প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘টপ রংবাজ’

শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘টপ রংবাজ’

শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘টপ রংবাজ’ সিনেমার গল্পে দেখা যায় ঢাকা শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত এক সংসারের অল্পশিক্ষিত একটি ছেলের নাম নাসির। সংসারে এক পরিপূর্ণ আদর্শ বাংলার গৃহিণীর মতো স্ত্রী শাহানা ছাড়া আপনজন বলতে আর কেউ নেই। তাঁদের অর্থের অভাব ছিল, ছিল দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকার যাতনা। কিন্তু স্বামী স্ত্রী’র মাঝে ভালোবাসার কোন কমতি ছিলনা, ছিলনা সংসারে কোন অসুখ। তাঁদের ৮ বছরের খুব সুখের সংসারে কোন সন্তান ছিলো না। এই নিয়ে নাসির এর মনে কষ্ট থাকলেও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা বেশী ছিল বলে সেই কষ্ট কখনও স্ত্রীর সামনে প্রকাশ করতো না। কিন্তু নারীর মন সব সময় একটি সন্তান এর জন্য ব্যাকুল থাকে শাহানাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই সে প্রায়ই পীর ফকির এর কাছে যেত দোয়া নেয়ার আশায়।

- Advertisement -

নাসির পেশায় বাংলাদেশ শুটিং ফেডারেশন এর একজন ‘সিকিউরিটি’। শুটিং এ তাঁর হাতের নিশানা খুব দুর্দান্ত ছিল বলে ফেডারেশন এর চেয়ারম্যান এর বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে ফেডারেশন এর অনুশীলন কক্ষে অনুশীলন করার সুযোগ পেতো। সেখানে একদিন তাঁর হাতের নিশানা দেখে ঢাকা শহরের একজন জুয়েলারী ব্যবসায়ী তাঁর দোকান এর নিরাপত্তার জন্য মাসিক ৪,০০০ টাকা বেতনে যোগ দেয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়। যা ছিল তাঁর বর্তমান বেতনের তিন গুন। এইভাবেই মোটামুটি সুখেই যাচ্ছিল তাঁদের সংসার।

একদিন পীরের দোয়া ও শাহানার আল্লাহর উপর অগাধ বিশ্বাস করে ধৈর্যের পুরস্কার স্বরূপ এর অবশেষে শাহানা গর্ভধারণ করে। সেই সময় একদিন তাঁর বর্তমান কর্মস্থল জুয়েলারি দোকান এর ম্যানেজার নাসির এর স্ত্রী অসুস্থের মিথ্যা সংবাদ দিয়ে নাসির কে কিছু সময়ের জন্য বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেন। কিন্তু নাসির ঘরে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে সুস্থ দেখে বুঝতে পারে যে ম্যানেজার তাঁকে মিথ্যা খবর দিয়ে বাসায় পাঠিয়েছে। নাসির পুনরায় দোকানে ফেরত যায় তবে ইতিমধ্যে তাঁর অনুপস্থিতিতে দোকানে স্বর্ণডাকাতির একটি ঘটনা ঘটে যায় যার জন্য নাসির কে সন্দেহবশত পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায় । কিন্তু নাসির ঠিকই বুঝতে পারে যে এখানে ঐ ম্যানেজার এর হাত আছে যে তাঁকে মিথ্যা ফাঁসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু দোকানের মালিক তা বিশ্বাস করেনা।

- Advertisement -

নাসির গ্রেফতার হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাঝে শহরের অপরাধ জগতের এক ডন স্বেচ্ছায় নাসিরকে জামিনে মুক্ত করে আনে যা নাসির ছাড়া পাওয়ার পর জানতে পারে। সেই ডন একসময় নাসিরকে শুটিং ক্লাবে অনুশীলনের সময় নাসির এর দুর্দান্ত নিশানা দেখে তাঁর নজরে পড়ে। সেই ডন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নাসির কে কাজে লাগাতে চায় এই স্বার্থে তাঁকে জামিনে মুক্ত করে আনে। থানা থেকে বের হয়েই ডন নাসির কে তাঁর জেলে যাওয়ার পেছনে যে ম্যানেজার আছে তাঁকে খুন করতে বলে। যে ম্যানেজার অপরাধ জগতের শীর্ষ আরেকজনের লোক যার সাথে ডন এর চরম বিরোধ রয়েছে। নাসির ডন এর নির্দেশে প্রতিশোধ নিতে ঐ ম্যানেজার কে খুন করতে যায় কিন্তু নাসির গুলি করার আগেই ডন এর লোকেরাই ম্যানেজার কে গুলি করে হত্যা করে যা ছিল সৎ ও সাহসী নাসির কে কব্জায় আনার একটি কৌশল।

এদিকে খারাপ পথে পা বাড়ানোর জন্য স্ত্রী শাহানার সাথে নাসির এর দূরত্ব তৈরি হয় । একদিন ঘরে ফিরে নাসির দেখে তাঁর ভালোবাসার প্রাণ প্রিয় স্ত্রী তাঁকে ঘৃণা করে চলে গেছে। নাসির স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য ডনের কাছ থেকে মুক্তি পেতে যায় কিন্তু ঐ মুহূর্তেই ডনের বিরোধী পক্ষের লোকেরা ডন কে হত্যার উদ্দেশ্য আক্রমণ করে। প্রথমবার নাসির এর বিচক্ষণতা ও সাহসী কতার ফলে ডন বেঁচে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি, ঐ আততায়ীদের সম্মিলিত আক্রমণের ফলে ডন গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরন করে। আর অপরাধ জগতের শীর্ষব্যক্তি ডন এর শূন্যস্থান পূরণ করতে ডন এর আসন গ্রহণ করে সেই সৎ, সাহসী, নির্লোভী ও ভালোবাসার স্ত্রী হারানো যুবক নাসির যাকে সবাই ‘টপ রংবাজ’ নামে চিনতে শুরু করে। শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘টপ রংবাজ’ সিনেমার এরপরের গল্পটি শুধুই এক দুর্ধর্ষ ‘টপ রংবাজ’ এর নিষ্ঠুর পরিণতির গল্প।

শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘টপ রংবাজ’ এর কাহিনী দেখতে গেলে উপহার স্বরূপ পাবেন বাংলা ছায়াছবির সুরের যাদুকর ও একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত যাদুকর আলম খান এর মিষ্টি মধুর সুরের কিছু গান। যার মধ্য ‘তুমি থাকলে কাছে, এতো মধুর লাগে, মনে হয় পৃথিবীতে আছি বেঁচে’ ছিল সেই সময় টেলিভিশন ও রেডিও কাঁপানো গান। আরও পাবেন সোহেল রানা, শাবানার একজনের প্রতি আরেকজনের অগাধ ভালোবাসা ও নীতিগত দ্বন্দ্বমুখর অসাধারণ অভিনয়। হুমায়ূন ফরিদীর মতো একজন অতি ভয়ানক ও কুট কৌশলী মানুষের দেখা পাবেন, তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই! ফরিদী আপনাদের কোন ক্ষতি করবেনা বরং দিবে ১০০% আনন্দ। আরও পাবেন রাস্তার গরীব এক পরোপকারী রুবেল নামের এক এতিম তরুণ যে মারামারিতে অনেক দক্ষ আর মারামারি করাই তার অভ্যাস। আরও পাবেন দুষ্ট এক বস্তিবাসী তরুণী চম্পাকে। ‘টপ রংবাজ’ সিনেমার কাহিনী লিখেছেন সিনেমাটির পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন নিজেই।

আরো পড়ুনঃ
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ঘাতক’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ এ জে মিন্টুর ‘লালু মাস্তান’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ