ঢালিউডে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা: সময়ের ধারাপাতে অতীত থেকে বর্তমান

ঢালিউডে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা

বাংলাদেশের সিনেমা হলে শুধু দেব, জিৎ, প্রসেঞ্জিতদের চলচ্চিত্র কেন পারলে শাহরুখ খান, আমির খানদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনে আমার কোন বিরোধ নেই। তবে ঢালিউডে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা হতে হবে বাংলাদেশের মতো, বাংলাদেশীদের মতো যেখানে বাংলাদেশের তারকাও থাকতে হবে। যৌথ প্রযোজনা নামের চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে যারা আজ লাফায় তাঁরা কোনদিনও যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র দেখেনি এবং যৌথ প্রযোজনা কি তা বুঝে না।

- Advertisement -

ঢালিউডে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা আজ নতুন কিছু নয়। সেই আলমগির কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ থেকে যৌথ প্রযোজনার শুরু। যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তিতে আমরা পেয়েছিলাম ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘লাভ ইন সিঙ্গাপুর’, ‘নেপালি মেয়ে’, ‘দূরদেশ’, ‘মিসলংকা’, ‘লেডি স্মাগলার’, ‘বিরোধ’, ‘অবিচার’, ‘বলবান’, ‘আপোষ’, ‘ব্যবধান’, ‘বাপের বেটা’, ‘দুনিয়া’, ‘দেশ বিদেশ’, ‘প্রতারক’, ‘ঝড় তুফান’, ‘লাভ ইন আমেরিকা’ সহ অনেকগুলো যৌথ প্রযোজনার সিনেমা। যে সিনেমাগুলো ভারত, পাকিস্থান, শ্রীলংকার মতো দেশগুলোর সাথে যৌথভাবে নির্মিত হয়েছিল এবং কোন দেশের প্রযোজক, পরিচালক বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করার মতো সাহস দেখায়নি। আমাদের প্রযোজক পরিচালকরা ঠিকই আমাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেই যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মিত করেছিলেন। কোন ছবির মাঝে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের শিল্পিকে বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। এই প্রসঙ্গে ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বিরোধ’ ছবিটির উদাহরণ দেয়া যায়। ‘বিরোধ’ ছবিটির হিন্দি ভার্শন ‘শক্তি’ নামে এক বছর আগে (১৯৮৫) ভারতে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। বলিউডের রাজেশ খান্না, শক্তিমান অভিনেতা প্রেম চোপরা অভিনীত একটি দুর্দান্ত ছবি ছিল ‘বিরোধ’ যা আমার দেখা এখন পর্যন্ত যৌথ প্রযোজনার শ্রেষ্ঠ ছবি।

‘বিরোধ’ ছবির পুরোটা জুড়েই রাজেশ খান্না, প্রেম চোপড়া এবং মাস্টার তাপ্পুর মুগ্ধ করা অভিনয় ছিলো যেখানে শাবানা ছিলেন খুবই অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু তারপরেও ছবিটিকে একবারও মনে হয়নি ছবিটি বাংলাদেশের নয়। বারবার বাংলার কথা উঠে এসেছে ছবিটির মাঝে। আমাদের কণ্ঠশিল্পী অ্যান্ড্রো কিশোরের কণ্ঠে ছবির টাইটেল গান ‘আজো বয়ে চলে পদ্মা মেঘনা বুড়িগঙ্গার ধারা’ শিরোনামে গানটি দিয়ে ছবিটি শুরু হয়। গৌরি প্রসন্নের লিখা ও রাহুল দেব বর্মণের সুরে সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ছিল ‘তোর আঁচলে মমতারই ছায়া’ শিরোনামে ছবির সবচেয়ে সেরা গানটি। পরিবারের সাথে সিলেটের অবকাশ সিনেমা হলে ছবিটি দেখার স্মৃতি আজো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। হলভর্তি দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালির শব্দ আজো কানে বাজে। সেই ছবির একটি জনপ্রিয় সংলাপ ছিল ‘তুমি তোমার ঠিকানা খুঁজে নাও, আমি তোমাকে ঠিকই খুঁজে নিবো’। ‘বিরোধ’ ছবির একটি আইটেম গানে ছিলেন আমাদের অভিনেত্রী নূতন। অর্থাৎ ‘বিরোধ’ ছবিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে বাংলাদেশের অভিনেতা অভিনেত্রী ছিলেন কম কিন্তু তারপরেও ছবিটি বাংলাদেশের শিল্পী, দর্শকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করেনি। কেউ বলতে পারবে না ‘বিরোধ’ ছবিটি যৌথ প্রযোজনার নামে ‘যৌথ প্রতারণা’ করেছে।

- Advertisement -

একসময় এই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে জাজ এর চেয়ে অনেক বড় বড় প্রযোজনা সংস্থা ছিল যাদের কাউকেই এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে শুনিনি। আলমগির পিকচার্স যাদের বলা হতো বাংলা চলচ্চিত্রের মোঘল, সেই মোঘলরা পর্যন্ত এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়নি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এমন কোন ধারা নেই বা এমন কোন ধারার গল্প নেই যেখানে আলমগির পিকচার্সকে পাওয়া যাবে না। শুধু তাই নয় সেই সময়ে পারভেজ ফিল্মস, জ্যাম্বস, স্বরলিপি কথাচিত্র, দেশ কথাচিত্র, মেরিনা মুভিজ, যমুনা ফিল্মস, মেট্রো ফিল্মস, এস এস প্রোডাকশনস, সানফ্লাওয়ার মুভিজ, আনন্দমেলা কথাচিত্র, রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনস, সোনামণি ফিল্মস এর মতো দারুন সব চলচ্চিত্রের নির্মাতা গোষ্ঠী কেউই এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়নি। প্রতিযোগিতা ছিল উম্মুক্ত। সিনেমা হলের মালিকদের যার যে ছবি ইচ্ছা সেটাই তাঁরা প্রদর্শন করতো। যে কারণে এই দেশে দুর্দান্ত সব বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে এবং দর্শকেরাও সেগুলো উপভোগ করেছিল। সেই সময়কার প্রযোজক, পরিচালকদের কারনেই এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভেতরেই ১২০০ সিনেমা হলের একটি বাজার তৈরি হয়েছিল। জাজ একে তো ডিজিটাল চলচ্চিত্রের নামে কিছু অখাদ্য কুখাদ্য তৈরি করেছে ঠিক তেমনি যৌথ প্রযোজনার নামে প্রতারণাও করেছে।

একদিন এই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে শশি কাপুর, রাজেশ খান্না, রাজ বাব্বার, প্রেম চোপড়া, মিঠুন চক্রবর্তী, নাদিম, ফয়সাল, শর্মীলি ঠাকুর, পারভিন ববি’র মতো উপমহাদেশের অনেকেই বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এক সময় শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়, ভারত-পাকিস্থান-বাংলাদেশ, বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-কানাডা, বাংলাদেশ-নেপাল-পাকিস্তান এভাবে ৩/৪ দেশ মিলেও যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ করতো। তবে সেদিনকার কেউই আজকের মতো নিজেদের ইচ্ছেমতো বাংলাদেশের উপর ছড়ি ঘুরাতে সাহস পেতো না।

এবার আসুন, ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির প্রসঙ্গে। এই দেশের চলচ্চিত্রের বাজার দখল করার ইচ্ছে ভারতের অনেক পুরনো। কিন্তু আমাদের দেশের মেধাবী ও সাহসী মানুষগুলোর কারণে এরা সেটা সফল করতে পারছিল না। আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে এই দেশীয় ভারতীয় দালালদের দিয়ে খুব কৌশলে এই দেশের চলচ্চিত্র শিল্পটাকে ধংস করা শুরু হয়। সেদিনের সেই গোপন অভিলাষটা আজ স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশের সিনেমা হলে ভারতীয় সিনেমা মুক্তি দেয়ার মাধ্যমে। যারা বলে ভারতীয় ছবি এই দেশে মুক্তি পেলে আমাদের চলচ্চিত্রের উন্নতি হবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে সেটা সম্পূর্ণ ভুল। সেইসব লোকেরা হলেন জ্ঞানপাপী অন্ধ চাটুকার। কারণ ভারতের যে ছবিগুলো এইদেশের সিনেমা হলে মুক্তি পাবে তার বাজেট, কারিগরি মান সবকিছুই আমাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি এগিয়ে। ২০/৩০ কোটি রুপির ছবির সাথে ২/৩ কোটি রুপির ছবির প্রতিযোগিতার কথা ভাবতে পারাটা একধরনের বিলাসিতাই বলা চলে। যেখানে চাক্ষুস প্রমাণ আছে ভূরি ভূরি সেখানে এই ধরনের হাস্যকর যুক্তি একমাত্র অসুস্থ মানুষ ছাড়া কেউ দিতে পারেনা। আমার কথা বিশ্বাস না হলে একবার স্টার সিনেপ্লেক্সের বাহিরে দাঁড়িয়ে দেখুন। হলিউডের জেমস বন্ড সিরিজ বা এভেঞ্চার জাতীয় সাই-ফাই ছবির পাশে আমাদের ‘গাড়িওয়ালা’ টাইপ উচ্চমার্গিয় চলচ্চিত্র কিংবা ২/৩ কোটি টাকায় নির্মিত বাণিজ্যিক ছবি চললে আমাদের ছবিগুলোর চেয়ে হলিউডের ছবিগুলো দেখতে শিক্ষিত দর্শকরা ভিড় করবে এটাই স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতিতে ভারতের ছবির সাথে আমাদের প্রতিযোগিতা বাড়ানোর কথা বলে কিভাবে? এই অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে ভারতীয় ছবি আমদানির পক্ষে যারা বলে তাঁরা মূলত লাইফ সাপোর্টে থাকা এই ইন্ডাস্ট্রির লাইফ সাপোর্টটা খুলে কবরে পাঠাতে চায়। ভারতীয় ছবির সাথে প্রতিযোগিতা করার আগে নিজের দেশের ইন্ডাস্ট্রিকে আধুনিক কারিগরি যন্ত্রপাতি, বিগ বাজেটের একাধিক প্রযোজক দেন এরপর প্রতিযোগিতায় নামান। ঢাল, তলোয়ার ছাড়া উলঙ্গ একটা মানুষকে যদি যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে পাঠান তাহলে সেটা হবে জেনেশুনে তাকে মৃত্যুর দুয়ারে পাঠানো।

আমাদের প্রযোজক, পরিচালক ও শিল্পীদের নির্লিপ্ততা কলকাতাকে সাহস যোগায় বারবার প্রতারণা করার জন্য। আমাদের প্রযোজক, পরিচালক ও শিল্পিরা আজ লোভে অন্ধ যার সুযোগটা কলকাতা খুব কৌশলে ভালোভাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে। একটি মানুষও সঠিক কথা বলে অনিয়মদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সাহস দেখায় না। ইন্ডাস্ট্রির তথাকথিত ১নং নায়কসহ যখন নতুন প্রজন্মের নায়ক নায়িকারা নিজেদের স্বার্থে অন্ধ হয়ে বারবার ফাঁদে পা দেয় তখন তা অন্যদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠে। একদিন যে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে একেএম জাহাঙ্গীর খান, সফর আলী ভুঁইয়া, সুবিদ আলী ভুঁইয়া, শফি বিক্রম্পুরি, বজলুর রশিদ ঢালী, আজিজুর রহমান বুলি, মাসুদ পারভেজ , আজমল হুদা মিঠু, শাহ আলম খান, কে এম আর মঞ্জুর, ওয়াহিদ সাদিক, জসিম এর মতো বাঘা বাঘা প্রযোজকেরা ছিল যারা শুধু চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী ছিলেন না ছিলেন মেধাবী ও সাহসী প্রযোজকও। সেখানে আজ নাম সর্বস্ব কিছু প্রযোজক চলচ্চিত্র নির্মাণের নামে দর্শকদের সাথে প্রতারণা করে আসছে। যে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতারকে ভরপুর থাকে সেই ইন্ডাস্ট্রির সাথে অন্যরা প্রতারণা করবে নাতো কি করবে? যৌথ প্রযোজনার নামে যৌথ প্রতারণা ঠেকাতে হলে আগে নিজেদের শুদ্ধ করুন, আগে নিজেরা ঠিক হোন।

আরো পড়ুনঃ
ওমর সানী এবং মৌসুমি: বাংলা সিনেমার হারিয়ে যাওয়া জুটির শুরুর গল্প
স্মৃতিতে সালমান শাহ ও ওমর সানিঃ সোনালী সময়ে তাদের লড়াইয়ের দিনগুলো

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ