প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘শত্রু ভয়ংকর’

খোকনের 'শত্রু ভয়ংকর'

১৯৯৩ সাল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভয়াবহ রকমের বাণিজ্যিক সফলতার আর দর্শকদের জন্য মহা আনন্দের একটি বছর। ‘মাস্তান রাজা’, ‘শত্রু ভয়ংকর’, ‘সতর্ক শয়তান’, ‘বাংলার বধু’, ‘চাঁদাবাজ’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘অবুঝ দুটি মন’, ‘অন্তরে অন্তরে’…. এর মতো দারুন সব সিনেমা মুক্তি পেয়েছিলো এই ৯৩ সালেই। বছরটি যে চলচ্চিত্রের ইন্ডাস্ট্রির জন্য দারুণ একটা বছর হবে তার ইঙ্গিত মিলেছিলো বছরের ১ম সপ্তাহে বা ১ম শুক্রবারে। একই দিনে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ চট্টগ্রাম সহ সারাদেশের বড় বড় শহরগুলোতে মুক্তি পেলো ‘ডায়নামিক ডিরেক্টর’ নামে খ্যাত দেওয়ান নজরুলের ‘মাস্তান রাজা’ ও ‘মডার্ণ ডিরেক্টর’ নামে খ্যাত শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘শত্রু ভয়ংকর’ নামে দুটো সিনেমা। একদিকে জসিম, শাবানা, দিতি অমিত হাসান ও আহমেদ শরীফ আর অন্যদিকে সোহেল রানা, শাবানা, রুবেল, সাথী ও হুমায়ুন ফরিদী। আমার মতো দর্শকদের মাথা ঠিক নাই, ১ম দিন কোনটা রেখে কোনটা দেখবো তা ভেবে। কারণ দুটো সিনেমার পরিচালক, কাষ্টিং এর উপর এতোটাই আস্থা যে দুটো সিনেমাই দারুণ হবে নিশ্চিত। হয়েছিলও তাই। দুটো সিনেমাই সুপার ডুপার হিট। মুক্তি পাওয়ার প্রথম দিনেই সিলেটের ‘নন্দিতা’ সিনেমা হল ‘মাস্তান রাজা’ ও মনিকা সিনেমা হল খোকনের ‘শত্রু ভয়ংকর’ প্রদর্শন করতে লাগলো। পুরো সিলেট শহরের প্রধান প্রধান সড়কের দেয়াল জুড়ে ‘মাস্তান রাজা’ ও ‘শত্রু ভয়ংকর’ সিনেমা দুটোর পোষ্টারে সয়লাব। অবশ্য মুক্তির আগেই রেডিওর বিজ্ঞাপন শুনে, টেলিভিশন ও সিনেমা হলের ট্রেলার দেখেই দুটো সিনেমা মাথা নষ্ট করে দিয়েছিলো আমাদের।

- Advertisement -

‘শত্রু ভয়ংকর’ সিনেমার গল্পটি গতানুগতিক পিতৃ হত্যার প্রতিশোধের গল্প কিন্তু তারপরেও দর্শকদের ঢল নেমেছিল ছবিটা দেখতে। মুক্তি পাওয়ার ১ম দিনেই সিলেটের মনিকা সিনেমাহলে বন্ধুদের সাথে ছবিটা দেখতে গিয়ে টিকেট কাটা নিয়ে অন্য দর্শকদের সাথে সংঘর্ষ বেঁধে গিয়েছিল আমাদের। সবশেষে দুই পক্ষই ভুল বুঝাবুঝির অবসান করে শান্ত হয়ে খোকনের ‘শত্রু ভয়ংকর’ ছবিটা দেখতে হলে ঢুকি। একটি বারের জন্য গল্পটিকে গতানুগতিক মনে হয়নি বরং টিকেট কাটা নিয়ে সংঘর্ষ করাটা সার্থক মনে হয়েছিল। ছবির গল্পটা শহিদুল ইসলাম খোকন সাহেব বলেছেন খুবই দারুণ ও আধুনিকভাবে। আল মাসুদের লিখা রহস্য ঘেরা গল্পটা বারবার চমকে দিচ্ছিল। সাথে ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা, কংফু নায়ক রুবেল, বিউটি কুইন শাবানা আর ডেঞ্জারম্যান ফরিদির অভিনয় পুরো সময়টা দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছিল।

ছবির গল্পে ফাঁসীর আসামি ফরিদী জেল থেকে পালিয়ে গেলে পুলিশ তাড়া করে। ফরিদী নিজের আস্তানায় লুকিয়ে গেলে পুলিশ ভুলবশত ফরিদীর জমজ ভাই রজব আলীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। আসল দুর্ধর্ষ খুনী ফরিদী বেঁচে যায় আর তার বদলে ফাঁসি হয় ফরিদীর জমজ ছোট ভাইয়ের। ফরিদী বদলা নিতে ভাইয়ের ফাঁসীর রাতেই বিচারকের বাড়িতে গিয়ে বিচারককে খুন করে যা দেখে ফেলে বিচারকের ছোট ছেলে রুবেল। পরেরদিন পত্রিকায় দুর্ধর্ষ অপরাধী ফরিদীর ছবি সহ ফাঁসীর সংবাদ প্রকাশ পেলে কিশোর রুবেল পত্রিকার ছবি দেখিয়ে সবাইকে বলে এই সেই খুনি কিন্তু কেউই অবুঝ কিশোর রুবেলের কথা বিশ্বাস করে না। এভাবেই সোহেল রানা ও রুবেলের বাবার হত্যার বিচারটা অমীমাংসিত রয়ে যায়।

- Advertisement -

২০ বছর পর সোহেল রানা একজন দুর্ধর্ষ পুলিশ অফিসার ও রুবেল মাত্র পড়ালেখা শেষ করা বেকার এক তরুণ যাকে মায়ের স্নেহ মমতা দিয়ে আগলে রাখে শাবানা। ছবির গল্পটা মোড় নেয় জননেতা রুপি আবুল হায়াতের পিএস হিসেবে রুবেলের চাকরি শুরুর পর থেকে। ২০ বছর ধরে রুবেলের খুঁজতে থাকা বাবার খুনী ফরিদীর বন্ধু আবুল হায়াত যে ছদ্মবেশে সবসময় আবুল হায়াতের সাথে দেখা করে। ফরিদীর ছেলে কবির খাঁ কে পুলিশ গ্রেফতার করলে ছেলেকে ছাড়িয়ে নিতে ছদ্মবেশে ফরিদী সোহেল রানার বাড়িতে দেখা করে, সোহেল রানার মনে সন্দেহ জাগে ফরিদীকে আগে কোথাও দেখেছি বলে। ২০ বছর আগের খুনের মামলার অমীমাংসিত ফাইলটি আবার ওপেন করে সোহেল রানা, শুরু হয় রহস্যের জট খোলা। …..এমনই উত্তেজনায় নিয়ে গিয়েছিল যে আশাপাশে কোন দর্শক তালি দিলেও গালি খেয়েছে মনযোগ নষ্ট করার কারণে। ছবিতে ফরিদির বরফ খণ্ডের উপরে দাঁড় করিয়ে লাল পিঁপড়া দিয়ে মানুষ মারার কৌশলটা নতুনত্ব ছিল। এমনিতেই পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকনের গল্প বলার ধরনটাই আলাদা এবং এক ছবি থেকে আরেক ছবির বেলায় ভিন্নও সেখানে রহস্যভরা গল্পটা পুরোপুরি অন্যরকম লাগছিল। ছবির মাঝে যার জন্য দর্শকদের কান্না পেয়েছে তিনি অন এন্ড অনলি শাবানা আর বাকি সবাই ছিল দুর্ধর্ষ। সিনেমার শেষ প্রান্তে রুবেল ও সাথীর মৃত্যুটা দর্শকদের জন্য ছিলো একেবারেই অপ্রত্যাশিত।

এই সিনেমায় রুবেলের নতুন স্টাইলের আর্মি কাট চুলের ফ্যাশনটা তখন আমাদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।এই ছবি দেখে এক মোটর সাইকেলে ৫ জন নিয়ে চালানোর কৌশল রপ্ত করতে আমার রুবেল ভক্ত বন্ধু শাহিন ও আমারসহ ৪ বন্ধুর হাত পা ছিলে গিয়েছিল। ছবিটা দেখতে মহিলা দর্শকরা যেমন সপরিবারে এসেছিল তেমনি স্কুল কলেজর ছাত্র পরিচয়ধারী অসংখ্য কিশোর তরুণ সিনেমা পাগল নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও এসেছিলো। পরিচালক মহিলা দর্শকদের জন্য যেমন শাবানার ঠোঁটে ‘ও দারোগা সাব/ তোমার প্রেমেরও অভাব’ গানটি রেখেছিলেন তেমনি রুবেল ভক্তদের জন্য রেখেছিলেন ‘আর নয় অস্রের ঝনঝন/ নয় আর ধংসের গর্জন/ শান্তি, শান্তি শান্তি, চাই প্রেমে শান্তি’ শিরোনামের গান রেখে একটি বার্তা দিয়েছিলেন বিনোদনের মাধ্যমে। আজ অনেকেই থ্রিলার অ্যাকশন টাইপের ছবি বানাতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ছাইপাঁশ বানিয়ে ফেলেন। অথচ আজ থেকে ২৭ বছর আগে আমাদের পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন সাহেব থ্রিলার, অ্যাকশন, রোমান্স, ড্রামা সব কিছুর মিশেলে কি দারুণ ভাবে ‘শত্রু ভয়ংকর’ নামে একটি ছবি বানিয়েছিলেন সেটা কেউ জানতেও চায় না, দেখতেও চায় না। অথচ এই ছবি দেখেই শিখতে পারতেন কিভাবে থ্রিলার অ্যাকশন ধাঁচের জমজমাট ছবি বানানো যায়। আজ শহিদুল ইসলাম খোকন সাহেব আমাদের মাঝে নেই তাই কোন পরিচালকের নাম শুনেই ছবি দেখার মতো পরিচালক আজ এই ইন্ডাস্ট্রিতে নেই। চাপাবাজি শুনে হলে গিয়ে দর্শকরা আর কতদিন প্রতারিত হবে?

আরো পড়ুনঃ
বাংলা চলচ্চিত্রের সামাজিক অ্যাকশন ধারার পাঁচ পরিচালকের গল্প
সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘কমান্ডার’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ