চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদ: বাংলা সিনেমা ভাবনার একজন নিষ্কলঙ্ক প্রতিনিধি

চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদ

হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নির্মিত হয় ১৯৮৪ সালে এবং সিনেমাটি প্রশংসিতও হয়। তবে চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদ এর আবির্ভাব তারও প্রায় এক যুগ পর। ১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমা দিয়ে তার সেই আবির্ভাবও বেশ রাজকীয় ছিল। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কয়টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর অন্যতম ‘আগুনের পরশমণি’। সিনেমাটি মোট ৮টি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। বিশেষ করে সিনেমার শেষের মন্তাজটি আমাদের চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করাবে আরও বহুদিন।

- Advertisement -

‘আগুনের পরশমণি’ দিয়ে চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদ সিনেমা জগতে প্রবেশ করলেও চলচ্চিত্রকার হিসেবে হুমায়ুন আহমেদের সত্যিকার প্রতিষ্ঠা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমার মাধ্যমে। মূলত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ প্রেম-ভালোবাসায় আমাদের মূলধারার চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছিল। আর এই সিনেমাটি হুমায়ুন আহমেদের পরিচালিত – এর বাইরেও বেশ কিছু তাৎপর্য বহন করে। বিশেষত সিনেমাটিতে গানের ব্যবহার বিশেষ উল্লেখযোগ্য; গানগুলো লোকজ এবং সেগুলোর ব্যবহার সিনেমাটিকে অনেকখানিই মিউজিক্যাল করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, সমসাময়িক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সেই গুটিকয়েক চলচ্চিত্রের একটি, যেগুলোর গান এখনও আমরা তন্ময় হয়ে শুনি, তন্ময় হয়ে গাই।

এদিকে একই বছরে মুক্তি পাওয়া তার ‘দুই দুয়ারী’ সিনেমাটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিপরীতে, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে পিঠাপিঠি মুক্তি পাওয়া ‘চন্দ্রকথা’ ও ‘শ্যামলছায়া’ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত ‘চন্দ্রকথা’র আখ্যান আর ‘শ্যামলছায়া’য় দেখানো মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আকর্ষণ করে। তবে ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ সম্ভবত হুমায়ুন আহমেদের সবচেয়ে দুর্বল চলচ্চিত্র। অন্যদিকে ‘আমার আছে জল’ নিতান্তই বাজারি কাজ বলেই মনে হয়। এগুলোর বিপরীতে ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ সম্ভবত পরিচালক হুমায়ুন আহমেদের সবচেয়ে পরিণত কাজ। চলচ্চিত্রটি অস্কারের জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনীতও হয়।

- Advertisement -

হুমায়ুন আহমেদের শিল্পচর্চার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়। এরমধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি তার রচনায়, চলচ্চিত্রে কিছু মেদ রাখেন যা তার নিজস্ব পাঠক-দর্শক বেশ উপভোগ করে থাকেন। তার প্রথম সাতটি চলচ্চিত্রেই এই মেদ কিছু-না-কিছু পরিমাণে আছে। ‘দুই দুয়ারী’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ আর ‘আমার আছে জল তো’ এই মেদে পরিপূর্ণ। ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ এই দিক দিয়ে বেশ ব্যতিক্রম; পুরো সিনেমাতে অতিরিক্ত অংশ প্রায় নেই বললেই চলে। সিনেমার মাঝামাঝি অংশে জমিদারের গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখা এবং বেশ কিছু ঔদার্যপূর্ণ কাজ করার যে দৃশ্যগুলো আপাতদৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও, সেগুলোরও বিশেষ প্রয়োজন আছে। মূলত ঘেঁটুপুত্র রাখার প্রথাটি তখন মোটেও নিন্দনীয় ছিল না, জমিদার মাত্রই ঘেঁটু রাখতেন; সে ভালো জমিদারই হোন আর খারাপ এই বিষয়টি বোঝাতেই দৃশ্যগুলোর ব্যবহার করেছেন তিনি।

হুমায়ুন আহমেদের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রগুলোর আলোকে চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদ এর বেশ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যও চিহ্নিত করা যেতে পারে। যেমন – হুমায়ুন আহমেদ হাওড় অঞ্চলের কাহিনি নিয়ে সিনেমা বানাতে পছন্দ করতেন; এটি সম্ভবত তার নেত্রকোণায় জন্ম ও নেত্রকোণো-সিলেটে কাটানো তার ছোটবেলার প্রভাব। তার চলচ্চিত্রে প্রায়ই জমিদার চরিত্র পাওয়া যায়, প্রায়ই আধুনিক সভ্যতার কাছে তাদের প্রাচীনপন্থিতার পতন ঘটে। পাশাপাশি তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সদর্থক দৃষ্টিতে ফিরে তাকান; এটি সুনিশ্চিতভাবেই এসেছে তার একাত্তরের প্রত্যক্ষ স্মৃতি থেকে, বিশেষ করে তার বাবার স্মৃতি থেকে।

হুমায়ুন আহমেদের ছোট ভাই আহসান হাবীব একবার বড় ভাইয়ের সিনেমা নিয়ে ভাবনার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘হুমায়ুন আহমেদ সিনেমা নিয়ে একটু বেশি-ই ভাবতেন। তার মাথায় এই ভাবনাগুলো না থাকলে তিনি হয়তো আরও কিছুদিন বেশি বাঁচতেন।’ কিন্তু বিপরীতে এও তো সত্য, সিনেমা নিয়ে ঠিক ওই সময় হুমায়ুন আহমেদের ভাবনাও তো জরুরি ছিল। হুFiমায়ুন আহমেদ তো বাংলাদেশের সিনেমার সেই সময়েরই একজন নিষ্কলঙ্ক প্রতিনিধি, যখন বাংলাদেশের সিনেমা ক্রমশ অন্ধকার থেকে অন্ধকারের পথে যাত্রা করছিল। তিনি তো তাদেরই একজন, যাদের হাত ধরে বাংলাদেশের সিনেমা সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তিনি বেঁচে থাকলে তার সেই ভাবনা থেকে উপকৃত হত বাংলা সিনেমা এবং দর্শক পেত ভিন্ন স্বাদের কিছু সিনেমার অভিজ্ঞতা।

আরো পড়ুনঃ
আমজাদ হোসেন: আমাদের ‘গর্ব’ ও বাংলা চলচ্চিত্রের একজন ‘সিংহপুরুষ’

নাবীল অনুসূর্য
জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। স্কুলের পাঠ চুকিয়েছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে, ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে কলেজের পাঠ। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই ফিচার-সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ফেলোশিপ নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উপর একটি গবেষণার কাজ করছেন। গবেষণার বিষয় আমাদের চলচ্চিত্রে ’৫২-র উপস্থাপন: অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা। এছাড়াও ফ্রি-ল্যান্সিং লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে ও অন্যান্য মাধ্যমে।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ