ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি: জেনে নিন কতগুলো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আছে ভারতে

ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি

ভারতের সিনেমার বাজার ভারতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রতিবছর ভারতে ২০ টি ভাষায় আনুমানিক ২০০০ এরমত সিনেমা নির্মিত হয়ে থাকে। সিনেমা নির্মান এবং টিকেট বিক্রির দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিনেমা বাজার ভারতের দখলে। তবে আয়ের দিক থেকে হলিউড সবচেয়ে বড়, কারন ভারতের সিনেমার টিকেটের মূল্য অনেক কম। একাধিক ভাষায় সিনেমা নির্মানের কারনে ভারতে একাধিক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আছে।

- Advertisement -

একটা সময় ভারতীয় সিনেমার কথা উঠলে সবার চিন্তায় সবার আগে আসত বলিউডের কথা। মুম্বাই ভিত্তিক এই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রী সবার কাছে স্বপ্নের দুনিয়া। বলিউডের বাইরেও ভারতে আরো অনেকগুলো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রী রয়েছে যেগুলো সাম্প্রতিক সময়ে উপহার দিয়েছে আলোচিত অনেক সিনেমার। ভাষার উপর ভিত্তি করেই এই সিনেমাগুলো আলাদা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে পরিচিত। আজকের এই লিখায় চেষ্ঠা করবো আপনাদের কাছে ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিগুলোর প্রাথমিক পরিচয় তুলে ধরতে।

১। বলিউড
ভারতের অন্যতম বড় এবং জনপ্রিয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। বলিউড নির্মিত সিনেমাগুলো মূলত হিন্দি ভাষায় হয়ে থাকে। ১৯৭০ সালে হিন্দি ভাষায় সিনেমা নির্মান এবং মুক্তি দিয়ে আসছেন বলিউড নির্মাতারা। ভারতের অন্যান্য ভাষার সিনেমার তুলনায় ভারতের বাইরে বলিউডের সিনেমাগুলো বেশি পরিচিত। বলিউডের সেরা নির্মাতাদের মধ্যে রয়েছেন যশ চোপড়া, সুভাষ ঘাই, মাহেশ ভাট, রাজকুমার হিরানি, সঞ্জয় লীলা বানসালি ইত্যাদি।ঐতিহাসিকভাবে বলিউডের সিনেমার একটি বিশাল অংশ জুড়ে থাকে সিনেমার গান।

- Advertisement -

২। টলিউড (কলকাতার সিনেমার সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না)
তেলুগু ভাষায় নির্মিত সিনেমার ইন্ডাস্ট্রি টলিউড নাম পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এবং ব্যবসা সফল সিনেমা ‘বাহুবলী’ তেলুগু সিনেমা ছিলো।এই ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ কয়েকজন মেধাবী নির্মাতা রয়েছেন। শুধু তাই নয় গ্রীনিজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও টলিউডের কিছু নাম রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশী সিনেমার পরিচালক হিসেবে তেলুগু নির্মাতা দাসারি নারায়ন রাও এবং সবচেয়ে বেশি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ব্রম্মানন্দমের নাম রয়েছে।

৩। টলিউড (কলকাতার সিনেমার সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না)
পশ্চিম বাংলা বা কলকাতার সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি টলিউড নামে পরিচিত। এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছেন সত্যজিত রায়, হৃত্বিক ঘটক এবং মৃনাল সেনের মত কালজয়ী নির্মাতারা। সত্যজিত রায় এখন পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় পুরষ্কারে সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার জিতেছেন। টলিউডের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় আরো আছেন মহানায়ক উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেন।

৪। ভোজিউড
ভোজপুরি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ভোজিউড ১৯৬০ সাল থেকে সিনেমা নির্মান করলেও সেটা স্বীকৃত পায় ৮০ এর দশকে। বিশেষ করে হামার ভুজি (১৯৮৩) এবং মাই (১৯৮৯) সিনেমা দুটি এই ইন্ডাস্ট্রিকে স্বীকৃতি এনে দেয়। এরপর বেশ কয়েকটি ব্লকবাষ্টার সিনেমা উপহার দিয়েছেন ভোজিউড নির্মাতারা। পরবর্তীতে বলিউডের তারকা অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, জয়া বচ্চন, হেমা মালিনী এবং অজয় দেবগন ভোজপুরি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। বর্তমানে এই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির মূল্যমান ২০০০ কোটি রুপির মত।

৫। পাহাড়িউড
ডগ্রী ভাষায় নির্মিত সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে বলা হয় পাহাড়িউড। এই ভাষাটি ভারতের উত্তরের দিকে বিশেষ করে জম্মু, হিমাচল প্রদেশ এবং নর্থান পাঞ্জাবের দিকে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভারতের অন্যন্য সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির মত এটা বড় ইন্ডাস্ট্রি নয়। পাহাড়িউডে নির্মিত দিল্লে চ ভাষ্য কোই (২০১১) ভারতের জাতীয় পুরষ্কার জেতা একমাত্র সিনেমা।

৬। ঢলিউড/গলিউড
গুজরাট ভিত্তিক সিনেমা ভারতের আঞ্চলিক সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম। গুজরাটি ভাষায় নির্মিত সিনেমাগুলোর জন্য এই ইন্ডাস্ট্রি ঢলিউড/গলিউড নাম পরিচিত। ১৯৩০ থেকে শুরু করে ২০১১ সল্ পর্যন্ত এই ইন্ডাস্ট্রির মাত্র ২০টি সিনেমা ভারতের ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভে স্থান পেয়েছে। ১৯৩০ এবং ১৯৪০ এর দশকের কোন সিনেমাই এখানে টিকতে পারেনি।

৭। সান্ডালউড
কন্নড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি সান্ডালউড নামে পরিচিত। এই ইন্ডাস্ট্রিকে বক্স অফিসের দিক থেকে পঞ্চম বলা হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত সিনেমা ‘কেজিএফ’ কন্নড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থেকে নির্মিত। কর্নাটকে ১০০০ এরও বেশি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে। এই ভাষার সিনেমার দর্শকদের মাঝে পুনিত রাজকুমারের সিনেমার মুক্তিতে উৎসবের আমেজ দেখা যায়।

৮। মলিউড
মালায়লাম ভাষায় নির্মিত সিনেমার ইন্ডাস্ট্রি মলিউড। ১৯২৮ সালে শুরু হলেও ১৯৫০ পর্যন্ত এই ইন্ডাস্ট্রিতে সিনেমা নির্মান খুব একটা দেখা যায়নি। এরপর কেরালা রাজ্য সরকারের সহায়তার উপর ভিত্তি করে একসময় ঘুরে দাঁড়ায় মলিউড এবং বর্তমানে ভারতের অন্যতম বড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। মলিউডের জনপ্রিয় তারকাদের মধ্যে রয়েছেন মোহনলাল, মাম্মত্তি এবং পৃথ্বীরাজ।

৯। অলিউড
ওড়িয়া সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মূলত কুট্টাক, ওড়িষ্যা রাজ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে নির্মিত প্রথম সিনেমা মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৩৬ সালে। এরপর ১৯৭০ পর্যন্ত অল্প সংখ্যক সিনেমা নির্মিত হয়েছে অলিউড থেকে। এখন পর্যন্ত এই ইন্ডাস্ট্রি আঞ্চলিক সিনেমার ক্যাটাগরিতে ৩৬টি জাতীয় পুরষ্কার অর্জন করেছে।

১০। পলিউড
পাঞ্জাবের এই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ১৯২০ সাল থেকে টিকে আছে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ভারতের প্রথম দিকের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে পলিউড। ভারতের স্বাধীনতা এবং বিভক্তির আগে ভারতের সবচেয়ে উন্নত সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বলা হয়ে থাকে পলিউড। এরপরের দশক এই ইন্ডাস্ট্রি নতুন করে তৈরী হয় এবং বর্তমানে অন্যতম বড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে টিকে আছে।

১১। কলিউড
বর্তমানে বলিউডের পর সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি কলিউড। তামিল ভাষায় নির্মিত সিনেমাগুলো কলিউডের অন্তর্ভুক্ত এবং এই ইন্ডাস্ট্রি তার মেগাষ্টার রজনীকান্তের নামেই পরিচিত। কলিউডের প্রথম নির্বাক সিনেমা ‘কীচকা ভাধাম’ মুক্তি পায় ১৯১৮ সালে এবং প্রথম সবাক সিনেমা ‘কালিদাস’ মুক্তি পায় ১৯৩১ সালে। বর্তমানে রজনীকান্ত ছাড়াও বেশ কয়েকজন সুপারষ্টার কাজ করছেন কলিউডে।

১২। ডেক্কানউড
হায়দ্রাবাদ ভিত্তিক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ডেক্কানউড নামে পরিচিত। হায়দ্রাবাদ, তেলঙ্গা অঞ্চলের ডেক্কানি ভাষা বা হায়দ্রাবাদ উর্দু ভাষাভাষীদের জন্য নির্মিত সিনেমা ডেক্কানউডের অন্তর্ভুক্ত। এই ইন্ডাস্ট্রীটি নতুন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে এই ইন্ডাস্ট্রির সিনেমাকে ভারতের সেন্সর বোর্ড থেকে হিন্দি সিনেমা হিসেবেছাড়পত্র প্রধান করা হত। তবে এখন এই ইন্ডাস্ট্রির সিনেমা তাদের নিজস্ব ভাষা ডাখিনি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

আরো পড়ুনঃ
দক্ষিনের দখলে ভারতীয় সিনেমার বাজার: নিয়মিত নতুন নতুন ঘোষনা
প্রেক্ষাগৃহে ফিরছে বলিউড: একদিনে ছয় সিনেমার মুক্তি ঘোষনা

হোসেন মৌলুদ তেজোhttps://iammoulude.com/
হোসেন মৌলুদ তেজো একজন নিয়মিত ব্লগার যিনি সিনেমা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। সিনেমার পাশাপাশি কবিতা, ছোট গল্প, সমসাময়িক এবং ব্যবসা সম্পর্কিত বিষয়েও লিখে থাকেন। প্রফেশনালী একটি বেসকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি বই পড়ে, সিনেমা দেখে এবং তার একমাত্র ছেলের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ