প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’

কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’

কাজী হায়াৎ এবং মান্না জুটির অন্যতম সেরা সিনেমা ‘আম্মাজান’। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় এই সিনেমার পিছিনের গল্পটা অনেক লম্বা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গল্পটা মান্না-ডিপজলের দ্বন্ধ। কাজী হায়াৎ সিনেমাটি মান্নাকে মাথায় রেখে সাজিয়েছিলেন তাই ডিপজলের চাওয়া স্বত্বেও রুবেলকে নিয়ে সিনেমাটি করতে রাজি ছিলেন না এই পরিচালক। সিনেমাটি মুক্তির পর কাজী হায়াতের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বোঝা যায়। সিনেমাটির পিছনের গল্প নিয়ে কাজী হায়াতের একটা লম্বা চড়া সাক্ষাৎকারও আছে।

- Advertisement -

শুধু তাই নয় সিনেমাটি নির্মান শেষ হওয়ার পর ডিপজল নিজেও সিনেমাটি নিয়ে শংকিত ছিলেন এর প্রযোজক ডিপজল। কিন্তু নিজের গল্প এবং নির্মানের প্রতি এতটাই আত্নবিশ্বাসী ছিলেন যে তিনি কখনোই এটা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না। সিনেমার পিছনের গল্পকে পিছিনে ফেলে এবার সেই সময়কার একজন দর্শক হিসেবে আমার কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছিলো তা বলছি নিচে।

সময়ের দাপুটে দুই অভিনেতার বিরোধ মিটিয়ে একটি মেগা হিট সিনেমার নাম ‘আম্মাজান’। ‘আম্মাজান’ সিনেমাটি মুক্তির পর সেই সময়ে নিয়মিত সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখা এমন কোন দর্শক খুঁজে পাবেন না যে যিনি দেখেন নাই। ‘আম্মাজান’ সিনেমাটির নাম শুনলেই আজো সেইসব দর্শকদের চোখ টলমল করে উঠে অনেক স্মৃতি মনে করে। বাংলাদেশের আধুনিক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সম্পূর্ণ বিনোদনধর্মী মৌলিক গল্পের সিনেমার ইতিহাসের সেরা সিনেমাগুলোর তালিকায় বহুকাল ধরে শীর্ষস্থান ধরে রাখবে যে সিনেমাটি তার নাম ‘আম্মাজান’। সোনালি প্রজন্মের শেষ মহানায়ক প্রয়াত মান্নাকে শতবর্ষ পরের সিনেমা দর্শকরাও যে সিনেমার জন্য মনে রাখবে তার নাম ‘আম্মাজান’। আম্মাজান হচ্ছে এমন একটি বাণিজ্যিক সিনেমা যে সিনেমাটির আবেদন আরও বহুকাল বহুযুগ ধরে থাকবে।

- Advertisement -

‘আম্মাজান’ সিনেমার প্রান হলো গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালকের মুন্সিয়ানা আর মান্না। আম্মাজান সিনেমাটি যারা দেখেছে আর আগামীতে দেখবে সবার কাছে বিস্ময় হয়ে ধরা দিবে মান্না। মনে হবে মান্না ছাড়া আম্মাজান সিনেমা নির্মাণ সম্ভব হতো না কিংবা মান্নার জন্যই নির্মিত হয়েছে ‘আম্মাজান’ যেখানে শুরু থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত ওয়ান এন্ড অনলি মান্না মান্না এবং মান্না দর্শকদের বিমোহিত করে রেখেছিলেন। মান্নার জন্যই যে আম্মাজান সিনেমা নির্মিত হয়েছিলো সেই ধারনাটা সত্য। কারন, ‘আম্মাজান’ সিনেমার নির্মাণের কিছুদিন আগেও মান্না ডিপজলের দ্বন্ধ ছিলো চরমে এবং একজন আরেকজনের ছায়াও মাড়াতেন না। সেইদ্বন্ধের সূত্র ধরেই আম্মাজান সিনেমার প্রযোজক ডিপজল কাজী হায়াতকে অনুরোধ করেছিলেন মান্নার বদলে রুবেল’কে নিতে কিন্তু কাজী হায়াত সিদ্ধান্তে অনড়। কাজী হায়াত ডিপজলকে সাফ জানিয়ে দিলেন ‘মান্নার বদলে অন্য কাউকে তিনি নিতে পারবেন না, কারণ গল্পটা মান্নাকে মাথায় রেখেই লিখেছিলেন তিনি’। কাজী হায়াতের অনুরোধে সেদিন মান্না ডিপজল বিরোধ মিটিয়ে ফেলেন এবং আম্মাজান সিনেমায় দুজন চুক্তিবদ্ধ হোন যার পরের গল্পটা একটা …ইতিহাস। স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নির্মিত বাম্পারহিট বা ব্যবসা সফল সেরা সিনেমাগুলোর তালিকায় শীর্ষসারিতে ‘আম্মাজান’ ঠাই করে নিয়েছে।

কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’

মান্নার ‘আম্মাজান’ ছবিটি যারা সেই সময় হলে দেখেছিলেন তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে কি পরিমান ভিড় ঠেলে চড়া দামে টিকেট কেটে সিনেমাটি দেখতে দর্শক হলে গিয়েছিলেন। প্রশ্ন জাগতে পারে কি ছিল সেই ছবিতে? কেন ‘আম্মাজান’ ছবির কথা উঠলেই আজো দর্শকরা মান্নাকে বারবার মনে করেন? …সিনেমা হলে ঢুকার সময় আমার মনেও কিছু প্রশ্ন জেগেছিল যা ছবিটি দেখে জবাব পেয়েছিলাম।

‘আম্মাজান’ ছবিটি অশ্লিল ছবির রমরমা সময়ে কাজী হায়াতের সম্পূর্ণ পরিছন্ন একটি বিনোদনধর্মী ছবি যার গল্পটি ছিল সম্পূর্ণ মৌলিক। গল্প, চিত্রনাট্য , নির্মাণ আর ৩/৪ চরিত্রের পাল্লা দিয়ে অভিনয় পুরো ছবিটিকে দর্শকদের কাছে করেছিল এক পশলা বৃষ্টির মতো। সাথে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ও আইয়ুব বাচ্চু’র ‘আম্মাজান, আম্মাজান’ গানটি ছিল বারুদ।

‘আম্মাজান’ ছবির টাইটেলের পর বড় হওয়া মান্না’র খুন করার একটি দৃশ্য ছিল। সেই খুনের পর মান্না যখন রক্ত মাখা ছুরি পানি দিয়ে ধুচ্ছিল তখন মান্নার সহযোগী নবাব মান্নাকে জিজ্ঞেস করছিল ” আর কতদিন?” মান্না প্রশ্নটি না বুঝে আবার জিজ্ঞেস করে ” কি কতদিন?” জবাবে নবাব আবার প্রশ্ন করে ”বলি , এভাবে আর কতদিন ?” যার উত্তরে মান্না আকাশের দিকে তাকিয়ে বিধাতার দিকে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়ে যে সংলাপগুলো বলেছিল তা দেখে পুরো বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম যে শুরুতেই চরিত্রের এতো গভীরে পৌঁছে যাওয়া অভিনয় সর্বশেষ কোন ছবিতে কোন নায়কের দেখেছিলাম মনে করতে পারিনি। এরপর অপেক্ষায় থাকলাম পুরো ছবিতে মান্না’র অভিনয় দেখার জন্য।

প্রতিটি দৃশ্য সেই শুরুর দৃশ্যর মতো বারবার চরিত্রের গভীরে পৌঁছে গিয়ে মান্না পুরো ছবিতে অনবদ্য যে অভিনয়টা করেছিলেন সেটা দেখে বুঝলাম এই আম্মাজান ছবির ”বাদশা” চরিত্রটি বুঝি মান্না’র জন্যই কাহিনিকার ,পরিচালক সৃষ্টি করেছিলেন। আমার সিনেমা হলে ছবির দেখার অভিজ্ঞতায় সেইদিন প্রথম দেখলাম আমার সামনের ও পেছনের সারির বেশ কয়েকজন দর্শক সিনেমা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে গিয়ে পরের শো দেখার জন্য টিকেট কেটে নিয়ে আসলেন যেন ছবি শেষে ভিড়ের মধ্য টিকেট কাটতে ঝামেলা না হয়। ছবি শেষে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখলাম বেশ কয়েকজন বলাবলি করছেন এখন আবার টিকেট কেটে পরের শো টি দেখবেন। অর্থাৎ আম্মাজান ছবির মান্না দর্শকদের এমন বিমোহিত করেছিলেন যে দর্শক বারবার দেখতে চাচ্ছে মান্নাকে। অর্থাৎ ‘আম্মাজান’ ছবি মানেই মান্না, মান্না মানেই ‘আম্মাজান’ ছবির বাদশা নামের পাগল ছেলেটি।

কাজী হায়াতের মতো পরিচালক ছিলেন বলেই মান্না’র কাছ থেকে অভিনয় জীবনের সেরা কাজটি আদায় করে নিতে পেরেছিলেন আর মান্নাও চরিত্রটি বুঝে এমন ভাবে মিশে গিয়েছিলেন যে আম্মাজান ছবির জন্য হলেও অন্তত যুগ যুগ ধরে দর্শকরা মান্নাকে মনে রাখতে বাধ্য। আম্মাজান ছবির জন্য কাজী হায়াত ‘শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার’ শাখায় জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। আজ মান্না নেই তাই তো নির্মিত হবেনা নতুন আরেকটি ‘আম্মাজান’ সিনেমা।

আরো পড়ুনঃ
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ মালেক আফসারীর ‘ঘৃণা’
লড়াকু নায়ক রুবেল: বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য এক অ্যাকশন হিরো’র গল্প
মহানায়ক মান্না: নব্বই দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের এক ‘তেজি পুরুষ’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ