ঢালিউডে তারকাবহুল সিনেমা: সময়ের ধারাবাহিকতায় সেকাল থেকে একাল

ঢালিউডে তারকাবহুল সিনেমা

সেই শৈশবে ‘বেদীন’ নামে একটি সিনেমা দেখেছিলাম যেখানে খুব সম্ভবত ৮ জন সময়ের জনপ্রিয় নায়ক নায়িকা ছিলেন। যতদূর মনে পড়ে ছবিটিতে ছিলেন সোহেল রানা, ওয়াসিম, জাফর ইকবাল, উজ্জ্বল, অলিভিয়া, সুচরিতা ও জসিমের মতো তারকারা। পরিচালক এস এম শফি কত দারুন ভাবে ছবিটিতে সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন তা তখন বিস্মিত করেছিল। এছাড়া দিলিপ বিশ্বাসের ‘জিঞ্জির’ ছবিতে ছিলেন রাজ্জাক, আলমগির ও সোহেল রানার মতো সময়ের তিন সুপারস্টার যাদের পরবর্তীতে আর কোন ছবিতে এক সাথে দেখিনি। তবে রাজ্জাক ও সোহেল রানা, আলমগির ও সোহেল রানা, কিংবা রাজ্জাক ও আলমগিরকে আরো বহু ছবিতে একত্রে পেয়েছিলাম। আলমগির কুমকুমের ‘কাপুরুষ’ ছবিতে তো রাজ্জাক, আলমগির, শাবানা এবং ববিতার মত সময়ের চার সুপারস্টারকে একসাথে পেয়েছিলাম। ঢালিউডে তারকাবহুল সিনেমা অনেকটা নস্টালজিক অনুভুতি কারন সময়ের জনপ্রিয় একাধিক নায়ককে বহু ছবিতে দেখেছিলাম যার সবগুলোই দারুন উপভোগ্য।

- Advertisement -

৮০’র দশকের শুরুর দিকে পর্দা কাঁপানো জনপ্রিয় নায়ক সোহেল রানাকে ‘বারুদ’ ছবিতে দেখেছিলাম একেবারেই অন্যরুপে যার বিপরীতে কোন নায়িকা ছিল না অথচ কত দারুন ভাবে তিনি দর্শকের মনে ঠাই করে নিয়েছিলেন। ‘বারুদ’ ছবিতে সোহেল রানার মতো জনপ্রিয় নায়িকা ববিতারও কোন নায়ক ছিল না অথচ একই ছবিতে ওয়াসিম-শাবানা রোমান্স করে বেড়াচ্ছিল। সোহেল রানাকে আবার দেখি ‘ওস্তাদ সাগরেদ’ ছবির মূল চরিত্রে যেখানেও তার বিপরীতে কোন নায়িকা ছিলেন না অথচ একই ছবিতে আলমগির, ওয়াসিম, শাবানা এবং সুচরিতা রোমান্স করে বেড়াচ্ছেন। এদিকে ‘মিসলংকা’ ছবিটা পুরোটাই ছিল ববিতা ও ফয়সালের প্রেম কাহিনী কিন্তু আচমকা জাফর ইকবাল এসে হাজির হলেন ছোট একটি চরিত্রে। মনে পড়ে ফজলে হকের ‘সম্পর্ক’ ছবিটির কথা, যেখানে অ্যাকশন কিং জসিম ছিলেন রুবেল ও ইমরানের বাবা চরিত্রে। অথচ জসিম তখন মারমার কাটকাট সিনেমা দিয়ে দর্শকদের পাগল করে তুলেছিলেন।

সময়ের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী শাবানার এমন উদাহরণ আরো বেশি যেখানে শাবানার বিপরীতে কোন নায়ক নেই কিন্তু শাবানা আছেন তার মতো দুর্দান্ত রুপে। এমনভাবে আরও বহু উদাহরণ দেখানো যাবে যেখানে সময়ের সেরা সব নায়ক নায়িকা একই সাথে একই ছবিতে অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রটাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। নিজেদের সেরা সময়ে অ্যাকশন সিনেমার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী তারকা মান্না এবং রুবেল পর্দায় হাজির হয়েছেন একসাথে। এই দুই তারকাকে দর্শক দেখেছেন ‘অন্ধ আইন’, ‘মানুষ’ এবং ‘মুক্তি চাই’ এর মত সিনেমায়। এই প্রতিটি সিনেমায় মান্না এবং রুবেলকে নির্মাতারা উপস্থাপন করেছেন সমান গুরুত্বের সাথে। একমাত্র সালমান এখানে ব্যতিক্রম ছিল যেখানে সালমানের সাথে সময়ের কোন জনপ্রিয় নায়ক অভিনয় করেনি, তবে আমার বিশ্বাস সালমান জীবিত থাকলে হয়তো সানি, কাঞ্চন, মান্না, রুবেলদের সাথে একই ছবিতে আমরা পেতাম।

- Advertisement -

উপরে এতোগুলো কথা কেন বললাম জানেন? কারণ আজ চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক তারকা দেখি কিন্তু দেখিনা একসাথে সবাইকে দর্শকদের জন্য কাজ করতে। তথাকথিত সময়ের এক নাম্বার হিরোকে দেখিনা নতুন প্রজন্মের জনপ্রিয় কোন নায়ককে নিজের ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করাতে। ভাবটা এমন যেন যা করবেন সব নিজে একাই করবেন আর কাউকে কিছু করতে দিবেন না। এক সাথে একই ছবিতে সিনিয়র জুনিয়র জনপ্রিয় আর্টিস্টদের দেখাটা যে দর্শকদের কাছে কি মজার ও আনন্দের সেটা আজকের দর্শকরা আজো বুঝেনি। আমাদের সিনিয়র অভিনেতা অভিনেত্রীরা তাদের যুগে বারবার জুনিয়রদের সাথে একই ছবিতে কাজ করেছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।

তারকাবহুল সিনেমা থেকে আমাদের অভিনেতা অভিনেত্রীরাও লাভবান হয়ে থাকেন। অনেকে অভিনয়ের অনেক ভুলত্রুটি শোধরাতে পারেন ।  সিনেমাগুলো দর্শকদের কাছে যেমন উপভোগ্য তেমনি ব্যবসায়িক ভাবেও সফলতা পায়। দর্শক এক ছবিতে একাধিক জনপ্রিয় তারকাকে পাল্লা দিয়ে অভিনয়ের প্রতিযোগিতাটা দেখতে পারেন। এতে করে সিনিয়র তারকা অনেকসময় জুনিয়রের কাছ থেকে শিখতে পারেন আবার জুনিয়র তার সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করে সিনিয়রকে টপকে যাওয়ার জন্য। সত্যি কথা বলতে এই ধরনের ছবিগুলো আমাদের সাধারন দর্শকদের কোন বিশেষ তারকার প্রতি অন্ধভক্ত হওয়া থেকে বিরত রেখেছিল।

আমাদের সময়ে আমরা সবার ছবি দেখতাম। সব সপ্তাহে বা মাসে যে নিজের পছন্দের তারকার ছবি মুক্তি পেতো তা নয় এবং সেটা সম্ভবও না। তাই আমরা আলাদা আলাদাভাবে যতই রাজ্জাক, আলমগির, সোহেল রানা কিংবা কাঞ্চন, মান্না, রুবেল, সালমান, সানির ভক্ত হইনা কেন আমরা দলবেঁধে অন্য তারকার ছবিগুলোও সিনেমা হলে গিয়ে দেখতাম। একজন রাজ্জাক, আলমগির, সোহেল রানা, জসিম, কাঞ্চন, জাফর ইকবাল, রুবেল, মান্নাকে দর্শকরা আজো এমনি এমনি মনে রাখেনি। সেদিনের দর্শকরা দেখেছিল কি ভাবে একেকজন কত কষ্ট করে নিজেকে প্রমানের চেষ্টা করেছিলেন। সেদিনের দর্শকরা দেখেছিল একেকজন তারকা আরেকজন তারকাকে সম্মান দিতো।

এই ধরনের ছবি ইন্ডাস্ট্রিতে যত বেশি হয় ততই ইন্ডাস্ট্রির শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং একের সাথে অন্যর বোঝাপড়াটা ও সম্পর্কের উন্নতি ঘটে যা আজ নেই বললেই চলে। সবাই চায় একা সবকিছু করে ফেলতে। সবাই চায় নিজে একা জনপ্রিয় নায়ক/নায়িকা হতে অন্যদের প্রমোট করতে চায় না। ভাব দেখে মনে হয় শাকিব, শুভ এবং বাপ্পি এক ছবিতে অভিনয় করলে একেকজনের জনপ্রিয়তায় অন্যজন ভাগ বসাবে। এটা কি কোনদিন সম্ভব? জনপ্রিয়তা যার যার সেটা তেমনই থাকবে। যদি তা না হতো তাহলে ‘নসীব’ ছবির উজ্জ্বলকে একাই সবাই মনে রাখতো, কিন্তু নসীব ছবির কথা মনে হলেই কাঞ্চন রোজিনার ‘তোমাকে চাই আমি আরও কাছে’ গানটির কথা মনে পড়ে।

এই ধরনের তারকাবহুল সিনেমা না হওয়ার পেছনে দূরদর্শী প্রযোজক ও পরিচালকের যেমন দায় আছে ঠিক তেমনি দর্শকদেরও দায় আছে। দর্শকরা আজ কেউ শাকিব খান, কেউ শুভ, কেউ বাপ্পি নামে অন্ধ। কেউ চায় না তার নিজের পছন্দের নায়ক/নায়িকা ব্যতিত অন্য কারো ছবি সফল হোক। কেউ নিজের পছন্দের নায়কের ছবি ছাড়া অন্য নায়কের ছবি দেখতে চায় না যা খুবই হাস্যকর। সবাই চায় নিজের প্রিয় নায়ককে এককভাবে ‘মহাপুরুষ’ হিসেবে দেখতে কিন্তু তা যে প্রিয় নায়ককে ‘কাপুরুষ’ বানিয়ে ফেলছে সেটা ভাবে না। যারা প্রতিযোগিতা চায় না, যারা প্রতিযোগিতা বাড়ানোর সৎ সাহস দেখায় না তারা তো পর্দায় নায়ক হয়েও বাস্তবে ‘কাপুরুষ’ হবেই, ‘কাপুরুষ’ কোনদিন ‘মহাপুরুষ’ হয় না।

এই ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রির বর্তমানে যিনি সবচেয়ে সিনিয়র তিনি যদি নিজেকে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির আজকের ‘মহাপুরুষ’ হিসেবে দেখাতে একা পথে হাঁটেন সেখানে জুনিয়ররা শিখবে কার কাছ থেকে? বড় দুর্ভাগ্য যে আমাদের বিভাজনের সংস্কৃতি আজ সর্বক্ষেত্র গ্রাস করে ফেলেছে যার খেসারৎ রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই আমাদের আজ দিতে হচ্ছে এবং হবে আরও বহুদিন। বিভাজন আজ আমাদের একটি সামাজিক ব্যাধির নাম হয়ে গেছে। …এই বিভাজন দিয়ে কোনদিন কেউ কোন মঙ্গল বয়ে আনতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। এভাবে হয়না, হতে পারেনা। বাংলা সিনেমার সুসময় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনে ঢালিউডে তারকাবহুল সিনেমা এখন সময়ের দাবী। নতুন প্রজন্মের কোন না কোন নির্মাতার হাত ধরে ঢালিউডে তারকাবহুল সিনেমা ফিরে সাবে সেই প্রত্যাশা করছি।

আরো পড়ুনঃ
খোকন এবং রুবেল: বন্ধুত্ব, পেশাদারিত্ব আর সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
ওমর সানী এবং মৌসুমি: বাংলা সিনেমার হারিয়ে যাওয়া জুটির শুরুর গল্প
রুবেল এবং আমিন খান: সময়ের আগেই হারিয়ে যাওয়া দুই তারকা

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ