সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী: বইয়ের পাতা থেকে রূপালী পর্দায় শরদিন্দুর অমর সৃষ্টি

সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী

‘তাহার বয়স বোধকরি তেইশ-চব্বিশ হইবে, দেখিলে শিক্ষিত ভদ্রলোক বলিয়া মনে হয়। গায়ের রঙ ফরসা, বেশ সুশ্রী সুগঠিত চেহার— মুখে-চোখে বুদ্ধির একটা ছাপ আছে।’

চেনা যাচ্ছে না? তবে আরও কিছু বাক্য উদ্ধৃত করা যাক—

‘শ্রীব্যোমকেশ বক্সী, সত্যান্বেষী। … ওটা আমার পরিচয়। ডিটেকটিভ কথা শুনতে ভালো নয়, গোয়েন্দা শব্দটা আরও খারাপ, তাই নিজের খেতাব দিয়েছি সত্যান্বেষী।’

- Advertisement -

হ্যাঁ, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ব্যোমকেশ বক্সী। ব্যোমকেশের আবির্ভাব ১৯৩২ সালে। শরদিন্দু প্রথমে ব্যোমকেশকে নিয়ে দুটি গল্প লেখেন— ‘পথের কাঁটা’ ও ‘সীমান্ত-হীরা’। পরে ব্যোমকেশকে নিয়ে সিরিজ করার চিন্তা থেকে লেখেন ‘সত্যান্বেষী’, প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। সেই থেকে শুরু। মাঝে ব্যোমকেশকে বিয়ে-শাদি দিয়ে তাকে এক রকম গোয়েন্দাগিরি তথা সত্যান্বেষণ থেকে ছাড়িয়েই নিয়েছিলেন। প্রায় ১৬ বছরের বিরতি শেষে বাঙালি পাঠকদের আগ্রহে আবার ব্যোমকেশকে নিয়ে লিখতে শুরু করেন তিনি। ব্যোমকেশকে নিয়ে তিনি মোটমাট ৩৩টি গল্প লিখেছেন; অবশ্য শেষ গল্প বিশুপাল বধ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।

এই ব্যোমকেশকে নিয়ে সিনেমাও নিতান্ত কম হয়নি। ব্যোমকেশকে নিয়ে নির্মিত সর্বশেষ সিনেমা ‘সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ’ মুক্তি পেয়েছে ২০১৯ সালে। সিনেমাটির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পরমব্রত চ্যাটার্জী। এর আগে ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে মোট দশটি সিনেমা। এর মধ্যে বাংলার পাশাপাশি রয়েছে হিন্দি সিনেমাও। ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি সিনেমাটির নাম ভূমিকায় ছিলেন প্রয়াত অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত।

- Advertisement -

ব্যোমকেশকে নিয়ে প্রথম সিনেমা বানান সত্যজিত রায়, ১৯৬৭ সালে। ‘চিড়িয়াখানা’ গল্প অবলম্বনে একই নামে তিনি সিনেমা বানান। তার ব্যোমকেশ ছিলেন উত্তম কুমার। আর অজিত ছিলেন শৈলেন মুখোপাধ্যায়। সত্যজিতের প্রথম দিকের অন্যান্য ছবিগুলোর মতো এই ছবিটিও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সিনেমাটির জন্য সেরা পরিচালনা ক্যাটাগরিতে তিনি ভারতের জাতীয় পুরস্কার স্বর্ণপদ্ম-ও পেয়েছিলেন। ছবিটি ব্যবসায়িকভাবেও ছিল সফল। পাশাপাশি ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য উত্তম কুমারও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। এরপর ১৯৭৪ সালে মঞ্জু দে ব্যোমকেশের ‘শজারুর কাঁটা’ গল্প নিয়ে সিনেমা বানান। নামও দেন ‘শজারুর কাঁটা’। অজিতের ভূমিকায় ওই শৈলেনেই অভিনয় করেন। আর ব্যোমকেশের চরিত্রে অভিনয় করেন সতীন্দ্র ভট্টাচার্য্য।

সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী

এরপর দীর্ঘদিন ব্যোমকেশকে নিয়ে আর সিনেমা বানানো হয়নি। তবে আশির দশকে ব্যোমকেশের গল্প নিয়ে কোলকাতা দূরদর্শন-এ (ভারতের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলের নাম দূরদর্শন) ‘ব্যোমকেশ বক্সী’-নামে বেশ কিছু পর্ব প্রচারিত হয়। সে সময় ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অজয় গাঙ্গুলি। পরে ব্যোমকেশকে নিয়ে দূরদর্শনের জন্য হিন্দিতে সিরিজ নির্মাণ করেন বাসু চট্টোপাধ্যায়। ১৯৯৩ সালে সম্প্রচার শুরু হওয়া সিরিজটির নাম ছিল ‘ব্যোমকেশ বক্সী’। সেখানে ব্যোমকেশ, অজিত ও ব্যোমকেশের স্ত্রী সত্যবতীর চরিত্রে যথাক্রমে অভিনয় করেন রজত কাপুর, কে কে রায়না ও সুকন্যা কুলকার্নি।

পরে ২০০৪ সালে ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ নামে দূরদর্শনে আরেকটা টিভি সিরিজের সম্প্রচার শুরু হয় বাংলায়। পরিচালনা করেন স্বপন ঘোষাল। আর ব্যোমকেশ, অজিত ও সত্যবতীর চরিত্রে অভিনয় করেন যথাক্রমে সুদীপ মুখোপাধ্যায়, দেবদূত ঘোষ ও মৈত্রেয়ী মিত্র।

২০০৭ সালে স্বপন ঘোষাল আবারও ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ নামেই টিভি সিরিজ নির্মাণ করেন। এবং সিরিজটি সম্প্রচারিত হয় তারা মিউজিকে। স্বপন ঘোষালের এবারের ব্যোমকেশ হয় সপ্তর্ষি রায়। অবশেষে ২০০৯ সালে স্বপন ঘোষাল ব্যোমকেশকে নিয়ে সিনেমা তৈরি করেন। ‘মগ্ন মৈনাক’ গল্প নিয়ে একই নামে সিনেমাটি নির্মাণ করেন তিনি। ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করেন শুভজিৎ দত্ত, অজিত চরিত্রে রাজর্ষি মুখোপাধ্যায়, আর সত্যবতী চরিত্রে পিয়ালী মুন্সী।

পরের বছরই ব্যোমকেশকে নিয়ে সিনেমা বানানোর কাজে হাত দেন অঞ্জন দত্ত। ২০১০ সালে মুক্তি পায় অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ‘ব্যোমকেশ বক্সী’। ব্যোমকেশকে নিয়ে তার প্রথম সিনেমাটি তিনি নির্মাণ করেন ‘আদিম রিপু’ গল্প অবলম্বনে। এরপরে তিনি ব্যোমকেশকে নিয়ে আরও দুটি সিনেমা বানিয়েছেন। ২০১২ সালে ‘চিত্রচোর’ গল্প অবলম্বনে ‘আবার ব্যোমকেশ’, এবং ২০১৪ সালে ‘বেণীসংহার’ গল্প অবলম্বনে ‘ব্যোমকেশ ফিরে এল’। স্বাভাবিকভাবেই তিনটিতেই কাস্টিং ছিল একই; ব্যোমকেশ, অজিত ও সত্যবতীর চরিত্রে যথাক্রমে অভিনয় করেছেন আবীর চট্টোপাধ্যায়, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় এবং ঊষশী চক্রবর্তী। অবশ্য অঞ্জন দত্তের পরের সিনেমায় ব্যোমকেশ পাল্টে যাচ্ছে। ব্যোমকেশকে নিয়ে তিনি তার চতুর্থ সিনেমাটি বানাচ্ছেন ‘কহেন কবি কালিদাস’ গল্প অবলম্বনে। আর তাতে আবীর চট্টোপাধ্যায়ের বদলে ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করছেন যীশু সেনগুপ্ত।

সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী

ব্যোমকেশকে নিয়ে অঞ্জন দত্তের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সিনেমার মাঝে ব্যোমকেশকে নিয়ে আরও দুটি সিনেমা নির্মিত হয়। প্রথমটি নির্মাণ করেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। ‘চোরাবালি’ গল্প নিয়ে নির্মিত তার সিনেমাটির নাম ‘সত্যান্বেষী’। তার ব্যোমকেশ ও অজিত যথাক্রমে সুজয় ঘোষ ও অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। তবে পরের ছবিটি একা ব্যোমকেশের নয়। স্বাগত চৌধুরী পরিচালিত ‘দূরবীন’ নামের সিনেমাটিতে মেলানো হয়েছে বাংলার গোয়েন্দা দিকপালদের।

২০১৪ সালে ব্যোমকেশকে নিয়ে আরেকটি টিভি সিরিজও নির্মিত হয়। ‘ব্যোমকেশ’ নামের টিভি সিরিজটি পরিচালনা করেন অমিত সেনগুপ্ত। প্রচারিত হয় ইটিভি বাংলায়। আর ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করেন গৌরব চক্রবর্তী, সত্যবতী চরিত্রে ঋদ্ধিমা ঘোষ। আর ২০১৫-র শুরুতেই, মার্চে যে বাংলায় ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে আরেকটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, সে তো আগেই বলা হয়েছে। শৈবাল মিত্রের ‘শজারুর কাঁটা’সিনেমায় ব্যোমকেশ আর অজিত চরিত্রে যথাক্রমে অভিনয় করেছেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় ও প্রদীপ মুখোপাধ্যায়।

এর মাসখানেক পরেই, অর্থাৎ এ মাসেই মুক্তি পেয়েছে ব্যোমকেশকে নিয়ে বানানো প্রথম হিন্দি সিনেমা ‘ডিটেক্টিভ ব্যোমকেশ বক্সী’। যশ রাজ ফিল্মসের প্রযোজনায় সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন দিবাকর ব্যানার্জি। কাহিনি নেয়া হয়েছে ‘সত্যান্বেষী’, ‘পথের কাঁটা’ এবং ‘অর্থনর্থম’ গল্প থেকে। এই ‘অর্থমনর্থম’ গল্পেই ব্যোমকেশের সঙ্গে সত্যবতীর পরিচয় ও পরিণয় ঘটে। সিনেমাটিতে ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুশান্ত সিং রাজপুত, অজিত চরিত্রে আনন্দ তিওয়ারি, আর সত্যবতী চরিত্রে দিব্যা মেনন। আর আঙ্গুরি দেবী (ইয়াসমিন) চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বস্তিকা মুখার্জি। এই আঙ্গুরি দেবীর সঙ্গে ব্যোমকেশের চুমু নিয়েই সিনেমা মুক্তির আগে যত রাজ্যের আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছিল।

সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী

সিনেমাটি মুক্তির সময়ই দিবাকর ব্যানার্জি সিনেমাটির সিক্যুয়াল বানানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ‘সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ’ নামের সিনেমাটিতে ব্যোমকেশ এবং সত্যবতী চরিত্রে দেখতে পাওয়ার কথা যথাক্রমে টোটন বিশ্বাস ও অঙ্কিতা বিশ্বাসকে। আর ব্যোমকেশকে নিয়ে অঞ্জন দত্তের চতুর্থ সিনেমায় তার ব্যোমকেশ বদলে যাচ্ছে। আবিরের জায়গায় ব্যোমকেশ হিসেবে দেখা গেছে যীশু সেনগুপ্ত। আবিরও অবশ্য ব্যোমকেশ থেকে একেবারেই বাদ পরেননি। অরিন্দম শীলের পরিচালনায় ‘হর হর ব্যোমকেশ’-এই আবার ব্যোমকেশ রূপে হাজির হয়েছেন তিনি।

এরপর ২০১৬ সালে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী উপস্থিত হয়েছেন আরো তিনবার, ২০১৭ সালে একবার, ২০১৮ সালে দুইবার এবং ২০১৯ সালে একবার। এরমধ্যে রাহুল ব্যানার্জি পরিচালিত ‘বিদায় ব্যোমকেশ’ এবং ‘ব্যোমকেশ গোত্র’ সিনেমা দুটিতে ব্যোমকেশ হিসেবে দেখা গেছে আবির চ্যাটার্জিকে। আর ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যোমকেশ সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন রুদ্রনীল ঘোষ। আর এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন পরমব্রত চ্যাটার্জী। ব্যোমকেশ বক্সী নামটাই যেখানে অসম্ভব এক রহস্যের অনুভুতি দেয়, সেখানে এই চরিত্র নিয়ে আরো সিনেমা সামনের দিনগুলোতে দেখতে পাবো এতে কোন সন্দেহ নেই। রূপালী পর্দায় সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী এবং সত্যের সন্ধানে তার নতুন নতুন যাত্রা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

আরো পড়ুনঃ
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়: বুম্বাদা থেকে যেভাবে টলিউডের ‘মিস্টার ইন্ডাস্ট্রি’
খোকন এবং রুবেল: বন্ধুত্ব, পেশাদারিত্ব আর সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
বাংলার নায়ক সালমান শাহ: বাংলা চলচ্চিত্রের এক ক্ষণজন্মা ধুমকেতু

নাবীল অনুসূর্য
জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। স্কুলের পাঠ চুকিয়েছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে, ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে কলেজের পাঠ। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই ফিচার-সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ফেলোশিপ নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উপর একটি গবেষণার কাজ করছেন। গবেষণার বিষয় আমাদের চলচ্চিত্রে ’৫২-র উপস্থাপন: অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা। এছাড়াও ফ্রি-ল্যান্সিং লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে ও অন্যান্য মাধ্যমে।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ