প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ঘাতক’

শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ঘাতক’

১৯৯৪ সালের জুন মাসের ৩য়্ সপ্তাহ থেকেই রেডিওতে ১০ মিনিটের ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রটির প্রচারণামুলক অনুষ্ঠান শুরু হলো । অনুষ্ঠানটির শুরুতেই শোনানো হতো ‘যদি মানুষের মতো / মানুষ হতে চাও / ভালোবাসো মানুষকে / আর ভালোবাসো, এই দেশ এই মাটিকে’ গানটি, যা ছিল  শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ঘাতক’ ছবির থিম সং। ১০ মিনিটের বিজ্ঞাপন শুনেই ছবিটি দেখার দারুন আগ্রহ জমে গেলো আমার ও আমার বন্ধুদের। জুলাই মাসের ১ সপ্তাহ থেকেই বিটিভিতে দেখানো শুরু হলো ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রটির দারুন দারুন একাধিক ট্রেলার। ট্রেলার দেখে কি বলবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ফরিদীর গেটআপ, মেকাপ পুরো গোলাম আজমের মতো। খলিলের গেটাপ, মেকাপ শেখ মুজিবুর রহমানের মতো, আলমগীর পুরো টগবগে এক তরুণ মাস্তান আর দুর্দান্ত রুবেলের দৌড়ে এসে ফরিদীকে লাথি মারার দৃশ্য, শাবানার জেদি সংলাপ বলার ধরন সবকিছু আজো চোখে ভাসে, ভাসবে সারাজীবন।

- Advertisement -

আমরা দিন গুনতে থাকি ২২ শে জুলাইয়ের। অবশেষে ২২ শে জুলাই এলো, বহু কাঙ্ক্ষিত ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেলো আর মুক্তির প্রথম দিনেই সিলেটের মনিকা সিনেমা হলে প্রদর্শন হতে লাগলো। ঘরের কাছেই (রিক্সা ভাড়া ১০ টাকা) মনিকা সিনেমা হল। কিন্তু প্রথম দিন যেতে পারিনি আমরা কেউই পাড়ার মাঠে ফুটবল টুর্নামেন্টে আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ থাকার কারণে। মন খারাপ করে গোল পোস্টের নীচে গোলকিপার হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু সারাক্ষণেই মাথায় ঘুরছে শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ঘাতক’ ছবির ট্রেলারের দৃশ্যগুলো, আলমগীরের লিপে গানটি গুনগুন করছি। এরই মধ্য খেলার ১০ মিনিটের মাথায় খুব বাজেভাবে ২ গোল খেয়ে বসলাম!!!! আমার মুখ কালো হয়ে গেলো, এরমধ্য আমার বন্ধু শাহিন এসে শাসিয়ে গেলো ‘ আজকে হারলে কাল তোরে ছাড়াই সবাই ঘাতক দেখতে যামু’ বলে। বন্ধুর এই শাসানোটা দারুন টনিক হিসেবে কাজ করলো, আমার মধ্যে যেন হুশ ফিরে এলো এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাইবেকারে দলকে ৪ – ৩ গোলে জয়ী করে উল্লাস করতে করতে মাঠ ছাড়লাম। খেলা শেষে সবার একটিই পরিকল্পনা কাল বিকাল ৩ টায় কিভাবে মনিকায় যাবো ঘাতক সিনেমাটি দেখতে তা নিয়ে।

পরেরদিন শনিবার সকাল ১১টায় আরেক বন্ধুকে পটিয়ে সিলেট অডিটোরিয়ামে নিয়ে গেলাম ‘একাত্তরের যীশু’ চলচ্চিত্রটি দেখতে কিন্তু ৩০ মিনিটের মাথায় বের হয়ে এলাম বন্ধুর পিড়াপীড়িতে। ঘণ্টা দুয়েক বিভিন্ন শপিংমলে ঘুরাঘুরি করে আর দুপুরে হোটেলে চিকেন বিরিয়ানি খেয়ে দুই বন্ধু রওনা দিলাম পূর্ব নির্ধারিত মনিকা সিনেমা হলের দিকে যেখানে গেলে বাকিদের সবাই পাবো। মনিকা সিনেমা হলের প্রধান রাস্তা জুড়ে দর্শকদের দীর্ঘ লাইন এবং এরই মাঝে পুলিশি তল্লাশি চলছে। কারণ ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনে বাঁধা দেয়ার হুমকি দিয়েছিল তৎকালীন বিরোধী দলের জোটে থাকা জামায়াতে ইসলামী দলটি। টিকেট নিয়ে কালোবাজারি ও দর্শকদের মধ্য হাতাহাতি, পুলিশি তল্লাশি সব মিলিয়ে হলের বাহিরেই একটি রুদ্ধশ্বাস ও টানটান উত্তেজনার মুহূর্তগুলো পার করে আমরা সিনেমা হলের ভেতরে প্রবেশ করলাম খুব সুশৃঙ্খল ভাবে। সিনেমা হলের ভেতরেও সিট নিয়ে উপচে পড়া দর্শকদের সিট না পেয়ে চিৎকার, হাতাহাতি এবং পুলিশের প্যাদানি আবারো সিনেমা শুরুর পূর্বে টানটান উত্তেজনা তৈরি করলো। …অবশেষে সিনেমা হলের ভেতরে সব টানটান উত্তেজনা শেষ হয়ে গেলো হলের বাতি নিভে গিয়ে পর্দার আলোর ঝলকানিতে। কয়েক সেকেন্ড আগেও যেখানে চিৎকার, হট্টগোল চলছিল, সেখানে পিন পতন নীরবতা।

- Advertisement -

শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ঘাতক’ ছবির কাহিনী শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে খলিল ও তাঁর বন্ধুর দুই পরিবারের মধ্যে এক আনন্দঘন পরিবেশে তাঁদের দুই শিশু সন্তানের (আলমগীর ও শাবানা) বিয়ের মধ্য দিয়ে। এরপর দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। আলমগীরের বাবা ও শাবানার বাবা খলিল যুদ্ধে যায়। এইদিকে খলিলের পালিত ভাই ফরিদী রাজাকারের খাতায় নাম লিখায়। ফরিদী আলমগীরের বাবাকে খুন করে এবং আলমগীরদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। আলমগীরের মা রোজী আফসারি কিশোর আলমগীর ও শিশু সোনিয়াকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। যুদ্ধ শেষ হলে খলিল গ্রামে ফিরে আসে এবং ফরিদীর কৃতকর্মের জন্য জুতার মালা পরিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। এর মধ্যে ২২ বছর কেটে যায়। খলিলের মেয়ে শাবানা আজো তাঁর স্বামী আলমগীরের অপেক্ষায় থাকে। ফরিদী একদিন গ্রামে ফিরে আসে এবং নিজেকে অধ্যাপক হিসেবে পরিচয় দেয়। আগের সব ঘটনার জন্য ফরিদী ক্ষমা চায় এবং গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলে গোপনে নিজের দলের কর্মকাণ্ড চালায় প্রতিশোধ নিতে।

এদিকে আলমগীর ঢাকা শহরের নাম করা মাস্তান। রুবেলের বাবা একজন অধ্যাপক খলিল ও আলমগীরের বাবার বন্ধু যে কিনা ফরিদীকে চিনতে পারে। ফরিদী রুবেলের বাবাকে খুন করে। মারা যাওয়ার আগে রুবেলের বাবা ফরিদীর গলার এক টুকরো চামড়া নখের আঁচড়ে তুলে আনে। রুবেল সেই চামড়ার টুকরোটি সংরক্ষণ করে এবং কারো কোন কাটা দাগ দেখলেই তা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে। খলিল শাবানার চিন্তায় অস্থির এবং অসুস্থ হয়ে পরে। অসুস্থ বাবাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে শাবানা স্বামীর অভিনয় করার জন্য আলমগীরকে ভাড়া করে। আলমগীর খলিলকে দেখে চিনতে পারে কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর ফরিদীর সাজানো ঘটনাকে সত্য মনে করে খলিলের অপমানের প্রতিশোধ নিতে সবকিছু গোপন করে। আসলে আলমগীর জানেই না যে সেদিন খলিল তাঁদের ফিরিয়ে দেয়নি, ফিরিয়ে দিয়েছিল ফরিদী। ধীরে ধীরে ফরিদীর আসল চেহারা প্রকাশ পেতে থাকে। ফরিদী এখনও যে দেশবিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ড করছে তা প্রকাশ পেতে থাকে। আলমগীর-শাবানা একে অপরকে চিনতে পারে। …অবশেষে ‘ঘাতক’ ফরিদীর শাস্তি ও সবার মিলনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দারুন জমজমাট ’ঘাতক’ চলচ্চিত্রটি । এরপর আরও দুদিন দেখেছিলাম আমরা সবাই দলে দলে মনিকা সিনেমা হলে গিয়ে।

এই চলচ্চিত্রে ‘ঘাতক’ রুপে ফরিদীকে দেখানো হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামাত ইসলামী দলের একজন নেতার রুপক চরিত্রে যেখানে ফরিদী অসাধারন অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে তাঁর বিড়বিড় করে বলা উর্দু সংলাপ বলার ধরন ছিল চমৎকার। যে আলমগীরকে ৯১ সালে এ জে মিন্টুর ‘পিতা মাতা সন্তান’ ছবিতে দেখেছিলাম রাইসুল ইসলাম আসাদ ও ইমরানের বৃদ্ধ বাবা চরিত্রে সেই আলমগীরকে তিন বছর পরে ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রে দেখি টগবগে এক মাস্তান যুবকের চরিত্রে। ৫০ ঊর্ধ্ব আলমগীর সেই বয়সেই এতো দারুনভাবে চরিত্রের সাথে মিশে গিয়েছিলেন যে কেউই বলবে না আলমগীরের বয়স ৫০ বছর। আলমগীরের গেটাপটাও ছিল চমৎকার। মাথায় ফিতা বাঁধা, জিন্স, টিশার্ট আর একটি জ্যাকেট পরা। আলমগীর ও রুবেলের একটি ফাইটিং দৃশ্য ছিল যা সিনেমার অন্যতম একটি সেরা দৃশ্য। রুবেল রুবেলের মতোই পুরো ছবিতে দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন। শাবানার কথা এক কথাতেই বলে শেষ করা যাবে না। শাবানা কত উঁচু মাপের অভিনেত্রী সেটা তিনি তাঁর চরিত্রে অভিনয় করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।

অধ্যাপক শাহেদুর রহমানের লিখা অসাধারন গল্পে দেশপ্রেম, ঘৃণা, প্রেম ও প্রতিশোধের দারুন সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। মিল্টন খন্দকারের লিখা ও আলম খানের সুর করা গানগুলো ছিল দারুন মেলোডিয়াস। বিশেষ করে আলমগিরের লিপে ‘যদি মানুষের মতো মানুষ হতে চাও’ গানটিতে পরিচালক বাংলাদেশের রাজনীতির সকল নেতাকে তুলে ধরেছিলেন যেখানে ছিল হোসেন সোহরাওয়ার্দি, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তম যা আজকের কোন চলচ্চিত্রে দেখানো অসম্ভব। মেধাবী পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন একটি গানের একটি দৃশ্য দিয়ে সকল জাতীয় নেতাকে তুলে ধরে বুঝিয়েছিলেন এরা সবাই সম্মানের যোগ্য, কাউকে বাদ দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের কথা ভাবা যায় না যা আজকের বিভাজনের রাজনীতিতে সম্ভব নয়। দেশকে সত্যিকারের ভালোবাসতে হলে যার যার সম্মান তাঁকে দিয়ে আমাদের একতাবদ্ধ হতে হবে। সর্বোপরি একটি চলচ্চিত্রের প্রতিটি পরতে পরতে মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, মৌলবাদী রাজনীতিবিদদের চরিত্র, যুব সমাজের সচেতনতা কত অসাধারনভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় সেটা ‘মডার্ন ডিরেক্টর’ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রটি তারই প্রমাণ। আজ এতো বছর পরে যখন টুকরো টুকরো বিজ্ঞাপনের কাটিংগুলো দেখি তখন চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে এই ভেবে যে আর কখনও এমন গল্পের চলচ্চিত্র সিনেমা হলে দেখা হবে না!!!

আরো পড়ুনঃ
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘শত্রু ভয়ংকর’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ