ফেসবুক স্টারদের যুগে শাকিব খানই ঢালিউডের শেষ সত্যিকার সুপারস্টার

ঢালিউডের শেষ সত্যিকার সুপারস্টার

মূল আলোচনার যাওয়ার আগে ‘সুপারস্টার’ ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে নিতে চাই। প্রেক্ষির বিবেচনায় সাম্প্রতিক সময়ে অভিনেতা এবং অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে সুপারস্টার সবচেয়ে বেশী অপব্যবহার করা শব্দে পরিণত হয়েছে। কারন বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মিডিয়ার কল্যানে সবাই সুপারস্টার। ক্যারিয়ারে এক বা দুটি নামমাত্র আলোচিত সিনেমা উপহার দেয়া তারকারা নিজেদের সুপারস্টার ভাবতে শুরু করেন। শুধু তাই নয় নিজেদের ফেসবুক পেজে লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার দিয়েও অনেকে সুপারস্টারের ভাব নিয়ে চলেন। আদতে তাদের নিজেদের স্টার বলার যোগ্যতাও আছে কিনা সেটা আলোচনার বিষয়।

- Advertisement -

প্রশ্ন আসে সুপারস্টার শব্দের মানে কি? আসলে সুপারস্টার বলতে আমরা কি বোঝি? ভাবার্থ বিবেচনায় স্টার এমন কেউ যাকে সিনেমার দর্শকরা যথেষ্ট পছন্দ করেন এবং দর্শকরা তাদের দেখতে চায়। আর সুপারস্টার হচ্ছেন তাদের মধ্যকার এমন একজন যাকে পর্দায় দেখার জন্য তার ভক্ত এবং সিনেমাপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। নিজেদের কষ্টে অর্জিত অর্থ যাদের জন্য লুটিয়ে দিতে দ্বিধা করেন না। কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় আর নামমাত্র সংবাদ মাধ্যমের সাথে কথা বললে যেমন সুপারস্টার হওয়া যায়না তেমনি নিজের টাকায় সিনেমা বানিয়ে সেখান থেকে পারিশ্রমিক নিয়ে গায়ের জোরে সুপারস্টার হওয়া যায়না।

ঢালিউড তথা বাংলা সিনেমায় সুপারস্টারের ইতিহাস মোটেও ছোট নয়। দেশীয় সিনেমা এখন পর্যন্ত অনেক সুপারস্টার দেখেছে। রাজ্জাক, আলমগীর, উজ্জ্বল থেকে শুরু করে রুবেল, মান্না, সালমান শাহ, রিয়াজ বিভিন্ন সময়ে তাদের তারকাখ্যাতি দিয়ে মাত করেছেন ঢালিউড। এই তারকাদের নিয়ে সিনেমা নির্মানের জন্য প্রযোজকরা যেমন টাকা নিয়ে তৈরি থাকতেন তেমনি দর্শকরাও অপেক্ষায় থাকতেন প্রিয় তারকার সিনেমার জন্য। আর প্রেক্ষাগৃহে নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেও সবাই হুমড়ি খেয়ে পরতেন সিনেমা দেখতে। এটাই একজন সত্যিকার সুপারস্টারের সবচেয়ে বড় পরিচয়। বিরামহীন ভাবে একের পর এক সিনেমা উপহার দিয়ে দর্শকদের বিনোদন দেয়ার পাশাপাশি নির্মাতাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন এই সুপারস্টাররা।

- Advertisement -

এবার শাকিব খান প্রসঙ্গে ফেরা যাক। দেশীয় সিনেমায় শাকিব খানের ক্যারিয়ার ২৩ বছরের। ক্যারিয়ারের দুই যুগের মধ্যে ঢালিউডে রাজত্ব করেছেন ১৫ বছরের বেশী সময় ধরে। একজন সুপারস্টার হিসেবে অনেকটাই এককভাবে ইন্ডাস্ট্রিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই তারকা। নির্মাতাদে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় আস্থা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সময়ের সবচেয়ে বড় এই তারকা। তার সিনেমা মানেই দর্শকদের উৎসবের উপলক্ষ্য। এমনও সময় গিয়েছে যখন ঈদের শাকিব খানের তিন/চারটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। নির্মাতারাও বসে থাকতেন শাকিব খানের শিডিউলের অপেক্ষায়।

এখানে দুটি বিষয় একটু আলাদাভাবে আলোচনা করতে চাই। অনেকেই বলে থাকেন নায়ক মান্নার মৃত্যুর কারনে দেশীয় সিনেমায় শাকিব খানের উত্তান হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা কিন্তু তা বলে না। বাংলা সিনেমার সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রনায়ক মান্না মারা গিয়েছিনে ২০০৮ সালে। কিন্তু সে সময়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ঢালিউডের বক্স অফিস প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মান্নার মৃত্যুর অনেক আগেই শাকিব খান নিজেকে শীর্ষ তারকাদের ইঁদুর দৌড়ে শামিল করেছিলেন।

- Advertisement -

উদাহরণ স্বরূপ ২০০৬ সালে ঢালিউডের ব্যবসা সফল সিনেমার তালিকা নিয়ে আলোচনা করা যায়। এই বছরেই শাকিব খান নিজেকে ঢালিউডের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ২০০৬ সালের শীর্ষ ১০টি ব্যবসা সফল সিনেমার মধ্যে ৭টি সিনেমায় ছিলেন শাকিব খান। আর শীর্ষ ১০টি সিনেমার মধ্যে প্রথম চারটি সিনেমার অভিনেতা ছিলেন শাকিব খান। সেবছর মান্না অভিনীত সিনেমাগুলোকে খুব সহজেই পিছনে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। আমি বলছি না এর মাধ্যমে মান্নার চেয়ে বড় তারকা হয়ে গিয়েছিলেন শাকিব। কিন্তু এটা নিশ্চিত ভাবে প্রমাণ করে যে মান্না থাকাকালীন সময়েই শাকিব খানের রাজত্ব শুরু হয়েছিলো।

দেশীয় সিনেমার ইতিহাসে এর পরের গল্পটা শাকিবময়। রুবেল, রিয়াজ, ফেরদৌসের মত তারকারা সিনেমায় সক্রিয় থাকার পরও দর্শক এবং নির্মাতাদের কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত নাম ছিলেন শাকিব খান। এরপরের বছরগুলোতেও মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার মাধ্যমে নিজের সেই অবস্থান আরো শক্তিশালী করেছেন শাকিব খান। যার ফলশ্রুতিতে সে সময়ের শীর্ষ অভিনেত্রী শাবনুর থেকে শুরু করে নতুন অভিনেত্রীদের সাথে ক্রমাগত কাজ করে গেছেন তিনি। বিশেষ করে শানুরের সাথে একটি গ্রহণযোগ্য এবং নির্ভরশীল জুটি গড়ে তুলেছিলেন এই তারকা।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় সিনেমার খারাপ অবস্থা এবং ধারাবাহিক হারে প্রেক্ষাগৃহ কমে যাওয়ার জন্য অনেকে শাকিব খানকে দায়ী করে থাকেন। কিন্তু এখানে একটি বিষয় বিবেচনা করাটা খুবই জুরুরি, সেটা হচ্ছে শাকিব খান ছাড়া অন্য কোন তারকার উপর নির্মাতারা কেন ভরসা করতে পারেননি? কেন নতুন কোন তারকা শাকিব খানের মত নিজস্ব একটি ভক্ত অনুরাগী দল তৈরি করতে পারলেন না? কেন শাকিব খানের পুরাতন সিনেমা প্রদর্শন করেই বছরের পর বছর নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়েছে প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের। উত্তর সম্ভবত একটি – কারন শাকিব খানের পর আর কেউই নিজেকে সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন নি অথবা এরপর আর কাউকে দর্শক সে আসনে বসতে দেয়নি!

শাকিব খানের পর অনেক চিত্রনায়কের আবির্ভাব হয়েছে ঢাকাই সিনেমায়। এর মধ্যে কয়েকজন কিছু সিনেমার মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিতে সক্ষম হলেও সেই অর্থে সুপারস্টার হয়ে উঠতে পারেননি। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ভক্তরা তাদের সুপারস্টার আখ্যা দিয়ে শাকিব খানের সাথে তুলনা করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে শাকিব খানের ‘স্টারডাম’ বা ‘তারকাখ্যাতি’র সাথে তাদের তুলনা শাকিব খানের প্রতি অন্যায়। মফস্বলের একক স্ক্রিনের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে শাকিব খানকে নিয়ে দর্শকদের যে উম্মাদনা, এই ফেসবুক স্টারদের ক্ষেত্রে তার ছিটাফোঁটাও দেখা যায়না।

এবার আসি ঢালিউডের শেষ সত্যিকার সুপারস্টার হিসেবে শাকিব খানের কথা। হলিউডের সিনেমা থেকে স্টারডাম ব্যাপারটি হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। সিনেমার প্লট, গল্প এবং চিত্রনাট্যের উপর এখন নির্ভর করে সিনেমার গ্রহণযোগ্যতা। সেই ধারা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে বলিউডের সিনেমার ক্ষেত্রে। আমাদের দেশীয় সিনেমাও হাঁটছে সে পথে। বিগত এক যুগের বেশী সময় ধরে ঢালিউডে শাকিব খান যে তারকাখ্যাতি উপভোগ করেছেন সেটা আর কোন তারকার ক্ষেত্রে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। শাকিব খানের গ্রহণযোগ্যতার একটিই সিমাদ্ধতা ছিলো, সেটা হচ্ছে মাল্টিপ্লেক্স দর্শকদের কাছে তার সিনেমার জনপ্রিয়তা।

২০১৬ সালে ‘শিকারি’ সিনেমার মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতাটাও অতিক্রম করে গেছেন শাকিব খান। এফডিসি কেন্দ্রিক নির্মাতাদের সিনেমায় শাকিব খানকে যেভাবে উপস্থাপন করা হত, সেটা যে নির্মাতাদের ব্যর্থতা তা প্রমাণিত হয়েছে কলকাতার নির্মাতাদের শাকিব খানকে নিয়ে সিনেমা নির্মানের মাধ্যমে। ‘শিকারি’, ‘নবাব’, ‘নাকাব’, ‘চালবাজ’ এবং ‘ভাইজান এলো রে’ সিনেমাগুলো প্রমাণ করে শাকিব খানকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করলে যেকন শ্রেণীর দর্শকের কাছে তিনি হয়ে উঠতে পারেন কাঙ্ক্ষিত তারকা। পর্দার লুক থেকে শুরু করে অভিনয় সবকিছুতেই ছিলো অনন্য এক শাকিবের জলছাপ।

শাকিব খানকে নিয়ে অনেক কিছুই বলা বা লিখা সম্ভব। ২৩ বছরের ক্যারিয়ারে শাকিব খানের অর্জনও অসামান্য। তার কাজের ঐতিয্য এবং জনপ্রিয়তা বিবেচনায় নিশ্চিত করে বলা যায় যে দেশীয় সিনেমায় শাকিব খানের দেয়ার এখনো অনেক কিছু আছে। সেটাকে নির্মাতারা কতটুকু কাজে লাগাতে পারবেন সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়। পরিশেষে একটি কথা বলে লিখাটি শেষ করতে চাই – আপনি তাকে ভালবাসতে পারেন, আপনি তাকে ঘৃণা করতে পারেন কিন্তু আপনি তাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। তিনি আমাদের কিং খান ফেসবুক স্টারদের যুগে ঢালিউডের শেষ সত্যিকার সুপারস্টার শাকিব খান।

আরো পড়ুনঃ
শাকিব খানের দুই দশক: মাসুদ রানা থেকে সুপারস্টার (প্রথম পর্ব)
শাকিব খানকে সুপারস্টার মনে করেন না প্রযোজক সেলিম খান!
ঢালিউডের এক দশক: পাঠক জরিপে এক দশকের সেরা

হোসেন মৌলুদ তেজো
হোসেন মৌলুদ তেজোhttps://iammoulude.com/
হোসেন মৌলুদ তেজো একজন নিয়মিত ব্লগার যিনি সিনেমা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। সিনেমার পাশাপাশি কবিতা, ছোট গল্প, সমসাময়িক এবং ব্যবসা সম্পর্কিত বিষয়েও লিখে থাকেন। প্রফেশনালী একটি বেসকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি বই পড়ে, সিনেমা দেখে এবং তার একমাত্র ছেলের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -
- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ