নায়িকা পরীমনি বনাম ব্যক্তি পরীমনি বনাম বিতর্কিত পরীমনি

নায়িকা পরীমনি

এই কথা অনস্বীকার্য যে, উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে নায়িকাদের প্রধান কাজ হচ্ছে নায়কদের সাথে রোমান্স ও নাচগান করা। তারপরও সিনেমাতে নায়িকাদের ভূমিকাকে ছোট করে দেখার কোন উপায় নেই। কারণ কবরী, শাবানা, ববিতা, শাবনূর, মৌসুমী প্রভৃতি নামগুলো প্রমাণ করেছে সিনেমাতে নায়িকাদের অবদান নায়কদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। একটা সময় ছিল যখন সাধারণ দর্শকরা নায়িকাদের রূপ ও গুণের প্রেমে পড়ে নিজেদেরকে নায়কের জায়গায় কল্পনা করতে ভালোবাসতেন। নায়িকা হাসলে মজা পেতেন, নায়িকার বিরহে কষ্ট পেতেন। ভিলেন নায়িকাকে ধর্ষণ করতে চেষ্টা করলে, দর্শকদের মন উতলা হয়ে যেত কখন নায়ক এসে তাকে বাঁচাবে। নায়িকা ধর্ষিতা বা খুন হবে, এমন কিছু দর্শকদের মন মেনে নিতে চাইতো না। নায়িকাদের স্থান এমনই ভালোবাসা ও সম্মানের জায়গায় ছিল।

- Advertisement -

এরপর আমাদের চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার ভয়াবহ থাবা পড়লো। নায়িকাদের অভিনয়ের চেয়ে তাদের শরীর প্রদর্শন সিনেমার ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে গেলো। সম্মানের জায়গাটা দখল করে নিলো বিকৃত লালসা। অশ্লীল সিনেমার যুগ চলে গেলেও এর রেশ বা সুদূরপ্রসারী ক্ষতি এখনো রয়ে গেছে। যাহোক বর্তমানে নায়িকাদের ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই সবচেয়ে বেশি যার কথা আসছে তার নাম পরীমনি। জীবনে পরীমনি অভিনীত একটি সিনেমা দেখা তো দূরে থাক, ভুলেও বাংলাদেশের সিনেমার খবর রাখেন না এমন অনেকেই এখন পরীমনি সম্পর্কে “অগাধ জ্ঞান” রাখেন। আজকের লেখায় একজন সিনেমাপ্রেমী দর্শক ও তার ফেসবুক ফ্রেন্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে নায়িকা পরীমনি ও ব্যক্তি পরীমনিকে নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে করলাম।

নায়িকা হিসেবে পরীমনিঃ
যতটুকু জানি পরীমনির ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল মডেলিং ও টিভি নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে। কিন্তু শুধু সিনেমা নিয়ে থাকি বলে তার নাটকের ক্যারিয়ার সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। সম্ভবত ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ সিনেমার মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। যেহেতু পূর্বেই অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল, তাই নতুন এই লাস্যময়ী নায়িকাকে অন্য সাধারণ দর্শকদের মতো আমিও সাদরে গ্রহণ করলাম। কিন্তু আমাদের নির্মাতারা মনে হয় তাকে একটু বেশিই গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। কথিত আছে তাকে সাথে সাথে ২৩টি নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ করা হয়। আর এই ব্যাপারটিই তার ক্যারিয়ার আর ব্যক্তি জীবনে তোলপাড় শুরু হওয়ার প্রাথমিক ঘটনা। বলিউড সুপারস্টার ঋষি কাপুরের ববি সিনেমা হিট হওয়ার পর তাকে নিজেদের ছবিতে কাস্ট করার জন্য বড় বড় নির্মাতারা তার বাড়িতে লাইন দিতে থাকে। ঋষি কাপুর নিজে স্বীকার করেছেন, অল্প বয়সে স্বল্প সময়ে এতো গুরুত্ব ও পরিচিতি পাওয়ায় তার মধ্যে এতো অহংকারবোধ জন্ম নেয় যে, তিনি কাউকে কিছু মনেই করতেন না। পরীমনির ক্ষেত্রে এমনটা ঘটা অসম্ভব কিছু না। তাছাড়া কাজের কোয়ানটিটি (পরিমাণ) ও চাপ বেড়ে গেলে যে কোয়ালিটি (মানের) উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সেটা আর নতুন কিছু না। তাই তো পরীমনির সাইন করা বেশিরভাগ সিনেমাতেই তাকে সুন্দরী নায়িকা হিসেবে দেখা গেল, গুণী অভিনেত্রী হিসেবে নয়। তার মানে এই না যে পরীমনি অভিনয়ে কাঁচা। আসলে সুনির্মাতারাই শুধু পেরেছেন নায়িকা পরীমনির ভেতর থেকে শিল্পী পরীমনিকে বের করে আনতে। স্বপ্নজ্বাল, মহুয়া সুন্দরী, আরো ভালোবাসবো তোমায়, বিশ্বসুন্দরী প্রভৃতি সিনেমা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

- Advertisement -

ফেসবুক ফ্রেন্ড হিসেবে পরীমনিঃ
সিনেমা নিয়ে থাকতাম বলে ঢালিউডের অনেক সেলেব্রিটির ফ্রেন্ডলিস্টে থাকবো সেটাই স্বাভাবিক। সেই তালিকায় পরীমনিও ছিল। প্রথম দিকে পরীমনির ফেসবুক পোস্টগুলো স্বাভাবিকই ছিল। সিনেমা, শুটিং, সেলফি ইত্যাদি বিষয়ক। তবে হঠাৎ করে তার ভেতরের রূপ যেন বাইরে চলে আসলো। এর আগে বাংলাদেশের কোন প্রথম সারির নায়িকা এরকম ভাষা ব্যবহার করে ফেসবুকে পোস্ট বা কমেন্ট করেছে কিনা আমার জানা নেই। অনেকে এটাকে তার বাকস্বাধীনতা (!) হিসেবে গ্রহণ করলো, অনেকে উচ্ছৃঙ্খলতা হিসেবে। যাহোক এর মধ্যে সে এমন অনেক ছবিও পোস্ট করলো যেগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাহসী না বলে দুঃসাহসী বললেও কম বলা হবে। এসকল ছবি থেকেই অনেকে তার বেপরোয়া জীবন বা লাগামহীন লাইফস্টাইলের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন, যদিও সেটা তার সম্পূর্ন ব্যক্তিগত ব্যাপার। এদিকে তার আগের বিয়ে, জীবনযাপন প্রভৃতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে রসালো ট্রোল হতে থাকে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ সেলিব্রিটিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষদের আগ্রহ সবসময়ই বেশি থাকে। কিন্তু পরীমনি তার প্রেম, বিয়ে ইত্যাদি ব্যক্তিগত বিষয় (যেগুলো চাইলে দর্শকদের কাছে গোপণ রাখতে পারতেন) সেগুলো ঢোল পেটানোর মতো ফেসবুকে শেয়ার করতে লাগলেন। এমনিতেই মিডিয়ার লোকজনদের নিয়ে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সবাই ভালো করেই জানেন। তার মধ্যে পরীমনির অতিসাহসী কর্মকান্ড আগুনে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো। হয়তো পরীমনি সরল মনে বোকার মতো সেগুলো করতেন, অথবা হয়তো সেগুলো ছিল তার সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া ও নেতিবাচক হলেও আলোচনায় থাকার কৌশল।

বিতর্কিত পরীমনি ও বিভক্ত সমাজঃ
পরীমনির বোট ক্লাব কান্ড থেকে শুরু করে মামলা, রিমান্ড, জামিন এসকল ব্যাপারে সবাই কমবেশি জানেন। তাই সেগুলো নিয়ে লেবু চিপানো বাদ দিলাম। বরং এসকল ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরীমনি ও তাকে কেন্দ্র করে বিভক্ত সাধারণ মানুষদের নিয়ে আমার অবজারভেশন শেয়ার করছি। রাত বারোটায় “নির্যাতিত” হয়ে পরীমনি যখন মামলা করে প্রথমবার আলোচনায় আসলেন, তখন একদল লোক বলল “একজন মেয়ে মানুষ রাত বারোটার সময় ক্লাবে কি করে ? নিশ্চয়ই তার চরিত্র খারাপ, ইত্যাদি ইত্যাদি।” আরেক দল লোক এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বললো, “পরীমনি কখন কোথায় যাবে, কি করবে সেটা তার ব্যক্তি স্বাধীনতা, তার উপর হওয়া অন্যায়ের বিচার চাই”। যাহোক, একে তো মেয়ে মানুষ, তার উপরে সুন্দরী নায়িকা, তাই পরীমনি সহজেই মানুষের সিম্প্যাথি পেতে শুরু করে। এমন সময় অযাচিতভাবে নাক গলানোয় অভ্যস্থ এক নির্বাসিত জাহিল লেখিকা পরীমনিকে সমর্থন করতে শুরু করেন। পরীমণিও ঐ লেখিকার সমর্থনকে নিজের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেন। তখনই টের পেলাম ডাল মে কুচ কালা হ্যা। কারণ শয়তান যখন আপনাকে সমর্থন করবে বা আপনার কাজে খুশি হবে, তখন বুঝতে পারবেন আপনি যা করছেন সেটাও শয়তানের পক্ষের কাজই। যার ফলস্বরূপ কিছুদিন পর পরীমনি র্যাবের অভিযানে আটক হয়। এই আটকের পরেও যথারীতি তার পক্ষে বিপক্ষে দুটো দল পাওয়া যায়। যাহোক জামিনের পর সে হাতে মেহেদী দিয়ে দুইবার অশ্লীল বাক্যের মাধ্যমে সমাজকে “দুঃসাহসিক” বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে হয়তো সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় তার লজ্জা বা ভয় ভেঙে গেছে; অথবা সে এমন কোন শক্তিশালী ক্ষমতার আয়ত্তাধীন, যেখানে কেউ তার কিছুই করতে পারবে না। এক কথায় পরীর আশেপাশে এতো শক্তিশালী জ্বীনেরা আছে, যাদের বোতলে ভরা সম্ভব নয়। আবার পরিমনির কাছে “কলঙ্ক আমার অলঙ্কার, নিন্দা রাখে জিন্দা” এমন কিছু একটা হয়ে গেছে।

চলচ্চিত্র শিল্পে এর প্রভাবঃ
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে পরীমনি নায়িকা না হয়ে সাধারণ মেয়ে হলে তাকে নিয়ে এতো মাতামাতি হতো না। আর চলচ্চিত্রের মানুষ তথা নায়িকাদের যারা আজীবন খারাপ জেনে এসেছেন, এই ঘটনা তাদের বিশ্বাসকে আরো মজবুত করে দিলো। কোন ব্যক্তির অপকর্মের দায়ভার যেমন কোন রাজনৈতিক দল নেয় না, তেমনি পরীমনির এই কান্ডকীর্তির দায়ভারও চলচ্চিত্র শিল্পী পরিবার নেবে না এটাই স্বাভাবিক। তারপরও দেরিতে হলেও পরীমনি চলচ্চিত্র পরিবার থেকে ভালো সহযোগিতা পেয়েছে। এখন কথা হলো এসকল ঘটনা পরীমনির ক্যারিয়ারে কতটুকু প্রভাব ফেলবে ? আগেই বলেছি পরীমনি শুধু বাহ্যিকভাবে নায়িকা নয়, একজন ভালো অভিনেত্রীও। এখন তার হাতে নায়িকা ছাড়াও নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে প্রমাণ করার মতো বেশকিছু সিনেমা রয়েছে। তাই তার উচিৎ হবে নিজের প্রতিভা বিকাশের জন্য বিতর্ক নয়, নিজের কর্মকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রমাণ করা। ভবিষ্যতে এমন কিছু আর না করা যাতে তার স্বভাব দিয়ে মানুষ অন্যান্য নায়িকাদের নেতিবাচকভাবে বিচার করে।

সবশেষে বলতে চাই, সাহসিকতার নামে কারো ব্যক্তিগত বেলেল্লাপনা যেন ইন্ডাস্ট্রির ভাবমূর্তি নষ্টের কারণ না হয়। কারো উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন যেন তরুণ প্রজন্ম বিনষ্টের মাধ্যম না হয়। এমন কাউকে যাতে বর্তমান প্রজন্ম অনুকরণীয় হিসেবে বেছে না নেয়, যে বিপথগামী। তবে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, একজন নায়িকা সেও রক্তে মাংসের মানুষ, তারও ভুলত্রুটি হবে। তবে সেটাকে পুঁজি করে গভীরে নেয়া বা ছড়িয়ে দেয়া সেই নায়িকা, মিডিয়া বা সাধারণ জনগণ কারোরই কাম্য নয়। আশা করি পরীমনি নিজেকে শুধরিয়ে নেবে। সমালোচনা নয়, নিজের কাজ দিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেবে।

আরো পড়ুনঃ
গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘গুনিন’ সিনেমায় অভিনয় করছেন পরীমনি
শুরু হচ্ছে ‘বায়োপিক’: সিয়ামকে নিয়ে শুটিংয়ে ফিরছেন পরীমনি
ভিন্ন রুপে পরীমনি: অভিনয় সমৃদ্ধ সিনেমার জন্য বিরামহীন যাত্রা!

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ