প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ এ জে মিন্টুর ‘লালু মাস্তান’

এ জে মিন্টুর ‘লালু মাস্তান’

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের স্বর্ণালী যুগে এ জে মিন্টু নামের একজন পরিচালক ছিলেন যার নামটি পোষ্টারে থাকলে কিংবা রেডিও টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে শুনলে দর্শকদের আর কিছু চিন্তা করা লাগতো না। সিনেমার নায়ক নায়িকা কে কিংবা সিনেমাটি দেখবো কি দেখবো না সেটা নিয়ে দ্বিধার কিছু থাকতো না, কারণ দর্শকদের কাছে পরিচালক ‘এ জে মিন্টু ‘ একটি ব্র্যান্ড হয়ে গিয়েছিল যার জন্য এ জে মিন্টুকে বলা হতো ‘মাস্টার মেকার’। সম্পূর্ণ বিনোদনধর্মী বাণিজ্যিক সিনেমা এক অসাধারন রুপকার এ জে মিন্টু ও ‘সানফ্লাওয়ার মুভিজ’ হলো একই সূত্রে গাঁথা। ‘সানফ্লাওয়ার মুভিজ’ হলো পরিচালক মিন্টুর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা অর্থাৎ এ জে মিন্টু শুধুই একজন সফল পরিচালক ছিলেন না, ছিলেন একজন সফল প্রযোজকও। ১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অনেক অসাধারন ছবির ভিড়ে ‘লালু মাস্তান’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে একটি মজার তথ্য আছে যা লিখাটির শেষভাগে আপনাদের বলবো, তার আগে আমার স্মৃতি থেকে নেয়া এ জে মিন্টুর ‘লালু মাস্তান’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে কিছু স্মৃতি আপনাদের শেয়ার করছি।

- Advertisement -

১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ জে মিন্টুর ‘লালু মাস্তান’ সিনেমাটি সিলেটের মনিকা সিনেমা হলে দেখতে গিয়েছিলাম পরিবারের সবার সাথে ছিলো পাড়া প্রতিবেশীদের অনেকে। সিনেমার পর্দা উঠলো, পুরো হলে পিনপতন নীরবতা। ছবির শুরুতে কিশোর রাজুর (জসিম) জন্মদিন উৎসব পালন করতে দেখি আজিম ও আনোয়ারাকে। এরপর আজিমের অফিসের দুই কলিগ আহমেদ শরিফ ও মাহবুব খান গুইয়ের ষড়যন্ত্র আজিমের বিরুদ্ধে। একদিন আজিম ছেলে রাজুকে নিয়ে ফ্যাক্টরিতে গেলে আজিম একটি মেশিন ঠিক করার সময় আহমেদ শরিফের লোক রাজুকে ভুল একটি সুইচে টিপ দিতে বলে যা ছিলো আহমেদ শরিফ গ্যাংদের পূর্বপরিকল্পিত। পিতৃহত্যার দায় মাথায় নিয়ে ঘর থেকে বিদায় হয় রাজু এবং শেষ পর্যন্ত আশ্রয় পায় ভিক্ষুক আনোয়ার হোসেনের কাছে। আনোয়ার হোসেন অনেক কষ্ট করে জসিমকে লিখাপড়া শেখায় কিন্তু জসিম কোথাও কোন চাকরি পায়না মামা থাকার না কারণে। বিনা চিকিৎসায় মারা যায় আনোয়ার হোসেন। জসিম চাকরীর পেছনে না ছুটে চটপটির দোকান দেয় এবং অন্য একটি বস্তিতে আশ্রয় নেয়। ঐ একই বস্তিতে থাকে শাবানা। শাবানা জসিমকে গুন্ডা মাস্তান মনে করে কিন্তু বিপদে বস্তিবাসির সাহায্য এগিয়ে এলে শাবানার সেই ভুল ভাঙ্গে। বস্তিবাসির কাছে জসিম হলো প্রিয় লালু ভাই।

এদিকে আহমেদ শরীফের লোকজন যখন বস্তি দখল করতে আসে তখন লালু রুখে দাঁড়ায়। এই রুখে দাঁড়ানোর ফলে আহমেদ শরীফের লোকেরা পুলিশ দিয়ে লালুকে গ্রেফতার করায় ‘লালু মাস্তান’ হিসেবে। জসিম তখন বস্তির সবার কাছে বলে ‘তোমরা বলো আমি মাস্তান নই’ কিন্তু কেউই ভয়ে জসিমের পক্ষে কথা বলেনা। জসিমকে জেল থেকে ছাড়িয়ে এনে আহমেদ শরীফ নিজের কাজে লাগায়। একসময় পুলিশ অফিসার প্রবির মিত্রের ছেলেকে অপহরণ করে খুন করতে চাওয়ায় জসিম বাঁধা দেয়। এরপর আহমেদ শরীফের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং জসিম প্রবীর মিত্রের ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যায়। পথিমধ্যে আহমেদ শরীফের লোকজন ধাওয়া করলে জসিমের সাথে সংঘর্ষ হয়, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে গেলে জসিমকে মৃত ভেবে গুন্ডারা পালিয়ে যায়। প্রবীর মিত্র তার ছেলেকে ফিরে পায়। চারিদিকে খবর রটানো হয় জসিম মারা গেছে। জসিমকে আইজি শওকত আকবর আশ্রয় দিয়ে পুলিশে চাকরি দেয়। জসিম ছদ্মবেশে আবার আহমেদ শরীফের দলে যোগ দেয়। …এভাবে একের পর এক ঘটনায় টানটান উত্তেজনায় এ জে মিন্টুর ‘লালু মাস্তান’ এগিয়ে যায় এবং সবশেষে মা আনোয়ারা ও জসিমের মিলনের মধ্য দিয়ে সিনেমাটি শেষ হয়। জমজমাট এই সিনেমাটির ‘শুন্য এ হাতে হাত রেখে’ গানটি আজও গুনগুন করে উঠি প্রায় সময় যা লিখেছিলেন মনিরুজ্জামান মনির, সুর করেছিলেন আলম খান আর গেয়েছিলেন এন্ড্রো কিশোর ও সাবিনা ইয়াসমিন।

- Advertisement -

এ জে মিন্টুর ‘লালু মাস্তান’ অন্য দশটি মাশালাদার সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক সিনেমার মতোই তবুও সিনেমাটি দর্শকদের কাছে লেগেছে ব্যতিক্রম কারণ সিনেমাটি যে নির্মাণ করেছিলেন মাস্টার মেকার এ জে মিন্টু। লিখার শুরুতেই বলেছিলাম এই সিনেমাটি নিয়ে একটি মজার তথ্য আছে সেটা হলো ১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলোর মাঝেছিলো ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘দায়ী কে’, ‘অপেক্ষা’, ‘সারেন্ডার’, ‘সন্ধি’, ‘হারানো সুর’, ‘সেতুবন্ধন’, ‘সহযাত্রী’ এর মতো দারুন দারুন সব চলচ্চিত্র অথচ সব পরিচালকদের অবাক করে দিয়ে মাস্টার মেকার এ জে মিন্টু ‘লালু মাস্তান’ সিনেমার জন্য সর্বপ্রথম পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার। আরেকটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, তা হলো ‘লালু মাস্তান’ এর কাহিনীকার ছিলেন আরেক চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক মোতালেব হোসেন যিনি কখনও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেননি কিন্তু ‘লালু মাস্তান’, ‘সত্য মিথ্যা’ এর মতো সফল ও জাতীয় পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্রের কাহিনীকার তিনি।

এ জে মিন্টুর ‘লালু মাস্তান’ সে বছর আর কোন শাখাতেই পুরস্কার লাভ করেনি অথচ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ আরও একাধিক শাখায় পুরস্কার পেয়েছিল অন্য চলচ্চিত্রগুলো। শুধুই শ্রেষ্ঠ পরিচালক হয়েছিলেন সাদামাটা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের এ জে মিন্টু যার চলচ্চিত্র নির্মাণের দক্ষতা অন্য সবার চেয়ে আলাদা। এরপর আরও ৩ তিনবার শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও ২ বার শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কারের পেয়ে মিন্টু প্রমাণ করেছিলেন আসলেই তিনি অন্য সবার চেয়ে আলাদা এবং সত্যিকারের একজন ‘মাস্টার মেকার’। এ জে মিন্টু শুধু মালেক আফসারি, সোহানুর রহমান সোহান, শাহ আলম কিরণ, মনোয়ার খোকনের মতো সফল পরিচালকদের গুরুই নন, রেডিও টেলিভিশনের সিনেমার বিজ্ঞাপনের সেরা কণ্ঠ নাজমুল হোসেনেরও গুরু ছিলেন। খোঁজ নিলে হয়তো জানা যাবে যে চলচ্চিত্রের সাথে সম্পৃক্ত এমন আরও অনেক মেধাবিদের গুরু ছিলেন মাস্টার মেকার এ জে মিন্টু যিনি একরাশ ক্ষোভ নিয়ে অভিমানে চলচ্চিত্র অঙ্গন ছেড়ে দিয়েছিলেন আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে।

আরো পড়ুনঃ
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ মতিন রহমানের ‘রাঙাভাবী’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ এজে মিন্টুর ‘সত্য মিথ্যা’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ