‘কারণ’, ‘উছিলা’, ‘ঘরবাড়ি’ সব ছবিতেই নিজেকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়েছিলেন। যে কারণে দর্শক পরিচালক প্রযোজক সবার কাছে উজ্জ্বল ছিলেন আলাদা কিছু যে কারণে ‘মেগাস্টার ‘ উপাধিটা তাঁকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কখনই চলনে বলনে ব্যক্তিগত জীবনে উজ্জ্বল নিজেকে ‘মেগাস্টার’ ভাবে ধরে রাখতেন না, ছিলেন বিনয়ী ও সদালাপি।

‘মাসুদ রানা’ ছবি দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা’র। অথচ এর আগে সোহেল রানা চলচ্চিত্রে যুক্ত হয়েছিলেন মাসুদ পারভেজ নামে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন ‘ এর প্রযোজক হিসেবে। ‘মাসুদরানা’ ছবির সাফল্যর পর সোহেল রানা একে একে হাজির হয়েছিলেন ‘দস্যু বনহুর’, ‘এপার ওপার’, ‘গুনাহগার’ এর মতো চলচ্চিত্র দিয়ে যেগুলোর কোনটি ছিল অ্যাকশন আর কোনটি ছিল রোমান্টিক ক্লাসিক চলচ্চিত্র। সোহেল রানার জনপ্রিয়তায় দেখে দিলিপ বিশ্বাস রাজ্জাক ও আলমগিরের সাথে ‘জিঞ্জির’ ছবিতে সোহেল রানাকে অন্তর্ভুক্ত করেন যেখানেও তিনি সফল তাঁর মতো করে। মাস্টারমেকার এ জে মিন্টু’র প্রথম চলচ্চিত্র ‘মিন্টু আমার নাম’ ও দেওয়ান নজরুলের প্রথম চলচিত্র ‘দোস্ত দুশমন’ দুটো ছবিতেই সোহেল রানা ছিলেন তাঁর প্রতিভা ও যোগ্যতার কারণে। দুটো ছবিতেই তিনি বাজিমাত করেন।

অথচ এই সোহেল রানাকে পরবর্তীতে দেখা গেছে দেওয়ান নজরুলের ‘আসামি হাজির’ ছবিতে ২য় নায়ক হিসেবে যেখানে কেন্দ্রিয় চরিত্রে ছিলেন জগনু ও মগনু নামে ওয়াসিম দ্বৈতচরিত্রে। ‘আসামি হাজির’ ছবিতে সোহেল রানা’র চেয়ে ওয়াসিম বেশী জনপ্রিয় হয়েছিলেন। আবার দেওয়ান নজরুলের ‘বারুদ’ ও ‘ওস্তাদ সাগরেদ’ ছবিতে নায়িকা ছাড়া, প্রেম রোমান্স ছাড়া অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা ও ভালোবাসা অর্জন করেন। ‘মারদাঙ্গা’ ছবির জনপ্রিয় নায়ক হয়েও নিজের প্রযোজিত ‘জীবন নৌকা’ ছবির মতো ক্লাসিক রোমান্টিক ছবিতে অভিনয় করে দর্শকদের অবাক করে দিয়েছিলেন। যে সোহেল রানা শাবানা জুটি জনপ্রিয় সেই সোহেল রানা দিলিপ বিশ্বাসের ‘অস্বীকার’ ছবিতে শাবানা’র বড় ভাই রুপে অভিনয় করেছিলেন। এভাবে ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকাবস্থায় বিভিন্ন ছবিতে নিজেকে চরিত্রের প্রয়োজনে ভেঙেছেন। কখনও শোনা যায়নি কোন পরিচালক বা প্রযোজকের ছবিতে সহ নায়ক হিসেবে অভিনয় না করার কথা। যখন যে ছবি পেয়েছেন সেই ছবিতেই নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন। এমনকি নিজের প্রযোজিত ‘মারকশা’ ছবিতে ছোট ভাই রুবেলকে কেন্দ্রিয় চরিত্রটি দিয়ে নিজেকে রেখেছিলেন অথিতি চরিত্রের মতো।

সোহেল রানা শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক বা অভিনেতা নন তিনি একজন গুণী পরিচালকও যার হাত ধরে এই চলচ্চিত্রে এসেছিলেন শহিদুল ইসলাম খোকন, শামসুদ্দিন টগর, আবুল খায়ের বুলবুল, মারুফ হোসেন মিলন, ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলমের মতো পরিচালকরা। সেই সোহেল রানা চলচ্চিত্রে নিজেকে কখনও অনেক বড় কোন তারকা মনে করেননি অথচ আজকের অনেক তথাকথিত বড় তারকার চেয়েও বড় হওয়ার যোগ্যতা তিনি সেই তুমুল প্রতিযোগিতার আমলে প্রমাণ করেছিলেন যার জন্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সোহেল রানা নামটি চিরদিনের জন্য লিখা হয়ে গেছে বহু আগেই।

চিত্রনায়ক রুবেল যাকে আমরা ‘কংফু নায়ক’ হিসেবে ডাকতাম তিনি হলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির সেই নায়ক যিনি ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ১২টি বছরের অভিনীত কোন ফ্লপ ছবি উপহার দেন নাই। রুবেল হচ্ছেন সেই নায়ক যার যে ছবিটা সবচেয়ে কম ব্যবসা করেছে সেটাও পুঁজি ফেরত পেয়েছে এবং যা অন্য কোন নায়কের নেই। এমনকি চলচ্চিত্রে সালমান সানি’র মতো নতুন নায়কদের দাপটে যুগেও রুবেল ছিলেন অনন্য যার সেইসময়ে কোন ফ্লপ ছবি ছিল না। রুবেল কি পরিমান সুপারহিট ছবি দিয়েছেন তা দেশসেরা পরিচালকদের অন্যতম শহিদুল ইসলাম খোকনের ২৫ টি সুপারহিট ছবির তালিকা দেখলেই বুঝতে পারবেন যার প্রায় সবগুলোই রুবেল অভিনীত। শুধু শহিদুল ইসলাম খোকন নন এ জে রানা, আবুল খায়ের বুলবুল, রানা নাসের, কমল সরকার, আহমেদ সাত্তারের মতো সেইসময় তরুণ পরিচালকদের যত হিট সুপারহিট ছবি আছে সেগুলোও রুবেলের। সালমান-সানির যুগে সালমান-সানিরা যা পারেননি সেটা রুবেল করে দেখিয়েছিলেন অর্থাৎ কিছু পরিচালক ছিলেন একমাত্র রুবেল কেন্দ্রিক ছবি নির্মাণ করতেন যার বিপরীতে কাজী হায়াত ও মমতাজুর রহমান মান্না’কে দাড় করান।

শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘লড়াকু’, ‘বীরপুরুষ’, ‘বিপ্লব’, ‘বজ্রমুষ্টি’, ‘উত্থান পতন’, ‘বিষদাঁত’, ‘অকর্মা’, ‘অপহরণ’, ‘সতর্ক শয়তান’, ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘ঘাতক’, ‘ভণ্ড’, ‘রাক্ষস’, ‘পাগলা ঘণ্টা’, ‘যোদ্ধা’ যেমন সুপারহিট তেমনি এ জে রানা’র ‘মহাগুরু’, ‘মূর্খমানব’, ‘ডন’, ‘আজকের হিটলার’, ‘মানুষ’, কমল সরকারের ‘মিথ্যার রাজা’, ‘বিপদ সংকেত’ ছবিগুলোও হিট। শুধু তাই নয় রুবেলকে নিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, ফজল আহেমদ বেনজির, ফজলে হক, শিবলি সাদিক, এম এ মালেক, এম এম সরকার, মালেক আফসারি এর মতো প্রবীণ পরিচালকরাও সফল হয়েছিলেন। রুবেল সম্ভবত সেই সময় শুধু এ জে মিন্টু, আমজাদ হোসেন, আজিজুর রহমান, সুভাষ দত্তের মতো পরিচালকদের ছবিতে অভিনয় করেননি আর করার কথাও না। কারণ উনাদের ছবিগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের।

এই রুবেল যেখানে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সামাজিক অ্যাকশন ছবিতে অভিনয় করতেন এবং রুবেল বলতেই আমরা বুঝতাম অ্যাকশন ধাঁচের ছবি সেই রুবেল সোহানুর রহমান সোহানের অফিসিয়াল রিমেক ‘স্বজন’ নামের মিউজিক্যাল রোমান্টিক ছবিতে অভিনয় করলেন তাও আবার বলিউডের সালমান খানের চরিত্রে। সেই ছবিতে রুবেলের ঠোঁটে ‘আমার ইচ্ছে করে কাছে যাই, তোমায় আরও কাছে পাই প্রিয়’ গানটি সেইসময়ের তরুণ দর্শকদের দারুন লেগেছিল। পুরো ছবিতে ত্রিভুজ প্রেমের  টানাপোড়েন, নেই রুবেলের সেই মারমার কাটকাট কংফু অ্যাকশন তবুও ছবি সুপার বাম্পার হিট হয়ে গেলো। কারণ একটাই কাঞ্চন মৌসুমির পাশে অ্যাকশনবিহীন রুবেলকে দর্শকদের খারাপ লাগেনি। রুবেলের অন্ধ ভক্তরাও ছবিটিকে লুফে নিলেন। রুবেলের ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রে ভক্তরা খুশী।

একই ভাবে সিদ্দিক জামাল নানটু’র ত্রিভুজ প্রেমের ছবি ‘ভাংচুর’ ছবিতেও রুবেল সফল। সফল হলেন শহিদুল ইসলাম খোকনের রোমান্টিক, কমেডি, থ্রিলার ‘বিশ্বপ্রেমিক’ ও ‘ভণ্ড’ ছবিতেও। এই যে নিজেকে একটা চেনা স্টাইল/ ঘরনা থেকে পরিবর্তন করে আরেক ঘরনায় রুবেল নিয়ে গেলেন তাতে করে রুবেলের ‘কংফু অ্যাকশন’ ছবির জনপ্রিয়তায় কি ভাটা পড়েছিল? একদমই না বরং রুবেল নিজেকে প্রমাণ করলেন যে অ্যাকশন ধাঁচের ছবি ছাড়াও রুবেল সফল হতে পারেন। এই রুবেল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল সময়ে জসিম, কাঞ্চন, আলমগীর, মান্না, ওমর সানী’র মতো স্টারদের সাথে একই ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন।

আরো পড়ুনঃ
তারকা তৈরিতে একজন পরিচালকের অবদানঃ প্রেক্ষিত ঢালিউড
খোকন এবং রুবেল: বন্ধুত্ব, পেশাদারিত্ব আর সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
নায়ক আলমগীর: ঢালিউডের সোনালী প্রজন্মের অন্যতম সেরা এক কিংবদন্তী

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ