শাহরুখ খানের এক দশক: ‘সুপার হিরো’ থেকে ‘জিরো’

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকটা (২০০১ থেকে ২০১০) শাহরুখ খানের দখলেই ছিলো বলা যায়। ২০০৮ সালের শেষে এসে ‘গজিনী’ দিয়ে আমির খান এবং ২০১০ এ এসে ‘দাবাং’ দিয়ে সালমান খানের বলিউড বক্স-অফিসে উত্তানের আগে পর্যন্ত শাহরুখ খানের দখলেই ছিলো বলিউড বক্স-অফিস। আর ওই দশক শাহরুখ শেষ করেছিলেন কারন জোহর পরিচালিত ‘মাই নেম ইজ খান’ সিনেমা দিয়ে। আইপিএল এ পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সুযোগ দেয়ার পক্ষে কথা বলার কারনে ওই সময়ে শিব সেনাদের তোপের মুখে সিনেমাটি। শিব সেনাদের প্রতিরোধ এবং বিক্ষোভের কারনে সিনেমাটির প্রদর্শন বাধাগ্রস্ত হয়। ফলশ্রুতিতে বক্স-অফিসে আশানুরূপ ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয় সিনেমাটি। ভারতীয় বক্স-অফিসে ৭৩ কোটি রুপি আয় করে হিট (বক্স অফিস ইন্ডিয়া) সিনেমার  তকমা পায় ‘মাই নেম ইজ খান’। শুধু তাই নয় ওই বছর এই সিনেমার জন্য সেরা অভিনেতার পুরষ্কারও জেতেন শাহরুখ খান। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক বলিউডে শাহরুখ খানের এক দশক এবং তার বিস্তারিত।

- Advertisement -

একবিংশ শতকের প্রথম দশক পুরষ্কার জয়ের মাধ্যমে শেষ করা শাহরুখ খান নতুন দশক (২০১১ থেকে ২০২০) শুরু করেন নতুন অঙ্গীকার নিয়ে। সেই অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ২০১১ সালে শাহরুখ খান ঘোষনা দেন দুইটি সিনেমার। এরমধ্যে আছে শাহরুখ খানের সবচেয়ে স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘রা ওয়ান’ এবং ফারহান আকতার পরিচালিত ‘ডন ২’। সিনেমা দুটি মুক্তির জন্য শাহরুখ খান বছরের সবচেয়ে বড় তিনটি উৎসবের মধ্যে দুইটি বেছে নেন। দিওয়ালি উপলক্ষে মুক্তি পায় তার প্রযোজনায় সুপার হিরো ভিত্তিক সাইন্স ফিকশন সিনেমা ‘রা ওয়ান’ আর ক্রিসমাস উপলক্ষে মুক্তি পায় ‘ডন ২’। দিওয়ালির উৎসব, বলিউডের সবচেয়ে বড় সুপারস্টারের বিগ বাজেটের সাইন্স-ফিকশন সিনেমা, বছরজুড়ে প্রচারনা, প্রিভিউতে সমালোচদের প্রশংসা সবমিলিয়ে ‘রা ওয়ান’ এর প্রতি প্রত্যাশা আকাশচুম্বী! এই অবস্থায় মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি বক্স-অফিসে করে বাম্পার শুরু। কিন্তু মুক্তির ৩/৪ দিনের মাথায় ধূসর হতে থাকে সিনেমাটি নিয়ে প্রত্যাশার স্ফুলিঙ্গ। দর্শকদের মন জয় করতে ব্যর্থ সিনেমাটি নিয়ে টুইটার জুড়ে শুরু হয় হাসাহাসি আর মিম তৈরির হিড়িক। সবকিছু মিলিয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহেই বক্স-অফিসে মুখ থুবড়ে পরে সিনেমাটি। প্রথম সপ্তাহের বাম্পার ব্যবসার সুবাদে শেষ পর্যন্ত ১১৪ কোটি রুপি আয় করে বক্স অফিসে হিট সিনেমার তকমা পায় ‘রা ওয়ান’। তবে এই আয় কোনভাবেই সিনেমাটির প্রতি প্রত্যাশার প্রতিফলন ছিল না। সিনেমাটির প্রতি শাহরুখ খানের আবেগ এত প্রকট ছিল যে, টুইটারে ‘রা ওয়ান’ নিয়ে মজা করার কারনে একটি পার্টিতে শিরিষ কুন্দর (ফারাহ খানের স্বামী) – কে প্রকাশ্যে থাপ্পড় মেরে বসেন বলিউডের কিং খান।

- Advertisement -

এরপর ওই বছরের ক্রিসমাসে মুক্তি পায় ফারহান আকতার পরিচালিত সিনেমা ‘ডন ২’। অমিতাভ বচ্চনের ‘ডন’ সিনেমার রিমেকে ক্লাইমেক্সে এসে সিনেমার গল্প ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন পরিচালক ফারহান আকতার। তারই ধারাবাহিকতায় ‘ডন’ ফ্রাঞ্চাইজিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান ‘ডন ২’ সিনেমার মাধ্যমে। সমালোচকদের প্রশংসা নিয়ে ক্রিসমাসের সময়ে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি ১০৬ কোটি রুপি আয় করে এবং ‘রা ওয়ান’ এর মত এই সিনেমাটিও বক্স অফিসে হিট তকমা পায়। তবে ফারহান আকতারের অসাধারন নির্মানশৈলীর পাশাপাশি দুর্দান্ত সংলাপে ভরপুর সিনেমাটি প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয়। অনেকেই মনে করেন ‘রা ওয়ান’ সিনেমার নেগেটিভ প্রভাবের কারনে ‘ডন ২’ সিনেমা হলে দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও নতুন দশকের শুরুটা দুইটা হিট সিনেমা দিয়ে করেছিলেন বলিউড বাদশা। আর উল্লেখ্য যে, ‘রা ওয়ান’ সিনেমার স্পেশাল ইফেক্টের জন্য জাতীয় পুরস্কার সহ ওই বছরের সবকটি পুরস্কার জিতে তার প্রতিষ্ঠান রেড চিলিস ভিএফএক্স।

২০১১ সালে দুইটি অ্যাকশন সিনেমার পর ২০১২ সালে শাহরুখ খান আবার ফিরে আসেন তার স্বাছন্দ্যের রোম্যান্টিক সিনেমায়। এই বছরের দিওয়ালিতে মুক্তি যশ রাজ ফিল্মসের ইয়াশ চোপড়া পরিচালিত সিনেমা ‘যাব তাকে হ্যা জান’। লম্বা সময় বিরতি দিয়ে যশ চোপড়ার পরিচালনা, এ আর রহমানের সংগীত, সময়ের জনপ্রিয় দুই নায়িকা ক্যাটরিনা কাইফ এবং আনুশকা শর্মা, দিওয়ালিতে মুক্তি – স্মরণীয় হয়ে থাকার মোট যথেষ্ট উপলক্ষ্য ছিল সিনেমাটির কাছে। কিন্তু মুক্তির আগে একই দিনে অজয় দেবগন অভিনীত ‘সন অফ সর্দার’ সিনেমার মুক্তি নিয়ে জল ঘোলা হয়ে উঠে। যশ রাজ ফিল্মসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে আদালতে মামলা পর্যন্ত করেন অজয় দেবগন। ওই সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযারী জানা গিয়েছিলো যে ”যাব তাকে হ্যা জান’ সিনেমাটির প্রেক্ষাগৃহ নিশ্চিত করার জন্য সালমান খানের ‘এক থা টাইগার’ এবং আমির খানের ‘ধুম ৩’ সিনেমার সাথে এটাকে বান্ডেল করে চুক্তির চেষ্টা করেছিল যশ রাজ ফিল্মস। অন্যদিকে সিনেমাটি মুক্তির কিছুদিন আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সিনেমার কিংবদন্তী পরিচালক যশ চোপড়া। যাইহোক, এতকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত সমান সমান প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিলো সিনেমা দুটি। কিন্তু আগের দুইটি সিনেমার মোট এই সিনেমাও মুক্তির পর দর্শকদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূর্ন করতে পারেনি। বক্স অফিসে মাত্র ১০২ কোটি রুপির ব্যবসা করতে সক্ষম হয়। শাহরুখ খানের সিনেমার প্রতি মানুষের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে যে বিস্তর ফারাক তৈরী হচ্ছে সেটা আরো একবার দৃশ্যমান হতে থাকে সবার কাছে। কারন ইতিমধ্যে ১০০ কোটি রুপি বলিউডে সাধারন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপেক্ষাকৃত অনেক কম জনপ্রিয় তারকাদের সিনেমা নিয়মিত ১০০ কোটি রুপি আয় করছে, তাই স্বভাবতই শাহরুখ খানের মত তারকার সিনেমার প্রতি প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল।

সাধারনত ঈদের উৎসবকে উপলক্ষ্য সিনেমা মুক্তি দিয়ে থাকেন বলিউডের ভাইজান সালমান খান। কিন্তু ২০১৩ সালে সালমান খানের কোন সিনেমা না থাকার কারনে ঈদে নিজের সিনেমা মুক্তির ঘোষনা দেন শাহরুখ খান। ২০১৩ সালের ঈদে মুক্তি পায় রোহিত শেঠি পরিচালিত রোম-কোম সিনেমা ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’। প্রিভিউ থেকেই প্রশংসায় ভাসতে থাকে সিনেমাটি, ফলশ্রুতিতে ঈদের লম্বা ইউকেন্ডে বাম্পার ব্যবসা করে রেকর্ড করে সিনেমাটি। রোহিত শেঠীর বানিজ্যিক সিনেমার ফর্মুলা, দীপিকা পাডুকোনের সাথে শাহরুখ খানের পর্দা রসায়ন – সব মিলিয়ে আরো একবার বক্স-অফিসে নিজের ঝলক দেখান কিং খান।  ২০০৯ সালের আমির খানের ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার ২০২ কোটি রুপির রেকর্ড ভেঙে বলিউডের সবচেয়ে বেশি আয়ের সিনেমা হয় ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’। যদিও বেশি স্থায়ী হয়নি এই রেকর্ড, কয়েক মাসের ব্যবধানে ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ এর রেকর্ড ভঙ্গ করে সবচেয়ে বেশি আয়ের সিনেমার রেকর্ড করে আমির খানের ‘ধুম ৩’। তবুও রোহিত শেঠীর হাত ধরে ২০১৩ সালকে নিজের সৌভাগ্যের বছরে পরিণত করেন বলিউড বাদশা। আর ২০০৮ সালের ‘রাব নে বানাদি জোড়ি’ সিনেমার পর ২০১৩ সালে শাহরুখ খান পেলেন ব্লকবাষ্টার সিনেমার স্বাদ। তবে বানিজ্যিক সফলতা পেলেও সিনেমাটির মান নিয়ে প্রশ্নই থেকে গেছে, কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে বক্স অফিসে সফলতাই মুখ্য হয়ে উঠে সবার কাছে।

একটি সফল বছর শেষ করে শাহরুখ খান ২০১৪ সালে শাহরুখ খান হাত মেলান তার দীর্ঘ দিনের বন্ধু ফারাহ খানের সাথে। এই বছর মুক্তি পায় ফারাহ খান অভিনীত তারকাবহুল সিনেমা ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’। ২০০৭ সালের বর্ষসেরা সিনেমা ‘ওম শান্তি ওম’ সিনেমার পর আরো একবার একসাথে ফারাহ-শাহরুখ-দীপিকা ত্রয়ীর সিনেমা। ২০১৪ সালের শাহরুখ খানের প্রিয় উৎসব দিওয়ালিতে মুক্তি পাওয়ার আগে বেশ আলোচনার জন্ম দেয় সিনেমাটি। মুক্তির পর প্রথম দিন রেকর্ড  পরিমান আয় করে সিনেমাটি। তবে আগের সিনেমাগুলোর মত এই সিনেমা ভালো গল্পের অভাবের কারনে সমালোচিত হয়। প্রথম সপ্তাহে ভালো ব্যবসা করলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রত্যাশা অনুযায়ী দর্শক টানতে ব্যর্থ হয় শাহরুখ খানের নতুন এই সিনেমা। ফলশ্রুতিতে, বক্স অফিসে ১৭৮ কোটি রুপি আয়ের মাধ্যমে সুপার হিট হয় সিনেমাটি। অন্যদিকে সিনেমার মান নিয়ে সমালোচনাতো ছিলই, কিন্তু শাহরুখ খানের জনপ্রিয়তা আর স্টারডামের উপর ভোর করে বানিজ্যিকভাবে উৎরে যেতে সক্ষম হয় ফারাহ খান পরিচালিত এই সিনেমা।

এরপর ২০১৫ সালে শাহরুখ খান আবারও পর্দায় হাজির হন রোহিত শেঠীর সিনেমায়। ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ এর বিশাল সাফল্যের পর রোহিত শেঠীর সিনেমা, দীর্ঘ ৫ বছর পর শাহরুখ-কাজল জুটি, ক্রিসমাসে মুক্তি – সব মিলিয়ে বড় আয়োজনে আসার জন্য প্রস্তুত ছিল ‘দিলওয়ালে’। উল্লেখ্য যে, একই দিনে মুক্তি পায় সঞ্জয়লীলা বানসালি পরিচালিত রনবীর সিং-প্রিয়াংকা-দীপিকা অভিনীত ‘বাজিরাও মাস্তানি’। তবে মুক্তির আগে প্রেক্ষাগৃহ দখলের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিল শাহরুখ খানের ‘দিলওয়ালে’। ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ এর পর আরো একবার শাহরুখ-রোহিত ম্যাজিক দেখতে হুমড়ি পরে দর্শক, কিন্তু আরো একবার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ শাহরুখ খান। সমালোচকদের পাশাপাশি দর্শকরাও মুখ ফিরিয়ে নেন সিনেমা থেকে, যার ফলে মুক্তির তিন দিনের মাথায় দর্শক হারাতে থাকে এই সিনেমা। অন্যদিকে সমালোচক এবং দর্শকদের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠে ‘বাজিরাও মাস্তানি’। দ্বিতীয় সপ্তাহেই তাই প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা এবং আয়ে ধস নামে এই সিনেমার। বানিজ্যিকভাবে ব্যর্থতার পাশাপাশি এই সিনেমার মান নিয়ে সমালোচনা হয় অনেক। এছাড়াও বলিউডের বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী সিনেমাটির বানিজ্যিক ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে পরিচালক রোহিত শেঠীর সাথে মনমালিন্যে জরান বলিউড বাদশা। সেসময় একটি সংবাদ মাধ্যমের সাথে আলাপকালে শাহরুখ খান সিনেমার মানের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি সিনেমায় অভিনবত্ব (novelty) চান তাহলে ফ্যান দেখুন।’ সবার কাছে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েই শুরু হয় শাহরুখ খানের নতুন সিনেমা ‘ফ্যান’ এর প্রচারনা।

সম্ভাবনা দিয়ে শুরু হলো শাহরুখ খানের ২০১৬ সালের যাত্রা। আর এই যাত্রার উপলক্ষ্য ছিল ‘ব্যান্ড বাজা বারাত’ খ্যাত পরিচালক মানিষ শর্মার স্বপ্নের ছবি ‘ফ্যান’। যশ রাজ ফিল্মস প্রযোজিত সিনেমাটির গল্প একজন ফিল্মস্টার এবং তার মত দেখতে তার এক অন্ধ ভক্তকে নিয়ে। গল্পের সেই সুপারষ্টার এবং অন্ধ ভক্ত দুই চরিত্রেই ছিলেন শাহরুখ খান। বলিউডের গতানুগতিক নায়ক-নায়িকা আর নাচে গানে ভরপুর সিনেমার ধরন থেকে ভিন্ন ধারার সিনেমা ‘ফ্যান’ মুক্তি পায় ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে। সিনেমাটি নিয়ে বলিউড প্রেমীদের পাশাপাশি আশাবাদী ছিলেন শাহরুখ খান নিজেও। আইপিএল চলাকালীন সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি প্রথমদিন ভালো ব্যবসা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকে আবারো দর্শক হারাতে থাকে সিনেমাটি। মুক্তির আগে যে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখাচ্ছিলো ‘ফ্যান’, সিনেমার দ্বিতীয় ভাগে এসে সে সম্ভাবনা মুখ থুবড়ে পরে।  শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮৪ কোটি রুপিতে থামে ‘ফ্যান’সিনেমার বক্স অফিস যাত্রা, আর ফলাফল ২০০৪ সালের ‘স্বদেশ’ সিনেমার পর প্রথমবারের মত শাহরুখ খানের ফ্লপ সিনেমা দেখল বলিউড।

২০১৭ সালটা শাহরুখ খানের শুরু হয় আলোচনা সমালোচনা দিয়ে। বছরের শুরুতে শাহরুখ খান অভিনীত ‘রাইস’ সিনেমা নিয়ে এর সূত্রপাত। ‘রাইস’ সিনেমার মুক্তির তারিখ ঘোষনার আগেই রাকেশ রোশন ঘোষনা করেছিলেন ২৫শে জানুয়ারি মুক্তি পাবে সঞ্জয় গুপ্ত পরিচালিত হৃত্বিক অভিনীত ‘কাবিল’ সিনেমা। পরবর্তীতে, ‘রাইস’ প্রযোজক ফারহান আকতার একই দিনে শাহরুখ খান অভিনীত সিনেমাটি মুক্তির তারিখ ঘোষনা করলে শুরু হয় এই বিতর্ক। অবশেষে একই দিনে মুক্তির মাধ্যমে বক্স অফিসের লড়াইয়ে নামেন সময়ের বড় দুই তারকা শাহরুখ খান এবং হৃত্বিক রোশন। আরো একটি অ্যাকশন নির্ভর সিনেমায় শাহরুখের উপস্থিতি দর্শকের মধ্যে আগ্রহের তৈরী করে। তবে বড় দুইটি সিনেমার একই দিনে মুক্তি দুইটি সিনেমাকেই সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত করে। শেষ পর্যন্ত ১২৯ কোটি রুপি আয় করে সেমি-হিট হয় সিনেমাটি।

২০১৭ সালের শুরুতে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রাইস’ সিনেমার ফলাফল বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা গেলেও একই বছরের পরের সিনেমাটি শাহরুখ খানের ক্যারিয়ারের একটা কালো অধ্যায় বলা চলে। ওই বছর শাহরুখ খানের মুক্তিপ্রাপ্ত দ্বিতীয় সিনেমা ‘যাব হ্যারি মেট সেজাল’। ইমতিয়াজ আলী পরিচালিত এই সিনেমাটির সাথে নিজের নাম যুক্ত করার যৌক্তিকতা শাহরুখ খান নিজেও জানেন কিনা জানিনা। ‘যাব উই মেট’ বা ‘রকস্টার’ সিনেমা দিয়ে সীমিত একটা দর্শক মহলের কাছে গ্রহযোগ্যতা পেলেও সর্বমহলের দর্শকদের সাথে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ ছিলেন ইমতিয়াজ আলী। কিন্তু শাহরুখ খানের সাথে এই সিনেমায় সেই সীমিত দর্শকদের প্রত্যাশাও পূরণ করতে পারেননি ইমতিয়াজ আলী। আরো একটি নিম্নমানের চিত্রনাট্য বাছাইয়ের কারনে দর্শক থেকে শুরু করে বলিউড সংশ্লিষ্ট সবার সমালোচনার মুখে পড়েন শাহরুখ খান। ফলশ্রুতিতে স্টারডম অর্জনের পর শাহরুখ খানের সবচেয়ে নিম্নমানের সিনেমা ‘যাব হ্যারি মেট সেজাল’।

দুঃস্বপ্নের ২০১৭ শেষ করে শারুখ খান শুরু করেন আলোচিত পরিচালক আনন্দ এল রাই পরিচালিত সিনেমা ‘জিরো’। এর আগে এই পরিচালক ‘রঞ্জনা’ তনু ওয়েডস মনু’ এবং ‘তনু ওয়েডস মনু রিটার্নস’ এর মত সিনেমা দিয়ে দর্শক এবং সমালোচকদের কাছে একটি প্রিয় নাম। এছাড়া ‘জিরো’ সিনেমার বিষয়বস্তুর কারনে সিনেমাটি ছিল সর্বমহলে আলোচিত। এই সিনেমায় শাহরুখ খান একজন বামনের চরিত্রে অভিনয় করেন। সিনেমাটি নিয়ে কিছু বলার আগে এ প্রসঙ্গে বলিউডের  একজন পরিচালকের একটা টুইট আমি উল্লেখ করতে চাই। ‘জিরো’ সিনেমাতে শাহরুখ খানের বামন চরিত্রে অভিনয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষনার পর পরিচালক রাম  গোপাল ভার্মা এক টুইটে লিখেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি যে শাহরুখ খানের পরিণতি কমল হাসানের মত না হয়ে যায়। কমল হাসান যেমন বামন, বোবা, অন্ধ – এরকম চরিত্রে অভিনয় করে রজনীকান্তের কাছে স্টারডম হারিয়েছেন, তেমনি শাহরুখ খানও বামন চরিত্রে অভিনয় করে সালমান খানের কাছে তার স্টারডম হারাবেন।’ মজার ব্যাপার হচ্ছে ‘জিরো’ সিনেমাটি মুক্তির পর রাম গোপাল ভার্মার কথাটা ধ্রুব সত্যের মত সামনে আসে।

‘জিরো’র ট্রেলার মুক্তির পর সবার প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয় এবং সিনেমার প্রতি সবার প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যায়। সিনেমাটিতে শাহরুখ খানের সাথে অভিনয় করেন আনুশকা শর্মা এবং ক্যাটরিনা কাইফ। ২০১৮ সালের ক্রিসমাসে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাও বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রথম সপ্তাহে কিছুটা ব্যবসা করলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে রোহিত শেঠি পরিচালিত রনবীর সিং অভিনীত ‘সিম্বা’ মুক্তির পর প্রেক্ষাগৃহ থেকে অনেকটা উদাও হয়ে যায় ‘জিরো’। অন্যদিকে ‘সিম্বা’ দুর্দান্ত ব্যবসা করে এবং বক্স অফিসে ব্লকবাষ্টার হয়। আর আগের ধারাবহিকতায় শাহরুখ খানের বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘জিরো’ বক্স অফিসে ফ্লপ সিনেমার খাতায় নাম লিখায়।

শুধু সিনেমার বানিজ্যিক সাফল্য নয়, সিনেমার মান বিবেচনায়ও সমসাময়িকদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিলেন শাহরুখ খান। এই সময়ে সালমান খান এবং আমির খান ছাড়িয়ে গেছেন নিজেদের। সিনেমার মান এবং বানিজ্যিক সাফল্য বিবেচনায় নিজেদের নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। অন্যদিকে শাহরুখ খান বার বার খোঁজে ফিরেছেন নিজেকে। শুধু সালমান বা আমির খান নয়, অক্ষয় কুমারও নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। গল্প আর বিষয়বস্তু নির্ভর সিনেমার মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন দর্শক এবং নির্মাতাদের কাছে অন্যতম নির্ভরযোগ্য নাম। সেই তুলনায় বিগত ১০ বছরে অন্যদের সাথে শাহরুখ খানের দূরত্ব যোজন যোজন দূর। সালমান, আমির এবং অক্ষয়ের পাশাপাশি উত্থান হয়েছে রনবীর কাপুর, রনবীর সিং, বরুন ধাওয়ান এর মত তারকাদের যারা নিয়মিত দিয়েছেন ব্যবসা সফল সিনেমা।

‘জিরো’ সিনেমার ব্যর্থতা শাহরুখ খানকে অনেকটাই স্থবির করে দেয়, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। হয়তো একারনেই হাতে থাকা ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’ সিনেমাটি তিনি ছেড়ে দেন। দুই বছর নতুন কোন সিনেমার ঘোষনা বা ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি তার কাছ থেকে। শুধু তাই নয়, স্বভাব বিরুদ্ধো বলিউডের পার্টি, এওয়ার্ড অনুষ্ঠান সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে চলতে থাকেন এই তারকা। এই সময়ে রাজকুমার হিরানি থেকে শুরু করে দক্ষিনের পরিচালক এটলি কুমার, রাজ ডিকে, মধুর ভান্ডারকর এরকম অসংখ্য সিনেমার সাথে শাহরুখ খানের নাম শোনা গেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী শাহরুখ খান যশ রাজ ফিল্মসের সিদ্ধার্ত আনন্দ পরিচালিত ‘পাঠান’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় ফিরছেন। যদিও এখন পর্যন্ত সিনেমাটির ব্যাপারে কোন আনুষ্ঠানিক আসেনি কোন পক্ষ্য থেকে ‘পাঠান’ সিনেমা অনেকটাই নিশ্চিত। এছাড়া সম্প্রতি ভক্তদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা ভিডিওতে শাহরুখ খান এই বছরে বড় পর্দায় দেখা হচ্ছে বলে জানান। ‘পাঠান’ নিয়ে চলমান আলোচনা এবং শাহরুখ খানের ভিডিও বার্তা – দুই দুইয়ে একসাথে করলে এই বছরে শাহরুখ খানের সিনেমা মুক্তি অনেকটাই নিশ্চিত। যদি তাই হয় তাহলে, ভুলে যাওয়ার মত একটা দশক পিছনে ফেলে দুই বছরের বিরতি শেষে নতুন দশক শুরু করবেন বলিউড বাদশা।

এখন অপেক্ষা শুধু শাহরুখ খানের বড় পর্দায় ফেরার। এছাড়া কিছুদিন আগেই তিনি শুরু করেছেন তামিলের জনপ্রিয় নির্মাতা এটলি কুমার পরিচালিত নতুন সিনেমার কাজ। অ্যাকশন থ্রিলার গল্পের এই সিনেমাটিতে শাহরুখ খানকে দেখা যাবে দ্বৈত চরিত্রে। সিনেমাটিতে তার সাথে অভিনয় করছেন দক্ষিণের লেডি সুপারস্টার নয়নতারা এবং প্রিয়ামনি। এরপর বলিউড বাদশাকে দেখা যাবে রাজকুমার হিরানি পরিচালিত নতুন সিনেমায়। ‘পাঠান’ সিনেমার মাধ্যমে নিজেস্ব রূপে আবারও ফিরবেন কিং খান, আরো একবার বড় পর্দায় ঝলক দেখাবে শাহরুখ খানের ক্যারিশমা। দুই হাত প্রসারিত করে ভালোবাসা ছাড়ানো শাহরুখ খানকে দুই হাত ভরে অর্জন উপহার দিবে বলিউড – এমনটাই প্রত্যাশা।

আরো পড়ুনঃ
বলিউডের তিন খানের দুই দশকঃ অভিনেতা ও সুপারস্টার আমির খান (প্রথম পর্ব)
বলিউডের তিন খানের দুই দশকঃ অভিনেতা ও সুপারস্টার আমির খান (দ্বিতীয় পর্ব)

হোসেন মৌলুদ তেজোhttps://iammoulude.com/
হোসেন মৌলুদ তেজো একজন নিয়মিত ব্লগার যিনি সিনেমা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। সিনেমার পাশাপাশি কবিতা, ছোট গল্প, সমসাময়িক এবং ব্যবসা সম্পর্কিত বিষয়েও লিখে থাকেন। প্রফেশনালী একটি বেসকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি বই পড়ে, সিনেমা দেখে এবং তার একমাত্র ছেলের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ