প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ মনোয়ার খোকনের ‘সংসারের সুখ দুঃখ’

মনোয়ার খোকনের ‘সংসারের সুখ দুঃখ’

একজন মেধাবী শিক্ষক যখন তাঁর কোন ছাত্রের কাজে ছায়ার মতো সঙ্গী হয়ে থাকেন তখন সেই ছাত্রটার কাজটাও শিক্ষকের সেরা কোন কাজের মতোই মানসম্পন্ন হয়।  হঠাৎ করে ছাত্র শিক্ষকের কাজের কথা কেন বলছি? মনোয়ার খোকনের ‘সংসারের সুখ দুঃখ’ সিনেমার মাধ্যমে আজ আপনাদের তেমনই এক  ছাত্র ও শিক্ষকের কথা বলবো। সেই সাথে বাংলা সিনেমার সোনালী সময়ের গল্পে থাকছে আরো একটি সোনালী অতীতের উপাখ্যান।

- Advertisement -

১৯৯৬ সালের ঈদুল আযহায় মুক্তি পেয়েছিল একাধিক দারুন দারুন সব চলচ্চিত্র। সালমান শাহ, সানী, মান্না, রুবেল, কাঞ্চন, জসিম, আলমগির, শাবানা, মৌসুমি, শাবনুর কারো ছবিই বাদ যায়নি। কোনটা রেখে কোনটা আগে দেখবো সেটাই বড় সমস্যা ছিল। যাই হোক, একদিন বিকেলে সিলেটের নন্দিতা সিনেমা হলে তেমনই একটি ঈদের ছবি দেখতে গেলাম। …শিল্পপতি আলমগির একজন প্রতিষ্ঠিত সৎ ব্যবসায়ী। স্ত্রী শাবানা ও একমাত্র শিশু সন্তান অপুকে নিয়ে আলমগিরের সুখের সংসার। সেই সংসারে একদিন হাজির হয় গ্রাম থেকে আসা সহজ সরল ওমর সানী যে আলমগিরের এক চাচাতো ভাই। সহজ সরল সানীকে পেয়ে আলমগির শাবানা ও অপু দারুন খুশি। ওমর সানিও তাঁদের খুব আপন করে নেয়। ওমর সানী গ্রাম্য সহজ সরল হলেও শিক্ষিত। আলমগিরের প্রতিবেশী হিসেবে আছে মৌসুমির পরিবার। মৌসুমি সানিকে দেখে গ্রাম্য খ্যাঁত বলে উপহাস করে কিন্তু সানির বুদ্ধিমত্তা ও মজার মজার সব ঘটনায় বারবার মৌসুমি কুপোকাত হয় এবং সানী মৌসুমির খুনসুটি লেগেই থাকে। একদিন আলমগির সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে যায়। কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে একটি রেলসেতুর উপর দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে  দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় সবাইকে খুঁজে পাওয়া গেলেও শাবানাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। নদীতে শাবানার পরনের শাড়িটা শুধু ভেসে থাকতে দেখা যায়। আলমগির, অপু ও সানী মনে করে শাবানা হয়তো মারা গেছে। শাবানাকে হারিয়ে পুরো পরিবার শোকে কাতর। এই শোক কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে আলমগির চেষ্টা করে। অপুকে দেখাশোনার দায়িত্ব সানী নেয়।  শিশু অপু মাকে হারিয়ে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। এই সুযোগে আলমগিরের পিএস রিনা খান শিশু অপুকে মাতৃস্নেহ দেয়ার অভিনয় করে শিশু অপুর মন জয় করে। শিশু অপুর জন্য সানী আলমগিরকে ২য় আরেকটি বিয়ে করানোর জন্য রাজী করায়। আলমগির রিনা খানকে বিয়ে করে। আলমগির রিনা খানের সংসারে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়।

এরপর পাল্টে যেতে শুরু করে দৃশ্যপট। ধীরে ধীরে রিনা খানের আচরণ পরিবর্তন হতে থাকে যা সানী লক্ষ্য করে। একদিন রিনা খানের ভাইয়ের পরিচয় দিয়ে ‘আমি থাকতে আসিনি, চলে যাবো বলে’ বলে সৌদি আরব থেকে আলমগীরের বাড়িতে  হাজির হয়  হুমায়ূন ফরিদি আর শুরু হয় অন্য এক গল্প…। ফরিদি কথায় কথায় ‘আমি থাকতে আসিনি, চলে যাবো বলে’ বললেও যাওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যায়না বরং ফরিদির বুদ্ধিতে সানিকে চোর বানিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। অপু হয়ে যায় একেবারে নিঃসঙ্গ। অপুকে ভূতে ধরেছে বলে মানুষিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয় আলমগিরের অবর্তমানে।

- Advertisement -

একদিন রাস্তায় চলার পথে দূর থেকে শাবানাকে দেখে সানী  ‘ভাবী, ভাবী’ বলে  চিৎকার করে  ডাকতে থাকে, শাবানা পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে সানিকে চিনে ফেলে। দুর্ঘটনায় শাবানা সেদিন মারা যায়নি, শাবানা স্রোতে ভেসে গিয়েছিল এবং  জ্ঞান ফেরার পর শাবানা কিছু মনে করতে পারছিল না। শাবানাকে যিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনিই চিকিৎসার জন্য শাবানাকে ঢাকায় এনেছিলেন এবং সানিকে দেখেই শাবানা চিনে ফেলে। শাবানা তাঁর সংসারে ফিরতে চায় কিন্তু সানী তাঁকে সব ঘটনা খুলে বলে। শাবানা, সানী ও মৌসুমি এবার বুদ্ধি করে কিভাবে সেয়ানা শয়তান ফরিদি ও তাঁর লোভী বোন রিনা খানের পাতানো ফাঁদ থেকে আলমগির ও তাঁর সন্তান অপুকে মুক্তো করে সংসারে আবার সুখ ফিরিয়ে আনা যায় তা…। এরপর ঘটতে থাকে দারুন মজার মজার সব ঘটনা যার মধ্য দিয়ে ফরিদির সব কুটচাল ব্যর্থ হয়ে যায়। ফরিদি একের পর এক নাস্তানাবুদ হতে থাকে। অবশেষে শাবানা আবার তাঁর সংসারে ফিরে আসার মাধ্যমে ছবিটি সমাপ্ত হয়। ছবিটির গল্প যেমন চমৎকার ছিল ঠিক তেমনি মনিরুজ্জামান মনিরের লিখা ও আলম খানের সুর করা সবগুলো গানই ছিল দারুন শ্রুতিমধুর।

এতক্ষণ সংক্ষেপে যে চলচ্চিত্রের গল্পটি বলছিলাম তা হলো মনোয়ার খোকনের ‘সংসারের সুখ দুঃখ’ নামের একটি পারিবারিক বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্রের গল্প  যা সেদিন নন্দিতা সিনেমা হলে দেখেছিলাম। লিখার শুরুতেই যে ছাত্র শিক্ষকের কথা বলছিলাম মনোয়ার খোকনের ‘সংসারের সুখ দুঃখ’ নামের অসাধারন চলচ্চিত্রটি তার কারণ। সিনেমাটির পরিচালক মনোয়ার খোকন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মাস্টারমেকার’ এ জে মিন্টুর একজন ছাত্র বা সহকারি পরিচালক ছিলেন। ৯০ দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে যে কজন তরুণ পরিচালক সফল হয়েছিলেন মনোয়ার খোকন তাঁদের অন্যতম একজন। আমার দেখা মতে মনোয়ার খোকনের সবচেয়ে সুনির্মিত চলচ্চিত্র হলো ‘সংসারের সুখ দুঃখ’ চলচ্চিত্রটি যার মতো আর একটি চলচ্চিত্রও তিনি নির্মাণ করতে পারেননি। পুরো পরিবার সহ ছবিটি দেখতে আসা মহিলা দর্শকরাসহ সব শ্রেণী পেশার ও সব বয়সী দর্শকদের ছবিটি মুগ্ধ করেছিল। মনোয়ার খোকনের ‘সংসারের সুখ দুঃখ’ চলচ্চিত্রটির গল্প, সংলাপ, নির্মাণশৈলী দেখেই সন্দেহ হয়েছিল এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে যা ছবির শেষে পূর্ণাঙ্গ টাইটেল সত্যি প্রমাণ করে। ছবির টাইটেলে দেখতে পেলাম প্রযোজক ও বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালক এ জে মিন্টু  এবং সানফ্লাওয়ার মুভিজ…। ব্যস কারোরই আর বুঝতে বাকি থাকেনি যে এই ‘সংসারের সুখ দুঃখ’ চলচ্চিত্রের সাথে মিন্টু ছায়ার মতো ছিলেন যার ফলে মনোয়ার খোকনের আগের চলচ্চিত্রগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। চলচ্চিত্রটির প্রতিটি দৃশ্য বাস্তব সম্মত ভাবে তুলে ধরার এতো চেষ্টা যা এ জে মিন্টুর চলচ্চিত্র ছাড়া পাওয়া যায় না। একটি পরিবারের ও ৬/৭ টি চরিত্রের ভেতর  পুরো গল্পটিকে প্রানবন্ত করে তোলার দক্ষতা এ জে মিন্টু ছাড়া এমন অসাধারন ভাবে কেউ পারে না এবং মনোয়ার খোকন এই কারনেই সম্পূর্ণ সফল হয়েছিলেন। শুধু তাই নয় ছবিটির গল্প, চিত্রনাট্য ও গানগুলোকে এক সুতোয় মনোয়ার খোকন এমনভাবে বেঁধেছিলেন যে দর্শকদের মনে প্রশ্ন জাগতে বাধ্য  ছবিটিতে কে যেন আছেন? কাকে যেন খুঁজে পাওয়া যায়???

চলচ্চিত্রটি এ জে মিন্টুর পরিচালিত নয় অথচ ছবিটির শেষ পর্যায়ে আমার এক বন্ধু আমার সাথে ছবি শেষে চিকেন বিরিয়ানি খাওয়ার বাজি ধরেছিল এটা এ জে মিন্টুর ছবি যার কথাটা আমি তখন উড়িয়ে দিয়েছিলাম। বন্ধুটি এতোই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে সে ছবি সমাপ্ত হওয়ার পর পর্দায় দেখানো টাইটেল সম্পূর্ণ না দেখে সিট থেকে উঠবে না। ‘সমাপ্ত’ লিখা শেষে টাইটেল দেখামাত্রই দুই হাত উপরে তুলে ‘ইয়েস, ইয়েস’ বলে উল্লসিত ভঙ্গিমায় সিট থেকে উঠলো যেন সে চিকেন বিরিয়ানি খাওয়ার বাজিতে  জিতেনি, লক্ষ টাকা পাওয়ার বাজি জিতেছে !!! একজন শিক্ষক শুধু তাঁর ছাত্রের উপর প্রভাব খাটাননি একজন দক্ষ পরিচালক কিভাবে আরেকটি চলচ্চিত্রে ছায়া হয়ে থেকেও দর্শকদের উপর প্রভাব রাখতে পারেন তা মনোয়ার খোকনের ‘সংসারের সুখ দুঃখ’ চলচ্চিত্রটি না দেখলে বুঝতে পারতাম না।

আরো পড়ুনঃ
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ কাজী হায়াতের ‘দেশপ্রেমিক’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ এজে মিন্টুর ‘সত্য মিথ্যা’
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘শত্রু ভয়ংকর’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ