সোমবার, মে ১৭, ২০২১

সালমান খানের এক দশক: সুপারষ্টার থেকে বক্স অফিসের দাবাং

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকটা (২০০১ থেকে ২০১০) সালমান খানের জন্য মোটেও সুখের ছিলোনা। ২০১০ সালের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দাবাং’ সিনেমার আগ পর্যন্ত ‘নো এন্ট্রি’ এবং ‘পার্টনার’ ছাড়া ছিলোনা কোন সুপারহিট সিনেমা। এই সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত তার বেশির ভাগ সিনেমার বক্স-অফিসে ব্যর্থ হয়েছিল। ২০০৯ সালে ‘ওয়ান্টেড’ সিনেমার জনপ্রিয়তা সালমান খানকে নতুন জীবন দেয়। এরপর ২০১০ সালের শুরুতে তার ‘বীর’ সিনেমাটি আবারো বক্স-অফিসে ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর ২০১০ এ এসে ‘দাবাং’ দিয়ে সালমান খানের বলিউড বক্স-অফিসে পুনর্জন্ম হয়। ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্লকবাষ্টার ব্যবসা করে। তারপর ২০১১ সাল থেকে বলিউডে সালমান খানের গল্পটা অপরাজেয়। একের পর এক ব্লকবাষ্টার সিনেমা দিয়ে সালমান খান নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তার মুক্তিপ্রাপ্ত ১৪টি সিনেমা থেকে শুধুমাত্র ভারতীয় বক্স-অফিসে আয়ের পরিমান ছিল ২৬৮৫ কোটি রুপি। বক্স-অফিসে সফলতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি সিনেমা সমালোচনদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক বলিউডে সালমান খানের এক দশক এবং তার বিস্তারিত।

- Advertisement -

২০১০ সালের বক্স-অফিস কাঁপানো ‘দাবাং’ সিনেমার পর সালমান খান ২০১১ সাল শুরু করেন কমেডি সিনেমা ‘রেডি’ দিয়ে। সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্লকবাষ্টার ব্যবসা করে। একই বছরের ঈদে মুক্তি পায় সালমান খানের দ্বিতীয় সিনেমা ‘বডিগার্ড’। আগের ধারাবাহিকতায় এই সিনেমাটিও বক্স অফিসে ঝড় তুলে এবং বছরের সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমার স্বীকৃতি অর্জন করে। শুধু তাই নয়, ২০১১ সালের সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমার তালিকায় প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থানে ছিল সালমান খানের সিনেমাগুলো। ‘ওয়ান্টেড’ এবং ‘দাবাং’ এরপর ‘বডিগার্ড’ দিয়ে সালমান খান আরো একবার ঈদকে নিজের সিনেমা মুক্তির উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আর এই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল পরের বছরও, অর্থাৎ ২০১২ সালে। ২০১২ সালের ঈদে মুক্তি পায় সালমান খান অভিনীত কবির সিং পরিচালিত গোয়েন্দা কাহিনী নির্ভর সিনেমা ‘এক থা টাইগার’। ১৮৬ কোটি রুপি আয় করে সিনেমাটি ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়। একই বছরের ক্রিসমাসে মুক্তি পেয়েছিলো তার ২০১০ সালের ব্লকবাষ্টার ‘দাবাং’ সিনেমার সিক্যুয়েল ‘দাবাং ২’, যা বক্স অফিসে ১৫০ কোটি রুপির ব্যবসা করে। আগের বছরের মত ২০১২ সালেও বছরের সৰ্বাধিক আয়ের সিনেমার তালিকায় প্রথম দুটি সিনেমা ছিল সালমান খানের।

সালমান খানের এক দশক

- Advertisement -

২০১১ এবং ২০১২ –  পরপর দুইবছর বক্স-অফিস মাতিয়ে ২০১৩ সালে বিরতী নেন সালমান খান। এই বছর তার কোন সিনেমা মুক্তি পায়নি। তবে ২০১৪ সালের শুরুটা ভালো হয়নি সালমান খানের জন্য। এই বছরের জানুয়ারিতে মুক্তিপ্রাপ্ত ভাই সোহেল খান পরিচালিত সিনেমা ‘জয় হো’। কিন্তু আগের সিনেমাগুলোর মোত ‘জয় হো’ বক্স অফিসে তেমন ভালো ব্যবসা করতে পারেনি। ১০৯ কোটি রুপি আয়ের মাধ্যমে বক্স-অফিসে সেমি হিট হয়েছিল সিনেমাটি। তবে ২০১৪ সালের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কিক’ সিনেমার মাধ্যমে আবারো নিজের বক্স অফিস যাত্রাকে সমৃদ্ধ করেন। ‘কিক’ সালমান খানের প্রথম সিনেমা হিসেবে ২০০ কোটি রুপি আয় করে ব্লকবাষ্টারের খাতায় নাম লিখায়।

২০১৫ সালে সালমান খান নিজেকে নিয়ে যান আরো একধাপ উপরে। এই বছরের ঈদে মুক্তি পায় নির্মাতা কবির সিংয়ের সাথে তার দ্বিতীয় সিনেমা ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ এবং যথারীতি বক্স-অফিসে ঝড়। এবার ১০০ বা ২০০ নয়, এই সিনেমাটির মাধ্যমে সালমান খান স্পর্শ করেন ৩০০ কোটির মাইলফলক। ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি সিনেমাটির বিষয়বস্তু এবং সালমান খানের অভিনয় বলিউডের সর্বমহলে সমাদৃত হয়। অনেকের মতে এখন পর্যন্ত সালমান খানের ক্যারিয়ারের সেরা সিনেমা হচ্ছে ‘বজরঙ্গি ভাইজান’। এরপর একই বছরের শেষের দিকে মুক্তি পায় সালমান খানের দীর্ঘদিনের বন্ধু সুরোজ ভার্তোয়াজ পরিচালিত সিনেমা ‘প্রেম রতন ধোন পাইও’। সিনেমাটি ১৯৪ কোটি আয়ের মাধ্যমে হিট সিনেমার হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘সুলতান’ বক্স অফিসে সালমান খানের জয়রথকে আরো দীর্ঘায়িত করে। আলী আব্বাস জাফর পরিচালিত এই সিনেমা বক্স অফিসে ৩০০ কোটির উপরে আয় করে। ‘সুলতান’ এরপর ২০১৭ সালের ঈদে মুক্তি পায় সালমান খান অভিনীত ‘টিউবলাইট’। ‘এক থা টাইগার’ এবং ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ এরপর সালমান খান তৃতীয়বারের মত অভিনয় করেন কবির সিংয়ের পরিচালনায়। তবে মুক্তির পর বক্স অফিসে প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয় সিনেমাটি। কিন্তু একই বছরের ক্রিসমাসে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘টাইগার জিন্দা হ্যা’ সিনেমার মাধ্যমে স্বরূপে ফিরেন এই তারকা। সিনেমাটি বক্স অফিসে ৩৩৯ কোটি আয় করে ব্লকবাষ্টার তকমা পায়। শুধু তাই নয়, এই সিনেমার মাধ্যমে আমির খানকে পিছনে ফেলে সর্বাধিক ৩০০ কোটি আয়ের সিনেমার অভিনেতা হিসেবে আবির্ভুত হন সালমান খান। কারন ‘টাইগার জিন্দা হ্যা’ সিনেমার মাধ্যমে তৃতীয়বারের মত বক্স অফিসে ৩০০ কোটির আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করেন বলিউডের ভাইজান।

সেই ‘দাবাং’ থেকে শুরু করে ২০১৭ সালের ‘টাইগার জিন্দা হ্যা’ পর্যন্ত সালমান খানের যে একক আধিপত্য ছিলো তার কিছুটা ছেদ পরে ২০১৮ সাল থেকে। ২০১৮ সালের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সালমান খান অভিনীত ‘রেস ৩’ সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। ‘রেস’ ফ্রাঞ্চাইজির আগের দুইটি সিনেমা সাফল্য এবং তৃতীয় সিনেমায় সালমান খানের সংযুক্তির কারনে শুরু থেকে আলোচনায় ছিল সিনেমাটি। তবে মুক্তি পর সমালোচক এবং দর্শকদের কড়া সমালোচনার মুখে পরেন সালমান খান। বাজে গল্প, চিত্রনাট্য এবং রেমো দি’সুজার অনভিজ্ঞ নির্দেশনা – সব মিলিয়ে সিনেমাটির সাথে নিজের সংযুক্তির কারনে তার ভক্তরা হতাশা ব্যক্ত করেন। ফলাফলস্বরূপ বক্স অফিসে এভারেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এরপর ২০১৯ সালও সালমান খানের জন্য হতাশার ছিলো। ‘সুলতান’ এবং ‘টাইগার জিন্দা হ্যা’ সিনেমা দুইটির সফলতার পর এই বছর মুক্তি পায় আলী আব্বাস জাফর এবং  সালমান খান জুটির তৃতীয় সিনেমা ‘ভারত’। ট্রেলার প্রকাশের পরসিনেমাটি নিয়ে সবার প্রত্যাশা ছিলো আকাশচুম্বী। তবে মুক্তির পর সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও বক্স অফিসে তেমন সুবিধা করতে পারেনি সিনেমাটি। তারপরও ১৯৭ কোটি রুপি আয় করে সিনেমাটি সেমি হিট তকমা পায়। কিন্তু সালমান খানের সবচেয়ে বড় হতাশা ছিল ২০১৯ সালের ক্রিসমাসে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দাবাং ৩’ সিনেমা। প্ৰভু দেবা পরিচালিত সিনেমাটি মুক্তির পর বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পরে সিনেমাটি। এই সিনেমাটির জন্যও সমালোচনার শিকার হন এই তারকা। আর এক দশক পর সালমান খান পেলেন প্রথম ফ্লপ সিনেমার স্বাদ।

২০২০ সালের ঈদে মুক্তি জন্য প্রস্তুত ছিলো সালমান খান অভিনীত প্ৰভু দেবা পরিচালিত সিনেমা ‘রাধে: ইউর মোষ্ট ওয়ান্টেড ভাই’। কিন্তু করোনা মহামারীর কারনে মুক্তি পায়নি সিনেমাটি। সর্বশেষ খবর অনুযারী আগামী ঈদে মুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে সিনেমাটির। তবে, বর্তমানে করোনা মহামারীর নতুন প্রাদুর্ভাবের কারনে এই ঈদেও সিনেমাটির মুক্তি অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, ‘রাধে’ সিনেমার মাধ্যমেই করোনা পরবর্তী সময়ে বড়পর্দায় ফিরছেন ভাইজান। এরপর সালমান খান শুরু করবেন ‘টাইগার’ ফ্রাঞ্চাইজির নতুন সিনেমা ‘টাইগার ৩’। এরপর তার হাতে রয়েছে ‘কাভি ঈদ কাভি দিওয়ালি’, ‘কিক ২’ সিনেমাগুলো। এছাড়া তাকে আরো দেখা যাবে ‘অন্তিমঃ দ্যা ফাইনাল ট্রুথ’ সিনেমায়, যেখানে তিন একজন পাঞ্জাবি পুলিশের চরিত্রে। অন্যদিকে শাহরুখ খান অভিনীত ‘পাঠান’ সিনেমার একটি বিশেষ চরিত্রে দেখা যাবে তাকে।

বিগত এক দশকে সালমান খানের সিনেমা বক্স অফিস আয়ের দিক থেকে অনন্য হলেও ‘এক থা টাইগার’ এবং ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ ছাড়া মনে দাগ কাটার মত সিনেমা তেমন দেখা যায়নি। তবে মধ্যে সালমান ভক্তদের জন্য সুখবর নিয়ে এসেছিলেন আলোচিত নির্মাতা সঞ্জয় লীলা বানসালি। সালমান খান এবং আলিয়া ভাটকে নিয়ে এই নির্মাতা ঘোষনা দিয়েছিলেন তার নতুন সিনেমা ‘ইনশাল্লাহ’। তবে শুটিং শুরুর আগে মুহূর্তে সিনেমাটি থেকে সরে দাঁড়ান সালমান খান এবং সঞ্জয় লীলা বানসালি সিনেমাটি বাতিল করে দেন। বক্স অফিসে একচ্ছত্র রাজত্ব করলেও সিনেমার মানের দিকে থেকে পিছিয়ে ছিলেন তিনি, যেখানে আমির খান ছিলেন অনন্য।

এক দশকে শুধুমাত্র ভারতীয় বক্স অফিসে ২৬৮৫ কোটি রুপি, তিনটি সিনেমা ৩০০ কোটির বেশি আয় – সব মিলিয়ে এই দশ বছরে নিজেকে একজন বক্স অফিস মনষ্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সালমান খান। তাই হয়তো করোনাকালীন সময়ে যখন বলিউডের অনেক তারকার সিনেমা ওটিটি প্লাটফর্মে মুক্তির কথা শোনা যাচ্ছিলো, তখন ভারতের প্রেক্ষাগৃহ প্রদর্শক সমিতির পক্ষ্য থেকে ‘রাধে’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির জন্য সালমান খানকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করা হয়েছিল। সেখানে সালমান খানের সিনেমার আয়ের উপর প্রেক্ষাগৃহ টিকে থাকার কথা বলে তাকে ধন্যবাদও দিয়েছিলেন সমিতির নেতারা। আগামী দিনেও তার মুক্তি প্রতীক্ষীত সিনেমাগুলো বক্স ঝড় তুলবে বলে করছেন সবাই।

আরো পড়ুনঃ
শাহরুখ খানের এক দশক: ‘সুপার হিরো’ থেকে ‘জিরো’

- Advertisement -
হোসেন মৌলুদ তেজোhttps://iammoulude.com/
হোসেন মৌলুদ তেজো একজন নিয়মিত ব্লগার যিনি সিনেমা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। সিনেমার পাশাপাশি কবিতা, ছোট গল্প, সমসাময়িক এবং ব্যবসা সম্পর্কিত বিষয়েও লিখে থাকেন। প্রফেশনালী একটি বেসকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি বই পড়ে, সিনেমা দেখে এবং তার একমাত্র ছেলের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • Sphulingo