প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ দিলিপ বিশ্বাসের ’অজান্তে’

দিলিপ বিশ্বাসের ’অজান্তে’

তখন বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে সালমান শাহ, ওমর সানীর মতো নবীন নায়কদের জমজমাট যুগ। সাথে সিনিয়র নায়ক কাঞ্চন, মান্না, রুবেলরাও দুর্দান্ত ফর্মে। সেই সময়ে প্রবীণ পরিচালক দিলিপ বিশ্বাসের ’অজান্তে’ নামে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায় যেখানে প্রবীণ আলমগীর, শাবানা ও সোহেল রানার সাথে একেবারে নতুন রিয়াজ ও সিনিয়র ইমরান অভিনয় করছেন। সিলেটের নন্দিতা সিনেমা হলে মুক্তির প্রথম দিনেই ছবিটি প্রদর্শিত হচ্ছিল। আমাদের মাঝে এতো তাড়া নেই ছবিটি দেখার। কারণ অন্য হলগুলোতে সালমান, মান্না, রুবেলদের ছবি প্রদর্শিত হচ্ছিল। ৩/৪ দিন পর বিকেল তিনটার শো দেখতে গেলাম কয়েক বন্ধু মিলে।

- Advertisement -

যথারীতি ছবি শুরু হলো। দিলিপ বিশ্বাসের ’অজান্তে’ সিনেমার গল্পের শুরুতে দেখা যায়, মীর্জা সাহেব (আলমগীর) যিনি বিরাট শিল্পপতি। স্ত্রী শাবানাকে নিয়ে নিজেদের বাগান বাড়ীতে বেড়াতে গেলেন। বেড়াতে গিয়েই খবর পেলেন তার ফ্যাক্টরির এক শ্রমিকের (সোহেল রানা) স্ত্রী একটি ছেলে সন্তান প্রসবের সময় মারা গিয়েছেন। আলমগীর খবর পেয়েই সোহেল রানা’র বাড়ীতে যাবেন শুনে স্ত্রী শাবানাও সাথে যেতে চাইলো। সোহেল রানা বাড়ীতে বেদনামুখর পরিবেশে দুজনেই হাজির হলেন। সোহেল রানা সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটির কান্না শুনে শাবানা শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন, সোহেল রানা স্ত্রীর শোকে অভিমানে সন্তানের মুখটি পর্যন্ত দেখছেন না। সোহেল রানার চোখে ভাসছে স্ত্রী সুচরিতার ছবি। হলের সিটে ভালো করে বসতে না বসতেই পর্দায় এলো গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লিখা, সত্য সাহার সুরের কবিতা কৃষ্ণমূর্তির কণ্ঠে ’ভালোবাসা জীবন থেকে অনেক বড়’ শিরোনামের দারুন সুন্দর একটি রোমান্টিক গান। যাই হোক একসময় শিশুটির প্রতি শাবানার ভালোবাসা, স্নেহ দেখে প্রিয়তমা স্ত্রীর শোকে বিহবল সোহেল রানা নিঃসন্তান আলমগীর-শাবানার হাতে নিজের সন্তানটিকে নিঃশর্তে তুলে দেন। সোহেল রানা স্ত্রী শোকে ছন্নছাড়া, মাতাল জীবন শুরু করলো। একদিন ১ম পুরস্কার পাওয়া লটারির টিকেটটি মাস্তানরা কেড়ে নিতে চাইলে সোহেল রানার আঘাতে এক মাস্তান খুন হয়। খুনের দায়ে সোহেল রানা জেলে চলে যায় এবং যাওয়ার আগে লটারির টিকেটটা অমল বোসের হাতে দিয়ে যায়।

এদিকে শাবানা একদিন গর্ভধারন করে একটি ছেলে সন্তান জন্ম দেন। নিজের সন্তানের মতোই সোহেল রানার সন্তানটিকে আগলে রাখেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন যখন শাবানা নিঃসন্তান থাকাবস্থায় আলমগীরের স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি সোহেল রানার সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সবকিছুর দলিল করে আলমগীর রেখেছিল সেই দলিল এখন কি করবে তা নিয়ে? আলমগীরের চাচাতো ভাই এটিএম শামসুজ্জামান শাবানাকে ভুল বুঝাতে সক্ষম হোন যে আলমগীর এখন সুযোগ পেলে সোহেল রানার সন্তানটিকে মেরে ফেলতে পারে এই বলে। শাবানা এটিএম শামসুজ্জামানের ফাঁদে পড়ে ভুল বুঝে সোহেল রানার সন্তানটিকে অন্য কোন নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে আসতে ঘর থেকে বের হলে এটিএম শামসুজ্জামানের ভাড়া করা লোকেরা শাবানার রিক্সাকে ধাক্কা দিলে শাবানা রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে এবং পথচারী আরিফুল হকের সহায়তায় হাসপাতালে ভর্তি হয়। শাবানা প্রানে বেঁচে গেলেও মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাওয়ায় বাকশক্তি ও চলাফেরার শক্তি হারিয়ে প্যারালাইজড হয়ে যায়। বৃদ্ধ আরিফুল হক শাবানা ও শিশু সন্তানটিকে নিজের মেয়ে ও নাতি পরিচয়ে নিজের ঘরে ঠাই দেয়। পঙ্গু ও বোবা শাবানার কাছে বড় হয় ইমরান (সোহেল রানার সন্তান), অন্যদিকে রিয়াজ মা ছাড়াই আলমগিরের কাছে বড় হয়। শুরু হয় গল্পের আরেক অংশ। ……এভাবে একটি জমজমাট গল্পের দিলিপ বিশ্বাসের ’অজান্তে’ সিনেমাটি দেখে তৃপ্তি ও বিস্ময় নিয়ে সেদিন আমরা ‘মাগো তুমি একবার খোকা বলে ডাকো’ গানটি গাইতে গাইতে সবাই ঘরে ফিরেছিলাম।

- Advertisement -

ফিরে এসে যে বন্ধুরা ছবিটি তখনও দেখিনি তাদের ছবিটি দেখতে বললাম। দেখে এসে সবার মুখেই প্রসংসা আর প্রসংসা যে সময়ের এতোসব জনপ্রিয় তারকাবিহিন একটি ছবি কিভাবে মাত্র ৩জন প্রবীণ অভিনেতা অভিনেত্রীকে কেন্দ্র করে তৈরি হলো তা ভেবে। একটিবারের জন্য ছবিটি দেখতে বোর লাগেনি বরং পুরোটা সময় আলমগীর, শাবানা ও সোহেল রানার অভিনয় মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম। শাবানা প্যারালাইজড রোগী হিসেবে যে অভিনয়টা করেন তা এক কথায় দুর্দান্ত সুন্দর। সংলাপ বিহীন শাবানাও যে কত শক্তিশালী তা ছবিটি না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।

দিলিপ বিশ্বাসের ’অজান্তে’ সিনেমায় আলমগীর ও সোহেল রানা দুজন দুজনের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের সেরা অভিনয়টা দেখিয়েছেন। ‘অজান্তে’ ছবিতে অসাধারন অভিনয়ের জন্য সোহেল রানা সেই বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সেরা অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। ইমরান ও রিয়াজ যার যার চরিত্রে খুব ভালো অভিনয় করেছিলেন। ছবিটির মূল শক্তি ছিল গল্প ও চিত্রনাট্য যার কারণে সময়ের জনপ্রিয় তারকাবিহীন হওয়া সত্ত্বেও ছবিটি দেখতে সেদিন আমরা সালমান, সানি, মান্না, রুবেলের ভক্তরা ভিড় করেছিলাম। অথচ আজকের দিনে এমন একটি ভালো গল্পের ছবিটিকে কোন তারকার অন্ধ ভক্তরা দেখে অন্যকে দেখতে উৎসাহিত করবে তা ভাবা যায় না। ছবির গল্পের সাথে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লিখা ও সত্য সাহার সুর করা গানগুলো দারুন বিশেষ করে উপরে উল্লেখিত দুটো গান ছিল তখন সুপারহিট গান।

বাংলা বাণিজ্যিক ছবির স্বর্ণালি যুগের শেষ সময়ে ‘অজান্তে’ নামের দারুন একটি ছবি উপহার দেয়ার জন্য প্রয়াত দিলিপ বিশ্বাসকে জানাই অনেক অনেক শ্রদ্ধা, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আজ চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে দিলিপ বিশ্বাসের মতো গুনি মানুষেরা নেই আছে সব ধোঁকাবাজ যারা দর্শকদের জন্য ছবি নির্মাণ কিভাবে করতে হয় তা জানে না।

আরো পড়ুনঃ
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ দেওয়ান নজরুলের ‘মাস্তান রাজা’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ