লড়াকু নায়ক রুবেল: বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য এক অ্যাকশন হিরো’র গল্প

লড়াকু নায়ক রুবেল

চলচ্চিত্রের নায়ক রুবেল। পুরো নাম মাসুম পারভেজ রুবেল। ৮০র দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০ দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের নিয়মিত দর্শকদের কাছে এক অতি জনপ্রিয় তারকার নাম রুবেল। পুরো দেড় দশকে রুবেল ছিলেন একমাত্র নায়ক যার কোন ছবি ফ্লপ বা ব্যবসায়িক ভাবে ব্যর্থ হয়নি। কারন রুবেল ছিলেন তখনকার সময়ের গতানুগতিক অ্যাকশন ছবিগুলোর নায়কদের মাঝে সম্পূর্ণ আলাদা। যিনি প্রতিটি ছবিতে মারামারি করতেন খালি হাতে। যার কোন বন্দুক, গুলির প্রয়োজন ছিল না। তার কাছে যা ছিল তা অন্য কোন নায়কদের কাছে ছিল না। একমাত্র বাংলাদেশের দর্শকরা তা পেতো হলিউডের ব্রুস্লির ছবিতে। হ্যাঁ, রুবেল ছিল মার্শাল আর্টে পারদর্শী একজন নায়ক যার ছবিতে থাকতো নিত্য নতুন মারামারির কৌশল। কখনও শুন্য উঠে দুই পা মেলে খেজুর গাছে ঝুলন্ত কলসি ভেঙ্গে দিতেন। কখনও শুন্য লাফিয়ে একসাথে চারজনকে একটি লাথি দিয়ে ধরাশায়ি করে দিতেন। আর দর্শক বিস্ময়ে দেখতো যে আমাদের নায়করাও পারে ব্রুস্লির মতো কংফু যা তখনও বলিউডের ছবিতেও দেখা যেতো না।

- Advertisement -

১৯৫৯ সালে জন্মগ্রহন করা মাসুম পারভেজ রুবেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সময় বড় ভাই মাসুদ পারভেজ ওরফে সোহেল রানা প্রযোজিত ও শহিদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘লড়াকু’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আগমন করেন। প্রথম ছবিতেই বাংলাদেশের দর্শকদের বাজিমাৎ করে দেন রুবেল তাঁর মার্শাল আর্ট এর কলাকৌশল দেখিয়ে। সেই থেকে শুরু বাংলা চলচ্চিত্রে একটি ‘রুবেল’ অধ্যায়ের। এরপর ‘উদ্ধার’, ‘বীরপুরুষ’, ‘বজ্রমুস্ঠি’, ‘মারকশা’ ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য দিয়ে তৎকালীন সময়ের সকল প্রযোজক ও পরিচালকের নজরে পড়েন। কিন্তু তখনও খোকন ও মাসুদ পারভেজ ছাড়া অন্য কেউই মার্শাল আর্ট ভিত্তিক ছবি নির্মাণ করতে সাহস পেতেন না। এই সময় এগিয়ে আসেন পরিচালক আহমেদ সাত্তার ‘হুংকার’ ও ‘বীর বিক্রম’ ও আবুল খায়ের বুলবুল ‘আমি শাহেনশাহ’ ছবি নির্মাণ করেন। দুই পরিচালকও রুবেলকে দিয়ে সাফল্য পেলেন। এরপর একে একে মুক্তি পেতে লাগলো ‘বিষদাঁত’, ‘বজ্রপাত’ ‘অকর্মা’ ‘ইনকিলাব’ ‘আজাদ’ ‘উত্থান পতন’ ‘সন্ত্রাস’ ‘শেষ আঘাত’ ‘দেশ দুশমন’ ‘অর্জন’ ‘লাওয়ারিশ’ ছবিগুলো। প্রত্যেকটি ছবিই বক্স অফিসে সাফল্য পেলে রুবেলের চাহিদা বেড়ে যায়।

অন্যদিকে খোকনের সেই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বললেই চলে। কারন রুবেল ছাড়া সেই সময়ে একমাত্র ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম ছাড়া কোন নায়কই মার্শাল আর্ট জানতো না। ফলে সিনেমা মুক্তির দিক দিয়ে সেই সময় রুবেলের ছবি একটির পর একটি আসতেই থাকে। এমনও অনেক সপ্তাহ গেছে যে নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত দুটি ছবির নায়কই থাকতেন রুবেল। ফলে একে একে মুক্তি পেতো লাগলো মা মাটি দেশ, গোলামির জিঞ্জির, অধিনায়ক, বীরযোদ্ধা, অন্যায় অত্যাচার, মালামাল, আন, ওমর আকবর, রুবেল আমার নাম, মহাগুরু, মিন্টু সম্রাট, লড়াই, সম্পর্ক, মহাশত্রু, মৃত্যুদণ্ড, মায়ের কান্না, টপ রংবাজ, চোখের পানি , জ্বলন্ত আগুন, ট্রাক ড্রাইভার, বিক্রম, ডন নামক একেকটি মারমার কাটকাট ছবি আর আমরা হুমড়ি খেতাম সিনেমা হলে। তখন আমাদের কাছে রুবেল মানেই দুর্দান্ত অ্যাকশন ছবির মহানায়ক। টেলিভিশনের পর্দায় বিজ্ঞাপনের সময় খেয়াল রাখতাম রুবেলের কোন নতুন ছবির ট্রেলার দেখাচ্ছে কিনা। স্কুল থেকে ফিরে রেডিওতে কান পেতে থাকতাম রুবেলের কোন নতুন ছবির বিশেষ অনুষ্ঠান দিচ্ছে কিনা গাজি মাজহারুল ইসলামের কণ্ঠে। আমাদের হাঁটা চলার সময় সবসময় রুবেলের মতো বডিল্যাংগুয়েজ থাকতো যেন সব সময় প্রস্তুত ঢিসুম ঢিসুম করার জন্য।

- Advertisement -

নায়ক রুবেল

সেই সময়ে সিলেটের ‘মনিকা সিনেমা’ (বর্তমানে হলটি নেই) হল সবার কাছে আলাদা পরিচিত পেয়েছিল রুবেলের ছবিগুলো প্রদর্শনীর কারনে। রুবেলের নতুন ছবি মুক্তি পাওয়া মানেই মনিকায় আসবে। কারন সেই সময়ে রুবেলের সবগুলো ছবি একমাত্র মনিকা সিনেমা মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে প্রদর্শনী করতো। মনিকার ব্যবসায়িক সাফল্য দেখে পরবর্তীতে অন্যান্য হলগুলোও রুবেলের ছবি প্রদর্শনীর জন্য প্রতিযোগিতা করতো। পরবর্তীতে নন্দিতা ও লালকুঠি সিনেমা রুবেলের নতুন ছবিগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ জে রানার ‘মহাগুরু’ ছবির আগে রুবেলের অন্য কোন সিনেমা আমি মনিকা ছাড়া দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।

রুবেল এমনই এক অভিনেতা ছিলেন যার ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত স্বপন চৌধুরীর ‘বন্ধু বেঈমান’ ছবি ছাড়া অন্য কোন ছবি সুপার ফ্লপ বা মূলধন তুলতে পারে নাই এমনটি জানা নেই। প্রতিটি ছবিটি দেখেছি হাউসফুল দর্শক। এমনকি যেসব ছবি অন্য কোন নায়ক থাকলে সাধারন মূলধন না তোলার ঝুঁকিতে পড়তো নিশ্চিত সেধরনের ছবিগুলো পর্যন্ত অনায়াসে রুবেলের কারনে মূলধন ফেরত পেতো। অর্থাৎ প্রযোজক পরিচালকদের কাছে রুবেল একটি আস্থার প্রতিক হয়ে গিয়েছিলেন যার ছবি মানেই মূলধন ফেরত আসার নিশ্চয়তা। ৯১ তে যখন নাইম শাবনাজ জুটি, কাঞ্চন –দিতি , মান্না চম্পা জুটি তুঙ্গে তখনও রুবেল একের পর এক ছবি দিয়ে সবাইকে একা টেক্কা দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় মুক্তি পায় গোলাবারুদ, বীরযোদ্ধা, সম্পর্ক, অপহরন, ঘরের শত্রু, শত্রু ঘায়েল, রক্ত নিশান, সতর্ক শয়তান, মীরজাফর, গোয়েন্দা, জ্বলন্ত বারুদ, শত্রু ভয়ংকর ছবিগুলো। এরপর সালমান –সানীর যুগেও রুবেল ছিলেন সমান জনপ্রিয় ও তাঁর ধারায় একক অধিপতি। অর্থাৎ কেউই রুবেলের ছবি থেকে দর্শকদের ফেরাতে পারেনি।

রুবেল শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না সেই শুরু থেকেই তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি ফাইট ডাইরেক্টর হিসেবেও সফল ছিলেন। তাঁর সবগুলো ছবিতেই নিজস্ব ফাইটিং গ্রুপ ‘ দ্যা একশন ও্যারিয়রস’ নামে একটি ফাইটিং গ্রুপ ছিল। বলতে গেলে সেই সময়ে বাংলাদেশে মার্শাল আর্ট কে জনপ্রিয় করে তুলেন রুবেল। যার ফলে তখন অনেক কিশোর তরুন মার্শাল আর্ট শিখতে উৎসাহী হয়। রুবেল তাঁর বিভিন্ন ছবিতে মার্শাল আর্ট এর ভিন্ন ভিন্ন নতুন কলাকৌশল উপস্থাপন করতেন। যার মধ্য ‘ড্রাংকিং কংফু’ (শত্রু সাবধান), উইপিং কংফু (বাঘের থাবা), ড্যান্সিং কংফু (ভণ্ড), ব্লাইনড কংফু (চারিদিকে শত্রু) সহ দুর্দান্ত সব কলাকৌশল উপস্থাপন করেন।

লড়াকু নায়ক রুবেল

প্রায় ২০০ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেন রুবেল যার মধ্য দেশের প্রবীণ খ্যাতিমান পরিচালক যেমন আছেন তেমনি আছেন একেবারে নতুন পরিচালক। যেসব পরিচালকদের সাথে কাজ করেছেন তাদের মধ্য উল্লেখযোগ্য ছিলেন শহিদুল ইসলাম খোকন, মাসুদ পারভেজ, আহমেদ সাত্তার, আবুল খায়ের বুলবুল, শিবলি সাদিক, মালেক আফসারি, রানা নাসের, ফজল আহমেদ বেনজীর, দেওয়ান নজরুল, কমল সরকার, এ জে রানা, এম এ মালেক, জিয়াউদ্দিন মাসুদ, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, স্বপন চৌধুরী, সোহানুর রহমান সোহান, জিল্লুর রহমান, গাজী জাহাঙ্গীর, কামারুজ্জামান, রায়হান মুজিব, জীবন চৌধুরী, সিদ্দিক জামাল নানটু, দেলোয়ার জাহান ঝনটু, তোজাম্মেল হক বকুল, শামসুদ্দিন টগর, মমতাজুর রহমান আকবর, ইস্পাহানি আরিফ জাহান, এনায়েত করিম, নাদিম মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান বাবু, শাহাদত হোসেন লিটন, শাহিন সুমন প্রমুখ। ৯০ দশকের একেবারে শেষের দিকে রুবেল নিজে প্রযোজনা ও পরিচালনায় নামেন। তাঁর প্রযোজিত ও পরিচালিত ছবিগুলো হচ্ছে বিচ্ছু বাহিনী, মায়ের জন্য যুদ্ধ, প্রবেশ নিষেধ, বাঘে বাঘে লড়াই, টর্নেডো কামাল, বিষাক্ত চোখ, রক্ত পিপাসা, সিটি রংবাজ, খুনের পরিণাম, অন্ধকারে চিতা, চারিদিকে অন্ধকার। এই পর্যন্ত তিনি ৫০ জনেরও বেশি অভিনেত্রীর সঙ্গে জুটি বেঁধে ছিলেন তাঁর মধ্য কবিতা ও পপি হচ্ছেন সর্বাধিক ছবির নায়িকা। রুবেলের অন্যান্য নায়িকারা হলেন রানী, জিনাত, শতাব্দী রায় (কলকাতা), সন্ধ্যা, চম্পা, সাথী, মিশেলা, সুচরিতা, পরী, দিতি, একা, মৌসুমি, অরুনা বিশ্বাস, লিমা, নন্দিনী, শিল্পী, তামান্না, সিমলা, কেয়া, সোনিয়া, শাহনাজ, শাহনূর প্রমুখ।

রুবেলের আরেকটি পরিচয় হচ্ছে তিনি বাংলাদেশ ক্যারাতে ফাউন্ডেশন এর পরিচালক এবং তিনি দুই বার জাতীয় ক্যারাতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে রুবেল চিরদিন উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হয়ে থাকবেন এবং ইতিহাসে সর্বকালের সেরাদের তালিকায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

আরো পড়ুনঃ
বাংলার নায়ক সালমান শাহ: বাংলা চলচ্চিত্রের এক ক্ষণজন্মা ধুমকেতু (প্রথম পর্ব)
মহানায়ক মান্নাঃ নব্বই দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের এক ‘তেজি পুরুষ’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ