প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ রায়হান মুজিবের ‘আত্ন অহংকার’

রায়হান মুজিবের ‘আত্ন অহংকার’

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তখন যৌবনের শেষ প্রান্তে। নবীন প্রবীণ শিল্পী, প্রযোজক, পরিচালক আর কলা কুশলীদের বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। যে ছবি মুক্তি পায় সেই ছবি দেখতেই নতুন প্রজন্মের দর্শক ও সপরিবারে যাওয়া মহিলা দর্শক সবাই হলে ছুটে যায়। নতুন প্রজন্ম তখন সালমান শাহ – ওমর সানী দুই নবীন নায়কে বিভক্ত। ঠিক সেই মুহুর্তে মুক্তি পেলো রায়হান মুজিবের ‘আত্ন অহংকার’ সিনেমাটি। যে দর্শকরা মাত্র কদিন আগে সানী- মৌসুমী জুটির ১ম সিনেমা ‘দোলা’ দেখার সুখস্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত সেই দর্শকদের সামনে আবারও সানী-মৌসুমী জুটি হাজির হয়ে গেলো। এ যেন মেঘ না চাইতেই তুফান পাওয়া অবস্থা। সালমান-মৌসুমী জুটি যখন ভাংগন ধরেছিলো ঠিক তখনই দিলীপ সোম ‘দোলা’ দিয়ে সানী-মৌসুমী জুটি সৃষ্টি করে আগামীর যুদ্ধের গতিপথ দেখিয়ে দিলেন। অর্থাৎ সপরিবারে উপভোগ্য মিউজিক্যাল রোমান্টিক সিনেমা ‘দোলা’র ব্যবসায়িক সফলতা সালমান-শাবনূর জুটির বিপরীতে সফল আরেকটি নতুন জুটি দাঁড়ানোর পথটা শুরুতেই মসৃণ করে দিয়েছিল যেখানে ‘আত্ন অহংকার’ তা প্রতিস্ঠিত করে দেয়।

- Advertisement -

ছবির পরিচালক রায়হান মুজিব আমাদের কাছে ‘ভাইজান’ এবং ‘কাজের বেটি রহিমা’ সিনেমার জন্য আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। রায়হান মুজিবের এটাই ছিলো নতুন যুগের তারকাদের নিয়ে নতুন যুগের দর্শকদের জন্য ১ম সিনেমা। রেডিওর বিজ্ঞাপন শুনে মুক্তির আগেই নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে তুমুল আগ্রহ সৃষ্টি হয় রায়হান মুজিবের ‘আত্ন অহংকার’ দেখার ব্যাপারে। এরপর পত্রিকার বিজ্ঞাপন ও টেলিভিশনের ট্রেলার প্রকাশের পর আমাদের কাছে তখন ‘আত্ন অহংকার’ না দেখতে পারলে বিরাট পাপ হবে এমন মনে হলো। সবাই টার্গেট করলাম মুক্তি পাওয়ার ১ম দিনের ১ম মর্নিং শো (১ম শো) তে দেখতেই হবে। ১ম সপ্তাহ টিকেটের দাম চড়া থাকে (কালোবাজারে), তার উপর ১ম দিনের ১ম শো কাউন্টার থেকে ন্যায্য মূল্য টিকেট কাটতে পারবো না ধরেই আমরা সবাই তখন ঘর থেকে টাকা নেয়ার একটা বুদ্ধি বের করলাম। সবাই যার যার ঘরে গিয়ে বললাম আগামী শুক্রবার এক বন্ধুর বোনের বিয়ের দাওয়াত আছে। কথামতো শুক্রবার সকালেই বন্ধুর বোনের বিয়ের গিফটের চাঁদা বাবদ ১০০টাকা আব্বার কাছ থেকে নিয়ে সকাল সোয়া এগারোটায় পূর্বনির্ধারিত স্থানে গিয়ে হাজির হলাম আমরা সবাই।

সেখানে দেখা গেলো সবার ভেতর টানটান উত্তেজনা। ৯ জন মিলে যোগাড় হয়ে গেলো ১৪০০ টাকা। অর্থাৎ সিনেমা দেখে ফেরার পথে চিকেন বিরিয়ানি খেয়ে ঘরে ফিরতে কোন অসুবিধা নাই। তিন রিক্সা করে দিলাম মণিকা সিনেমার দিকে ছুট। হলের সামনে গিয়ে দেখি আমাদের মতো বন্ধুর বোনের বিয়ে খেতে আসা কয়েক শো দর্শক উপস্থিত। এ যেন বিশাল কমিউনিটি সেন্টার!!! কাউন্টার তো দুরের কথা, কালোবাজারেও টিকেট পাবো কিনা সেই চিন্তায় গলা শুকিয়ে গেলো। অবশেষে অনেক ঝক্কিঝামেলা শেষে হলের ভেতর প্রবেশ করলাম। ভেতরে ঢুকে চেয়ার পাওয়া নিয়ে আরেক টেনশন। সেদিন মনে হলো এইদেশে সবাই ইনু মেনন হইতে চায়। একটা পোলাপাইনও জুম্মার নামাজ পাইবো না তা নিয়া কোন টেনশন নাই। যাইহোক সিনেমা দেখতে আসছি সেটা নিয়েই টেনশনে থাকি আপাতত, আগামী শুক্রবারে জুন্মা পড়ে পুষিয়ে দিবো এমন একটা ভাব সবার মনে। আবার কারো কারো ভাবে মনে হইলো আজ যে শুক্রবার সেটা সিনেমা হলে ঢুকার পরে মনে হলো এবং জুম্মা বাদ যাবে এই লজ্জায় হলের সিটের নিচে মাথা ঢুকিয়ে চিপা দিয়ে মরে যাই এমন অবস্থা!!!!

- Advertisement -

অবশেষে শুরু হলো রায়হান মুজিবের ‘আত্ন অহংকার’ সিনেমার গল্প। জমিদার গোলাম মোস্তফা বনে পাখি শিকারে গিয়েছেন। মোস্তফার দেহরক্ষী প্রবীর মিত্র বনের বাহিরে বসে বসে মোস্তফার বিভিন্ন সরঞ্জামাদি পাহারা দিচ্ছে। এদিকে মোস্তফার আরেক চাকর হুমায়ূন ফরিদীর মা ভীষণ অসুস্থ। হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু হাসপাতালে নেয়ার জন্য কিছু নাই তাই প্রবীর মিত্রের কাছে অনুরোধ করে মোস্তফার খাটিয়া চেয়ার চেয়ে নিলো। ফরিদীর দুই ভাই কাধে চেয়ার তুলে তাদের মাকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। পথিমধ্যে মোস্তফা দেখে ফেললে ফরিদীর ভাইদের গুলি করে। ফরিদির দুই ভাই মৃত্যু পথযাত্রী মাকে ফেলে পালিয়ে যায় আর ফরিদির মা মারা যায়।

মোস্তফার কাছে পুরো ঘটনা প্রকাশ করে দিতে যাওয়ার পথে ফরিদির হাতে প্রবীর মিত্র খুন হয়। ফরিদী তার মায়ের হত্যার প্রতিশোধ নিবে মোস্তফাকে তার চাকর বানিয়ে এই সংকল্প করে… এভাবেই ‘আত্ন অহংকার’ সিনেমার গল্প শুরু হয়। পরর্তীতে প্রবীর মিত্রের ছেলে সানী আর জমিদার মোস্তফার মেয়ে মৌসুমীর প্রেম, ধনী গরিবের দ্বন্দ্ব সংঘাত আর মনিব ভক্ত চাকর ফরিদির নানা কুট কৌশল এর পরাজয় শেষে সানি-মৌসুমীর মিলনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় রায়হান মুজিবের ‘আত্ন অহংকার’ সিনেমাটি।

ধনী গরীবের গতানুগতিক প্রেম সংঘাত টাইপ গল্প হলেও গল্পের উপস্থাপন ও ক্লাইম্যাক্স ছিলো একদম আধুনিক। গল্পটি সানি-মৌসুমীর প্রেম কাহিনী থেকে মোড় নেয় প্রতিশোধের নেশায় মত্ত সুচতুর মনিবভক্ত ভৃত্য ফরিদির সংকল্প পুরনের সংঘাতের দিকে যেখানে সানি মৌসুমীর প্রেম ও সংঘাত ছিল শুধুমাত্র সাধারণ উপাদান। পরিচালক রায়হান মুজিব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আলাদা দুইটি দ্বন্ধ সংঘাতকে একই সুতোয় বাধতে পেরেছিলেন। পরিচালকের গল্প বলার ধরন, চিত্রনাট্য ও ফরিদির দুর্দান্ত অভিনয়ের কারণে কখনও কখনও মনে হয়েছিল গল্পটি ফরিদীকে নিয়ে। গোলাম মোস্তফা ছবির শেষ দৃশ্যর আগে একবারও বুঝতে পারেননি তার অতি বিশ্বস্ত ভৃত্য ফরিদীর আসল চরিত্র। পুরো ছবিতে ফরিদির ড্রেস ও মেকাপ ছিলো খুবই সাধারণ। একটা টি শার্ট, শর্টস ও কাধে গামছা ঝুলিয়ে থাকা ফরিদী দর্শকদের পুরো সিনেমায় প্রচুর আনন্দ দিয়েছিলেন।

আরো পড়ুনঃ
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ দেওয়ান নজরুলের ‘বারুদ’
সময়ের সিনেমার গল্পঃ মাসুদ পারভেজের ‘জীবননৌকা’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ এজে মিন্টুর ‘সত্য মিথ্যা’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ