প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শফি বিক্রমপুরির ‘দেনমোহর’

শফি বিক্রমপুরির ‘দেনমোহর’

শফি বিক্রমপুরি আমাদের দেশের প্রবীণ প্রযোজক, পরিবেশক, পরিচালক ও প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের একজন। যিনি বাণিজ্যিক ছবির একজন সফল প্রযোজক পরিচালক হিসেবে পরিচিত বেশি। তাঁর প্রযোজনা সংস্থা ‘যমুনা ফিল্মস’ ছিল চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলোর একটি যেখান থেকে নির্মিত হয়েছিলো ‘বন্দুক’, ‘আলাদীন আলিবাবা সিন্দবাদ’, ‘রাজদুলারী’, ‘সবুজ সাথী’, ‘বাগদাদের চোর’, ‘লেডি স্মাগলার’, ‘লেডি কমান্ডো’, ‘লেডি ইন্সপেকটার’, ‘আজকের হাঙ্গামা’ এরমত একাধিক সফল সিনেমা। তারকাবহুল ও বিগ বাজেটের সিনেমা নির্মানে এই পরিচালকের পূর্বের ছবিগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করেছিলাম শফি বিক্রমপুরির ‘দেনমোহর’ ছবিটা বোধ হয় ‘দেনমোহর’ নামক রীতিনীতির বিরুদ্ধে মৌসুমীর কোন প্রতিবাদী লেডি অ্যাকশন ধরনের ছবি হবে।

- Advertisement -

১৯৯৫ সালের রোজার ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মধ্য অন্যতম ছবি ছিল শফি বিক্রমপুরির ‘দেনমোহর’ ছবিটি। যে ছবিতে তৃতীয়বার পর্দায় আগমন ঘটে জনপ্রিয় সালমান-মৌসুমী জুটির। ঈদের তৃতীয় দিন ছবিটি সিলেটের ‘মনিকা’ সিনেমা হলে দেখতে বন্ধুরা সহ ভিড় জমাই। যথারীতি চির পরিচিত দৃশ্য। সালমান-মৌসুমীর ছবি দেখতে সব শ্রেণীর দর্শকদের ভিড়। যাই হোক ছবি শুরু হওয়ার সাথে সাথে জেনে গেলাম এটি একটি বিদেশী ছায়াছবির নকল কিন্তু সেটা কোন দেশের ও কোন ছবির তা পরিচালক উল্লেখ করেননি। ছবি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম এটি বলিউড এর সালমান খান অভিনীত ৯০র শুরুর একটি ব্যবসাসফল হিন্দি ছবির নকল। বুঝে গেলাম যা ভেবে ঢুকেছিলাম সেটা নয়।

শফি বিক্রমপুরির ‘দেনমোহর’ ছবিটি শুরু হয় মনোয়ার নামক জমিদার পুত্র সালমান কে দিয়ে, যাকে দেখার সাথেই সাথেই দর্শকের হাততালি শোনা গেছে। সিনেমার শুরুতে দেখা যায় তরুন সালমান তাঁর চাচা ড্যানী সিডাক কে সাথে নিয়ে ‘বাহাদুর’ নামক এক তেজী ঘোড়াকে পোষ মানাতে ব্যস্ত। যথারীতি স্মার্ট সালমান এর চেষ্টা অনেক কষ্টে সফল এবং ঘোড়া সালমান কে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্য ছুটতে থাকে। এর সাথেই সাথেই নায়িকা মৌসুমী’র পর্দায় আগমন যেখানে সিলেটের জাফলং এলাকায় তিনি সখীদের সাথে নাচ ও গানে ব্যস্ত। বুঝে গেলাম যে পাগলা ঘোড়া সালমান কে নিয়ে ছুটতে ছুটতে জাফলং এসে গেছে। আমার লিখা পড়ে অনেকে ভাবতে পারেন আমি রিভিউ লিখতে বসেছি আসলে তা নয়। আমি শুধু পর্দায় কিভাবে সালমান কে উপস্থাপন করেছিল শুরুতেই প্রবীণ পরিচালক শফি বিক্রমপুরি সেটাই একটু তুলে ধরলাম। যার উদ্দেশ্য ছিল যে দর্শকদের কাছে সালমান কে পরিচালকরা সবসময় একটু অন্যভাবে স্মার্টলি তুলে ধরতেন যেটা অন্য সব নায়কদের ক্ষেত্রে খুব কম ঘটতো। সাধারনত পর্দায় নায়কদের চিরচেনা আগমন দৃশ্য ছিল নায়িকার চিৎকারে আকাশ থেকে উড়ে এসে পর্দায় প্রথম হাজির হতো নায়ক, অথবা কোন বস্তিতে চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসীদের আক্রমন আর সেখানে অসহায় বস্তিবাসীর দোয়া ‘হ্যাঁ আল্লাহ আমাদের এই জালিমদের হাত থেকে বাঁচাও’ কবুল করতেই আকাশ থেকে উড়ে এসে নায়ক বস্তিবাসিকে রক্ষা করে নিজের আগমনী বার্তা দর্শকদের জানাতো। সেখানে সব পরিচালকরাই সালমান কে এসব চিরচেনা দৃশ্য দিয়ে পর্দায় দর্শকদের সামনে পরিচয় করিয়ে দিতেন না। সেখানে সালমান একটু ভিন্ন। হতে পারে তাঁর ছবিগুলো হয়তো অ্যাকশনধর্মী ছিল না বলেই এইভাবে পরিচালকরা সালমান কে পর্দায় আনতেন অথবা হতে পারে সালমান এর স্মার্ট ক্রেজকে কাজে লাগিয়ে একটু ভিন্ন ভাবে পর্দায় আনতেন।

- Advertisement -

শফি বিক্রমপুরীর আগের ছবিগুলো থেকে এই ছবিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগে যেখানে শফির ছবিগুলো ছিল অ্যাকশনে ঠাসা সেখানে ‘দেনমোহর’ পুরোই বিপরীত। দুই জমিদার পুত্র কন্যার প্রেম ভালোবাসা, বিয়ে ও বিয়ের কাবীন নিয়ে দুই জমিদারের জেদ ও অহংকারের লড়াইয়ে সম্পর্কে ফাটল/বিরহ এবং পরিশেষে ভুলবুঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে দুই পরিবারের মিলন এই হলো শফি বিক্রমপুরির ‘দেনমোহর’ ছবির কাহিনী সংক্ষেপ। আসলে ছবিটি ব্যবসা সফল হওয়ার পেছনে দুটি কারন – ১) সালমান-মৌসুমি জুটির প্রেম ও রাজীব-আহমেদ শরীফের শত্রুতা; আর  ২) খ্যাতিমান সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলীর সুরে গানগুলো। এই দুটি জিনিসকে পুজি করেই ছবিটি ঈদে মুক্তি পাওয়ায় সুপারহিট তকমা লাগিয়ে নেয়। উল্লেখ্য যে সালমান-মৌসুমির প্রথম ছবি যেটি ৯৩ এর রোজার ঈদে মুক্তি পেয়েছিল এবং যেখানে রাজীব-আহমেদ শরীফ এর শত্রুতার প্রতিশোধের জেদ ছিল ঠিক ২ বছর পর একই সময়ে একই মুক্তি পাওয়া ও মুল চরিত্র গুলো একই ধরনের হওয়াতে দর্শক ভেবেছিল হয়তো ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মতোই কোন বিয়োগাত্মক প্রেম কাহিনী নির্ভর ছবি ‘দেনমোহর’। এখানে গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে পরিচালকের কৌশলের প্রশংসা করতেই হয়। ছবির কাহিনীর ধরন, পাত্রপাত্রী নির্বাচন, মৌলিক গান, মুক্তির সময় ও বিজ্ঞাপনের ধরন – সব মিলিয়ে পরিচালক একটি কৌশল অবলম্বন করেছেন। বাংলাদেশ বেতারে ছবির নিয়মিত ১০ মিনিটের বিজ্ঞাপনে পরিচালক বারবার সালমান-মৌসুমি’র প্রেম ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব কে উপস্থাপন এবং কাহিনীর সমাপ্তি সম্পর্কে দর্শকদের অন্ধকারে রাখার চেষ্টা পুরোটাই সফল।

এখানে সালমান জমিদারের পুত্র হিসেবে বেশ ভালো অভিনয় করেছেন যিনি জিদি, রাগী ও অহংকারী পিতার সন্তান হিসেবে পুরোটাই সফল। যে একদিকে পিতার দুটি গুন জিদ ও রাগ পেলেও অহংকারী স্বভাবটা পায়নি। সব কিছুতেই সফল হওয়ার জিদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাথে সাথে গর্জে উঠা এবং মানুষকে সমানভাবে বিচার করে নিরহংকার ভাবে মেশা ব্যক্তিত্বসম্পূর্ণ এক বলিষ্ঠ যুবক। যার কারনে দর্শক ছবিটি পুরো শেষ করেই হল থেকে বেরিয়েছিল। ছবিটির গানগুলো ছিল সেই সময়ে খুবই জনপ্রিয় গান। বিশেষ করে খালিদ হাসান মিলু ও সাবিনা ইয়াসমিন এর কণ্ঠের ‘শুধু একবার শুধু একবার বলো ভালোবাসি’ গানটি ছিল চরম। এছাড়া মৌসুমি ও তাঁর সখিদের নিয়ে প্রথম গান, মৌসুমিকে দেখার পর প্রেম নিবেদনের গানটি ছিল অন্যতম।

ছবিটি ছিল ‘যমুনা ফিল্মস’ এর প্রযোজনায় ও ‘বন্ধন বানীচিত্র’র পরিবেশনায় নির্মিত। শফি বিক্রমপুরির ‘দেনমোহর’ ছবির মাধ্যমে পরপর একটানা তিনটি সুপারহিট ছবি উপহার দিলো ‘সালমান-মৌসুমি’ জুটি যা চলচ্চিত্রে তাঁদের আসন কে আরও সুসংগঠিত করে। ছবিতে সামান্য কিছু অসংগতি ও ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও পরিচালক শফি বিক্রমপুরী বেশ ভালভাবেই সফল ও সার্থক হয়েছেন এই কথা বিনা বাক্য মেনে নেয়া যায়। এই ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি কারণে চিরকাল লিপিবদ্ধ থাকবে তা হলো এই ছবিটি হলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল জুটি সালমান-মৌসুমির মুক্তিপ্রাপ্ত শেষ ছবি। এরপর সালমান-মৌসুমি জুটির আর কোন ছবি আমরা পাইনি।

আরো পড়ুনঃ
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘শত্রু ভয়ংকর’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ