নায়ক আলমগীর: ঢালিউডের সোনালী প্রজন্মের অন্যতম সেরা এক কিংবদন্তী

নায়ক আলমগীর

আজকের এই লিখায় আপনাদের এমন একজন অভিনেতা সম্পর্কে জানাবো যিনি আমাদের চলচ্চিত্রে তিন দশক ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র বা নায়ক চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন এবং এখনও অভিনয়ের সাথেই আছেন। তিনি আর কেউ নন, তাঁর নাম আলমগীর যাকে সবাই নায়ক আলমগীর হিসেবেই চেনে। ছোট  বেলায় যিনি হতে চেয়েছিলেন গায়ক কিন্তু হয়ে গেলেন বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক। তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের তালিকায় ২য় অবস্থানে আছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়করাজ রাজ্জাকের পরেই যিনি নিজের আসন পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন বহু আগেই তিনি হলেন জীবন্ত কিংবদন্তী আলমগীর।

- Advertisement -

১৯৫০ সালের ৩রা এপ্রিল নায়ক আলমগীর (পূর্ন নামঃ মহিউদ্দিন আহমেদ আলমগীর) জন্মগ্রহন করেন।  তাঁর পিতার নাম দুদু মিয়া যিনি সেই সময়ের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৫৬ সালে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর প্রযোজক ছিলেন আলমগীরের পিতা দুদু মিয়া। সেই সূত্রেই সিনেমার সাথে ছোটবেলা থেকেই আলমগীরের পরিবারের জানাশোনা। ‘আমার জন্মভুমি’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে আলমগীর এর বাংলা চলচ্চিত্রে আগমন। এরপর ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০ দশকের প্রথম পর্যন্ত একের পর এক ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। আলমগীর শুধু চলচ্চিত্রে একজন অভিনেতা হিসেবেই থেমে থাকেননি তিনি একাধারে একজন প্রযোজক, পরিচালক ছিলেন।

৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০ দশকের প্রথম পর্যন্ত সকল প্রযোজক, পরিচালকের কাছে আলমগীর ছিলেন সবচেয়ে আস্থাশীল ও নির্ভরশীল একজন অভিনেতা। সামাজিক অ্যাকশন, পারিবারিক টানাপোড়ন, রোমান্টিক অ্যাকশন, ফোক ফ্যান্টাসি সহ সব ধারাতেই আলমগীর ছিলেন সফল। যার ফলে সব ধরনের চরিত্রে আলমগীর ছিলেন মানানসই। বাংলাদেশের সর্বাধিক (৬৭টি) ছবির পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝনটু পরিচালিত ৪০ টি ছবিতেই আলমগীর অভিনয় করেন। এতেই বুঝা যায় যে আলমগীরের উপর নির্মাতারা কি পরিমান আস্থা রাখতেন। কলেজ পড়ুয়া তরুন ছাত্র, পুলিশ অফিসার, মাস্তান, গ্রাম্য যুবক, সহজ সরল বোকা যুবক, ব্যর্থ প্রেমিক, রাজকুমার, বড় ভাই, পিতা সহ সব ধরনের চরিত্রে আলমগীর ছিলেন সফল। চলচ্চিত্রে আলমগীর এমনই আস্থাশীল ছিলেন যে কিছু পরিচালক শুধু আলমগীর ছাড়া তাদের ছবিতে অন্য কাউকে চিন্তা করতে পারতেন না।

- Advertisement -

এছাড়া স্বাধীন পরবর্তী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন পরিচালক পাওয়া দুঃসাধ্য যার সাথে আলমগীর কাজ করেনি। আলমগীর এর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো – আমার জন্মভুমি, দস্যুরানী, মণিহার, দেনা পাওনা, জিঞ্জির, নানটু ঘোটক, ওস্তাদ সাগরেদ, সবুজ সাথী, প্রতিজ্ঞা, ভাত দে, মা ও ছেলে, হালচাল, অস্বীকার, অপেক্ষা, ছেলেকার, বৌমা, মায়ের দোয়া, স্ত্রীর স্বপ্ন, অপরাধী, নিস্পাপ, অশান্তি, স্বামী স্ত্রী, সত্য মিথ্যা, বিশ্বাসঘাতক, দোলনা, চেতনা, অমর, ন্যায় অন্যায়, ক্ষতিপুরন, রাঙ্গা ভাবী, গরীবের বউ, সান্ত্বনা, মরনের পরে, অচেনা, অর্জন, গরীবের বন্ধু, অন্ধ বিশ্বাস, ক্ষমা, অবুঝ সন্তান, বাংলার বধূ, পিতা মাতা সন্তান, শাসন, দেশপ্রেমিক, স্নেহ, অজান্তে, সংসারের সুখ দুঃখ, জজ ব্যারিস্টার, রাগ অনুরাগ, ঘাতক, বাপের টাকা সহ প্রায় ২ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেন।

৭০ দশকের শেষ প্রান্তে দিলিপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘জিঞ্জির’ ছবিতে প্রথম একই ছবিতে নায়করাজ রাজ্জাক ও সোহেল রানা’র সাথে সমান তালে অভিনয় করে তিনি নিজের অভিনয়ের দক্ষতা দেখিয়ে সবার কাছে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। এরপর ৯০ দশকের শুরুতে নায়করাজ রাজ্জাক ও অভিনেত্রী শাবানার সাথে মতিন রহমানের ‘অন্ধ বিশ্বাস’ ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পুরস্কার লাভ করেন। ৭০ দশকের শেষ প্রান্তে গীতিকার খোশনূর আলমগীর এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন। আলমগীর-খোশনূর দম্পতির কন্যা আঁখি আলমগীর (সঙ্গীত শিল্পী) ১৯৮৪ সালে ‘ভাত দে’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। ১৯৮৬ সালে আলমগীর তাঁর প্রযোজিত ‘নিস্পাপ’ ছবি পরিচালনা করে পরিচালক হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন। উল্লেখ্য যে ‘নিস্পাপ’ ছবির একটি গানে আলমগীর কণ্ঠ দেন যা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই গানটিই ছিল অভিনেতা আলমগীর এর প্রথম কোন ছবির গানে কণ্ঠ দেয়া গান।

- Advertisement -

১৯৮৫ সালে ‘মা ও ছেলে’ ছবির জন্য আলমগীর প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এরপর অপেক্ষা, ক্ষতিপূরণ, সত্য মিথ্যা, অন্ধ বিশ্বাস, পিতা মাতা সন্তান ও দেশপ্রেমিক ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন, যা ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কোন অভিনেতার সর্বাধিকবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পাওয়ার বিরল ও একমাত্র ঘটনা। এছাড়া আলমগীর ১৯৮৯ – ৯২ সাল পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ, মরনের পরে, পিতা মাতা সন্তান ও অন্ধ বিশ্বাস সিনেমায় অভিনয়ের জন্য একটানা ৪ বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে এক অনন্য রেকর্ড করেন যা এখনও কেউ ভাঙতে পারেনি। এরপর শুধু ১৯৯৩ সাল বাদ দিয়ে ১৯৯৪ সালে কাজী হায়াত এর ‘দেশপ্রেমিক’ ছবির জন্য আবারও শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। সর্বাধিক ৭ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার সহ ২০১০ সালে ‘জীবন মরনের সাথী’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেতা হিসেবে পুরস্কার নিয়ে সর্বমোট ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

নায়ক আলমগীর একজন অভিনেতা হিসেবে কতটা বৈচিত্রময় ছিলেন সেটা তার অভিনীত সিনেমার তালিকা দেখলেই বোঝা যায়। নব্বইয়ের দশকেও আলমগীরকে দেখা গেছে দুর্দান্ত সব তারুন্য নির্ভর চরিত্রে। যে আলমগীরকে ১৯৯১ সালে এ জে মিন্টুর ‘পিতা মাতা সন্তান’ ছবিতে দেখেছিলাম রাইসুল ইসলাম আসাদ ও ইমরানের বৃদ্ধ বাবা চরিত্রে সেই আলমগীরকে তিন বছর পরে ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রে দেখি টগবগে এক মাস্তান যুবকের চরিত্রে। ৫০ ঊর্ধ্ব আলমগীর সেই বয়সেই এতো দারুনভাবে চরিত্রের সাথে মিশে গিয়েছিলেন যে কেউই বলবে না আলমগীরের বয়স ৫০ বছর। আলমগীরের গেটাপটাও ছিল চমৎকার। মাথায় ফিতা বাঁধা, জিন্স, টিশার্ট আর একটি জ্যাকেট পরা। আলমগীর ও রুবেলের একটি ফাইটিং দৃশ্য ছিল যা সিনেমার অন্যতম একটি সেরা দৃশ্য, যেখানে রুবেলের মত একজন তরুন অভিনেতার সাথে সমানভাবে অভিনয় করেছেন।

নায়ক আলমগীর ছিলেন অনেক গুনে গুণান্বিত। অভিনয় এবং প্রযোজনার সাথে তিনি একসময় সিনেমার পরিচালক হিসেবেও আত্নপ্রকাশ করেছেন। তার পরিচালিত সিনেমা ‘একটি সিনেমার গল্প’ মুক্তি পেয়েছে ২০১৮ সালে। সিনেমাটির প্রধান কয়েকটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ, আলমগীর ও ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। এছাড়া সিনেমার গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন এই অভিনেতা। ‘আগুনের আলো’ চলচ্চিত্রের গানে তিনি প্রথম কণ্ঠ দেন। এরপর তিনি ‘কার পাপে’, ‘ঝুমকা’ ও ‘নির্দোষ’ চলচ্চিত্রের গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি হিসেবেও দায়ীত্ব পালন করেন। ঢাকাই সিনেমার সোনালী প্রজন্মের পতাকা ঢালিউডের যে কয়জন অভিনেতা নিজের কাঁধে নিয়ে বেড়িয়েছেন তার মধ্যে আলমগীর অন্যতম। বাংলা সিনেমায় তার অবদানের জন্য সিনেমাপ্রেমীরা কিংবদন্তী আলমগীরকে মনে রাখবে আরো কয়েক যুগ।

আরো পড়ুনঃ
মেগা ষ্টার উজ্জ্বল: সাদাকালো সিনেমার যুগ থেকে রঙ্গিন চলচ্চিত্রের নায়ক
মহানায়ক মান্না: নব্বই দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের এক ‘তেজি পুরুষ’
জাফর ইকবাল: বাংলাদেশের বহুমুখী প্রতিভার এক অবহেলিত নায়ক

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ