প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সোনালী সময়ের সিনেমার গল্পঃ মুহাম্মদ হান্নানের ‘বিক্ষোভ’

মুহাম্মদ হান্নানের ‘বিক্ষোভ’

সিলেটের ‘মনিকা’ সিনেমা হলে ১৯৯৪ সালে হালের তরুণ জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ’র রোমান্টিক ধারার বাহিরের সর্বপ্রথম নির্মিত একটি সমসাময়িক ঘটনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ছবি মুহাম্মদ হান্নানের ‘বিক্ষোভ’ দেখতে গিয়ে শুরুতেই আমি ও আমার বন্ধুরাসহ হলভর্তি ৩০০/৪০০ জন দর্শক নড়েচড়ে বসলাম। ছবির শুরুতেই কাজী হায়াতের ছবির মতো রক্তে আগুনলাগা কিছু অনুভব করলাম। তখন দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ চলছে। অনাহারী মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় ডাস্টবিন থেকে কুকুর, বিড়ালের সাথে খাবার খুঁটে খাচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালায় মরে যাচ্ছি , আমাদের একটু ভাত দাও, আমাদের একটু ভাত দাও… অনাহারে লক্ষ লক্ষ শিশু মারা যাচ্ছে…’’

- Advertisement -

এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশে সংঘটিত ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের বর্ণনা দিয়ে সেই সময়কালের প্রেক্ষাপট দিয়ে যে ছবিটি শুরু হয়েছিল তার নাম ‘’বিক্ষোভ’’ যার গল্পটি ছিল এমন – ১৯৭৪ সালে শোষকশ্রেণীর সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষগুলোর কারণে দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে শ্রমিক নেতা আসাদ (মনোজ সেন গুপ্ত) প্রতিবাদী সভা করছেন। প্রতিবাদী সভাটির খবর দূর থেকে দেখে আসাদের বন্ধু শরাফাত (নাসির খান) আরেক বন্ধু মাহমুদের(রাজীব) কানে পৌঁছায়। আসাদ, মাহমুদ ও শরাফাত তিনজনেই একসময় সহপাঠী ও বন্ধু ছিল। আসাদ (মনোজ সেন গুপ্ত) আজ শ্রমিক নেতা যে জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলে অন্যদিকে মাহমুদ ও শরাফাত (রাজীব ও নাসির খান ) এক সঙ্গে একই দলের রাজনীতি (শাসকশ্রেণীর) করছে। রাজনীতির সুবিধা নিয়ে রাজীব ও নাসির খান খাদ্য মজুদ করে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে কালোবাজারে মুনাফা করছে। মনোজ সেন গুপ্তকে রাজীব ও নাসির খান প্রলোভন দেখিয়েও নিজেদের পক্ষে আনতে পারেনি। মনোজ সেন গুপ্ত শ্রমিকদের দিয়ে রাজীব ও নাসির খানের গুদামে আগুন ধরাতে যায় যেখানে আগে থেকেই পুলিশ পাহারা ছিল। পুলিশ ফাঁকা আওয়াজ করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ দমাতে পারছিল না এই সুযোগে রাজীব আড়াল থেকে গুলি করে মনোজ সেন গুপ্তকে খুন করে দোষ পরে পুলিশের উপর। মনোজ সেন গুপ্ত সংসারে রেখে যায় স্ত্রী ডলি জহুর ও একমাত্র শিশু ছেলে সন্তান শিশু অনিক’কে (সালমান শাহ)।

এদিকে নাসির খানের সাথে দুদিন পর ভাগ বাটোয়ারার দ্বন্দ্বে নাসির খান’কে শ্রমিক নেতা মনোজ সেন গুপ্তকে হত্যার ফাঁসিয়ে দেয় শিয়ালের মতো চতুর রাজীব। কারণ সেদিনের ঘটনায় রাজীবের সাথে নাসির খান ছিল এবং রাজীবের গুলি করে মনোজ সেন গুপ্তকে হত্যা করার পর রাজীব নাসির খানের হাতে বন্দুকটি দেয় যা পুলিশ নাসির খানের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে নাসির খানকে গ্রেফতার করে। নাসির খান বুঝে যায় সব রাজীবের কৌশল। মনোজ সেন গুপ্তকে হত্যার দায়ে নাসির খানের ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। জেলে যাওয়ার আগে নাসির খান রাজিবকে বলে যায় ‘দোস্ত আমার তো নীতি আছে ঈমান নেই কিন্তু তোর তো কোনটাই নেই’। নাসিরের কথা শুনে রাজীব হাসে যে হাসির মধ্য দিয়ে ছবিটির গল্পের প্রেক্ষাপট থেকে আমরা মূল গল্পে প্রবেশ করি যার প্রেক্ষাপট এবার ১৯৯৪ সাল।

- Advertisement -

মুহাম্মদ হান্নানের ‘বিক্ষোভ’ সিনেমার পরের গল্পটি হলো নিহত মনোজ সেন গুপ্তে (আসাদ) ও ডলি জহুরের সন্তান অনিক (সালমান শাহ ) ও রাজীবের মেয়ে শাবনুর একই কলেজের ছাত্রছাত্রী। ধুরন্দর রাজীব তখন জনগণের নেতা যিনি ‘গরীব কল্যাণ পার্টি’র চেয়ারম্যান। রাজীবের দলের সন্ত্রাসী রাজা (জহির উদ্দিন পিয়ার) সে একই কলেজের ছাত্র যে কলেজে ত্রাস সৃষ্টি করে। কলেজের প্রিন্সিপাল বুলবুল আহমেদ রাজার অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে অপমানিত হয়। সাধারন ছাত্রছাত্রীদের ব্যানারে সালমান শাবনুর সবাইকে সন্ত্রাসী রাজা ও তার দলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেন। রাজা একদিন কলেজের শিক্ষিকা শারমিন’কে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে যেখানে এসে বাঁধা দেয় সালমান। শুরু হয়ে প্রকাশ্য সালমান ও রাজার দ্বন্দ্ব। রাজার গডফাদার রাজীব আর সালমানের শক্তি শাবনুর ও সাধারন ছাত্রছাত্রীরা। একদিন সালমানের বন্ধু তুষারকে হত্যা করে জহির উদ্দিন পিয়ার ঘটনা এবার আরও দ্বন্দ্বমুখর হয়ে হঠে। সাধারন ছাত্রছাত্রীর ব্যানারে সালমান শাহ ও তার পক্ষের লোকজন কোণঠাসা তখনই সালমানকে পেছন থেকে রাজনৈতিক শক্তি ও সমর্থন যোগায় জেল খাটা নাসির খান যে নিজেকে একজন পত্রিকার মালিক ও জনগণের পক্ষের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নাসির খান রাজীবের সাথে পুরনো শত্রুতার প্রতিশোধ নিতে সালমানকে ব্যবহার করে। নাসির খান একসময় সালমানকে জানায় রাজীবই তার বাবার হত্যাকারী যার ফলে শাবনুরের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয় সালমানের। এভাবে রাজনীতির দুই প্রতিপক্ষের দ্বন্দ্বে সালমান জড়িয়ে যায়। একসময় সালমানের দাপটে রাজীব বাহিনী কোণঠাসা হতে শুরু করলে রাজীব সালমানের গডফাদার নাসির খানের সাথে পুরনো শত্রুতা মিটিয়ে এক হয়ে চলার পরিকল্পনা করে।

অবশেষে একসময় নষ্ট রাজনীতির অবক্ষয় থেকে মুক্তি পায় সালমান ও তার বাবার হত্যাকারী রাজীব সালমানকে বড় পাথর দিয়ে আঘাত করতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে নিজেই মৃত্যু বরন করে। যে কলেজে নষ্ট রাজনীতির বিষবাস্প ছড়িয়ে কমলমতি শিক্ষার্থীদের পথভ্রষ্ট করতে চেয়েছিল রাজীব সেই কলেজের প্রাঙ্গণে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক শিক্ষিকাদের সামনে করুন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ছবির গল্পটি শেষ হয় আর দর্শকরাও তাঁদের প্রিয় তারকা সালমানের অভিনীত রোমান্টিক গল্পের বাহিরে সমাজ গঠনে তরুণ সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্যমুলক গল্পে জমজমাট ছবি মুহাম্মদ হান্নানের ‘বিক্ষোভ’ দেখে অনেক তৃপ্তি নিয়ে সিনেমা হল থেকে বের হয়।

সেদিন মনিকা সিনেমা হলে ‘বিক্ষোভ’ ছবিটি দেখা দর্শকদের একজন হিসেবে আমি বলবো মুহাম্মদ হান্নানের ‘বিক্ষোভ’ ছবিটি রোমান্টিক গল্পের বাহিরে সালমানের অভিনীত শ্রেষ্ঠ একটি ছবি যা সালমানের ক্যারিয়ারে এমন আরেকটি ছবি পাওয়া যাবে না। আমার নিজের কাছেও সালমানের সেরা ছবি ‘বিক্ষোভ’ যে গল্পগুলোর ছবি দর্শকরা খুবই উপভোগ করতেন। আমাদের দেশে রাজনৈতিক ছবির সফল ও শ্রেষ্ঠ নির্মাতা কাজী হায়াতের আগুনঝরা ছবি ‘ত্রাস’ ও মুহাম্মদ হান্নানের ‘বিক্ষোভ’ ছবিটি প্রায় একই থিমের উপর নির্মিত যা হলো শিক্ষাঙ্গনে তৎকালীন কলুষিত ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে যুবকদের সচেতন করা। যে যুবকরা দেশের আগামীর কাণ্ডারি সেই যুবকরা ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী হিসেবে গড়ে উঠছে যা কারো কাম্য নয়। সালমান শাবনুরকে শপথ নেয়ার যে দৃশটি সিনেমায় দেখানো হয়েছে তা সমাজের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আমাদের আলোকিত তরুণ ও ছাত্রসমাজের শপথের কল্পিত রুপ বলতে পারেন। পর্দার সালমান শাবনুর যেন আমাদের আলোকিত ছাত্রসমাজের প্রতিচ্ছবি।

পিতৃহত্যার প্রতিশোধের গল্পটিকে শুরু থেকে এমন ভাবে মোহাম্মদ হান্নান রাজনীতির যোগসূত্র ঘটিয়ে গল্পটি বললেন তা এককথায় অসাধারন। পিতৃহত্যার প্রতিশোধের গল্পটি ছাপিয়ে তা হয়ে তৎকালীন প্রেক্ষাপটের রাজনীতিবিদদের গোপন চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ যা খালি চোখে সাধারন মানুষ কখনই দেখতে পারে না। ফরিদা হোসেনের কাহিনী অবলম্বনে জোসেফ শতাব্দীর চলচ্চিত্র রুপ ও সংলাপ ছিল ‘বিক্ষোভ’ ছবিটি যার প্রেক্ষাপট শুরু স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষের সময়কাল আর শেষ ৯০ দশকের তৎকালীন ছাত্র রাজনীতির প্রেক্ষাপট। ছবিটির গল্প যত এগিয়েছে ততই সিনেমা হলের দর্শকদের চোখ পর্দায় আটকে গেছে। ছবির সবগুলো গান লিখেছিলেন ও সুর করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা সঙ্গীত পরিচালক ও গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। প্রতিটি গানই যেমন মেলোডিয়াস তেমনি হৃদয়ছোঁয়া। রোমান্টিক গান যেমন ছিল তেমন ছিল ‘বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয়, এখানে সভ্যতারই ফুল ফুটানো হয়’, ‘একাত্তরের মা জননী/কোথায় তোমার মুক্তি সেনার দল’ এবং ‘আমায় অনেক বড় ডিগ্রি দিছে মা’ গানগুলোর মতো যুব সমাজের মনে উদ্দীপনা জাগানোর মতো তেমনি হৃদয়ছোঁয়া। বিশেষ করে সালমান যখন বন্ধু তুষারের লাশ নিয়ে বিধবা মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল তখন সুবির নন্দীর কণ্ঠের ‘আমায় অনেক বড় ডিগ্রি দিছে মা’ গানটি শুনে ও দৃশ্য দেখে সিনেমা হলের দর্শকদের চোখে পানি এসেছিল। এই ধরনের গান এখনকার চলচ্চিত্রে হয় না।

দুঃখের বিষয় মুহাম্মদ হান্নানের ‘বিক্ষোভ’ ছবির মতো যুব সমাজের সমাজ সচেতনমুলক গল্পের ছবি গত ১৫ বছরে একটিও হয়নি। সেদিন মোহাম্মদ হান্নানের ‘’বিক্ষোভ’’ ছবিটি ছিল প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে নষ্ট ছাত্র রাজনীতিতে পিষ্ট হওয়া অন্ধ যুব সমাজের সাথে আলোকিত যুব সমাজের যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত আলোকিত যুব সমাজের জয় অনিবার্য সেই সত্যটি তুলে ধরার চিত্র আর সিনেমার পর্দায় প্রেম, ভালোবাসা, রোমান্টিক নায়ক সালমান ছিলেন সেই আলোকিত যুবসমাজের প্রতিনিধি বা বজ্রকন্ঠের এক তরুণ যে তরুণরাই হলো ‘সভ্যতার ফুল’।

আরো পড়ুনঃ
কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’
মালেক আফসারীর ‘ঘৃণা’
মনোয়ার খোকনের ‘সংসারের সুখ দুঃখ’

ফজলে এলাহী
বাংলা সিনেমার স্বরূপ সন্ধানে কাজ করে যাওয়া একজন অক্লান্ত যোদ্ধা ফজলে এলাহী। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অতীত তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন তিনি। ফজলে এলাহীকে আমাদের একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে পেয়ে ফিল্মীমাইক শ্লাঘা বোধ করছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার এই কাজকে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর।

এ সম্পর্কিত

আরো পড়ুন

- Advertisement -

সর্বশেষ

মুক্তি প্রতীক্ষিত

  • লিডার আমিই বাংলাদেশ
    লিডার আমিই বাংলাদেশ